প্রতিশোধস্পৃহা থেকে বাড়াবাড়ি ব্যক্তি ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়াসকে অসম্ভব করে তুলতে পারে। কেউ অত্যাচারিত হলে প্রতিশোধ গ্রহণের প্রশ্ন আসে। কিন্তু এই প্রতিশোধ গ্রহণের ক্ষেত্রে সাম্যের সীমা লঙ্ঘিত হলে প্রতিশোধ গ্রহণও অত্যাচারে পর্যবসিত হতে পারে। প্রতিশোধ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সীমা লঙ্ঘিত হলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে বাধ্য এবং যা সামাজিক ভারসাম্য বিনষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পবিত্র কোরআনে এ প্রসঙ্গে এরশাদ হয়েছে, ‘আর মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ। অতঃপর যে ক্ষমা করে দেয় এবং আপস-নিষ্পত্তি করে, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে রয়েছে। নিশ্চয় আল্লাহ জালিমদের পছন্দ করেন না। তবে অত্যাচারিত হওয়ার পর যারা প্রতিবিধান করে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না। শুধু তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, যারা মানুষের ওপর জুলুম করে এবং জমিনে অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন করে বেড়ায়। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আজাব। আর যে ধৈর্যধারণ করে এবং ক্ষমা করে, তা নিশ্চয় দৃঢ়সংকল্পেরই কাজ।’ (সুরা শুরা, ৪০-৪৩)
তাফসিরে মারেফুল কোরআনের ভাষ্যমতে, ‘মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দই’; অর্থাৎ তোমার যতটুকু আর্থিক অথবা শারীরিক ক্ষতি কেউ করে, তুমি ঠিক ততটুকু ক্ষতি তার করতে পার (যা প্রতিবিধান হিসেবে হওয়া সমীচীন বিবেচিত হতে পারে)। তবে শর্ত এই যে, তোমার মন্দ কাজটি যেন পাপকর্ম না হয়। উদাহরণত, কেউ তোমাকে জোরপূর্বক মদ পান করিয়ে দিলে, তোমার জন্য তাকেও বলপূর্বক মদ পান করিয়ে দেওয়া জায়েজ হবে না। আয়াতে যদিও সমান সমান প্রতিশোধ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরে এ কথাও বলে দেওয়া হয়েছে, যে ব্যক্তি ক্ষমা করে এবং আপস-নিষ্পত্তি করে, তার পুরস্কার আল্লাহর দায়িত্বে রয়েছে। এতে নির্দেশ রয়েছে, ক্ষমা করাই উত্তম।
প্রতিশোধ ততটুকু যতটুকু জুলুম করা হয়েছে। সীমা লঙ্ঘিত হলে তা আবার অত্যাচারে পর্যবসিত হতে পারে। প্রতিশোধের মাত্রা অতিশয় আপেক্ষিক, সীমা লঙ্ঘনের সম্ভাবনা ও সমস্যা থেকেই যায়। তাই ক্ষমা ও আপস-মীমাংসার মাধ্যমে প্রতিশোধ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা শ্রেয়।
তবে যে ক্ষেত্রে যদি ক্ষমা করার ফলে অত্যাচারীর ধৃষ্টতা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, সেক্ষেত্রে প্রতিশোধ-প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কাজী আবুবকর ইবনে আরাবি এবং কুরতবি (রহ.) আলোচ্য আয়াতসমূহের ব্যাখ্যায় অভিমত প্রকাশ করেছেন, ক্ষমা ও প্রতিশোধ দুটিই অবস্থাভেদে উত্তম। যে ব্যক্তি অনাচার করার পর লজ্জিত হয়, তাকে ক্ষমা করা উত্তম এবং যে ব্যক্তি অত্যাচারে অটল থাকে, তার ক্ষেত্রে প্রতিশোধ নেওয়াই উত্তম।
পবিত্র রমজান মাসের রোজা পালন থেকে আমরা এ শিক্ষা গ্রহণ করে জীবন সাজাতে পারি। জীবনকে গড়ে তুলতে পারি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শে। আর তাঁর আদর্শের মাঝেই প্রত্যেক মুমিন-মুসলমানের ইহকালীন ও পরকালীন কামিয়াবি বা মুক্তি নিহিত রয়েছে।
লেখক : সাবেক সচিব ও সাবেক চেয়ারম্যান, এনবিআর