যাপিত জীবনে প্রয়োজনে মানুষকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছুটে বেড়াতে হয়। পবিত্র রমজানেও অনেক ছোটাছুটি করতে হয়। এ ছোটাছুটি হয়তো খুব কাছে বা দূরে কিংবা দেশের বাইরেও হতে পারে। ইসলামি পরিভাষায় এটাকে মুসাফির বলে। অনেকে মনে করে থাকেন, সফর করলে বা মুসাফির হলে রোজা না রাখলেও চলে। এটা মনে করে অনেকে রোজা রাখেন না। এ বিষয়টা নিয়ে অনেকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা দিতে শুরু করেন। আর তাতেই বিভ্রান্তি শুরু হয়। কেউ পাঁচ মাইল দূর সফর করে রোজা না রাখার বাহানা করেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সময় সফর করা যতটা কষ্টকর ছিল, এখন হাজার মাইল দূর সফর করলেও এতটা কষ্টকর হয়ে ওঠে না। কারণ এখন খুব দ্রুতগামী যানবাহন—প্লেন, হেলিকপ্টার, অত্যাধুনিক বাস, প্রাইভেটকার ও ট্রেনসহ নানা আরামদায়ক বাহন সার্ভিস রয়েছে। মানুষ এখন খুব সহজে এক দেশ থেকে অন্য দেশে চলে যেতে পারে। এতে রোজা রেখে গেলেও তেমন কোনো কষ্ট হয় না। আর তাই তুচ্ছ কারণ দেখিয়ে রোজার মতো একটা মহান ফরজকে নিয়ে কোনো ধরনের অবহেলা করা একজন মুসলমানের নিতান্ত গর্হিত কাজ হিসেবে ধরে নেওয়া হবে।
আল্লাহতায়ালা কিছু মানুষের ওপর রোজা রাখার বাধ্যবাধকতাকে কিছুটা লঘু করে দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি এই মাসের সাক্ষাৎ লাভ করবে, তার জন্য সম্পূর্ণ মাস রোজা রাখা অপরিহার্য। আর যে ব্যক্তি রোগাক্রান্ত বা ভ্রমণে থাকবে, সে যেন অন্য সময় রোজার সংখ্যা পূর্ণ করে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৫)
মুসাফিরের জন্য পবিত্র রমজানের রোজা না রাখার অবকাশ রয়েছে। চাই সে রোজা রাখতে সক্ষম হোক না হোক; রোজা রাখা তার পক্ষে কষ্টসাধ্য হোক বা না হোক। তবে সম্ভব হলে রোজা রাখাই উত্তম। মুসাফির ব্যক্তি যদি (রোজা না রাখা অবস্থায়) রমজানের দিনে সফর থেকে ফিরে এসে নিজ এলাকায় প্রবেশ করে, তা হলে তার জন্য খাদ্য পানীয় গ্রহণের অবকাশ আছে, তবে রমজানের মহত্ত্ব ও পবিত্রতার প্রতি লক্ষ রেখে দিনের অবশিষ্ট সময়টুকু পানাহার থেকে বিরত থাকাই উত্তম।
আর তাই রোগাক্রান্ত, মুসাফির, গর্ভবতী নারী, দুগ্ধপোষ্য শিশুর মা এবং রোজা রাখতে অক্ষম বৃদ্ধ-বৃদ্ধা—এসব শ্রেণিভুক্ত মানুষের রোজা রাখা না রাখাকে তাদের ইচ্ছা ও পছন্দের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে; এবং বলা হয়েছে, ‘এরা যেন রমজান মাস ছাড়া অন্য সময় এসব রোজার সংখ্যা পূর্ণ করে, অর্থাৎ কাজা আদায় করবে।’ (রদ্দুল মুহতার, ২/৪৩১)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় এর অনেক উদাহরণ রয়েছে। তিনি সফরে থাকাকালে কখনো রোজা রেখেছেন, আবার কখনো রাখেননি। সফর অবস্থায় নিয়ত করে রোজা রাখা শুরু করলে তা ভাঙা জায়েজ নয়। কেউ ভেঙে ফেললে গুনাহগার হবে। তবে কাফফারা দিতে হবে না। শুধু কাজা করবে। (রদ্দুল মুহতার, ২/৪৩১)
যে মুকিম অবস্থায় সাহরি খেয়ে সফর শুরু করেছে, তার জন্য সফরের অজুহাতে রোজা ভাঙা জায়েজ নয়। ভাঙলে গুনাহগার হবে এবং শুধু কাজা ওয়াজিব হবে। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২০৬)
রমজানের সফরে রাসুল (সা.)-এর রোজা রাখা এবং ভঙ্গ করার বিষয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, যদি কষ্টের সম্ভাবনা না থাকে, রোজা ভাঙার মতো কিছু না ঘটে, তবে রোজা রাখাই উত্তম। (রদ্দুল মুহতার, ২/৪২১)
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘রোজা পালনরত অবস্থায় রাসুল (সা.) কুদাইদ ও উসফান নামক স্থানের মধ্যবর্তী প্রস্রবণে অবতীর্ণ হয়ে রোজা ভেঙে ফেললেন, মাস শেষ হওয়া অবধি তিনি এভাবেই পানাহার করে চললেন। (বুখারি, হাদিস: ৪২৭৫)
যদি রোজা পালন খুবই কঠিন হয়ে পড়ে এবং পানাহার আবশ্যক হয়, তবে পানাহার বাধ্যতামূলক। কেননা, আল্লাহতায়ালা যেমন কারও ওপর বিধান চাপিয়ে দেন না, তেমনি নিজের ওপর জবরদস্তিমূলক কোনো বিধান বানিয়ে নেওয়াও বৈধ নয়। কঠিন অবস্থায় রোজা পালনকারীকে লক্ষ্য করে রাসুল (সা.) বলেছিলেন, ‘এরা পাপী, এরা পাপী।’ (মুসলিম, হাদিস: ১১১৪)
রমজান মাসে রোজা না রাখার জন্য অনেকেই বিভিন্ন অজুহাত খোঁজেন। বিশেষ করে কারও যদি সামান্য অসুস্থতা থাকে, তা হলে তিনি রোজা না রাখার পেছনে সে বিষয়কেই তুলে ধরেন। অথচ সামান্য অসুস্থতা তো দূরে থাক, অনেক দীর্ঘস্থায়ী নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগেও রোজা রাখার ব্যাপারে কোনো বিধিনিষেধ নেই। আর সুস্থ অবস্থায় রোজা রাখা যে শরীরের জন্য উপকারী, তা বলাই বাহুল্য। আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অনুগ্রহ অর্জনের জন্য তাঁর দেওয়া ফরজ বিধান রোজা পালনই সৌভাগ্যের বিষয়। (ফতোয়ায়ে রহমানিয়া, ৫/১৮০)
লেখক: আলেম ও গবেষক