আল্লাহতায়ালা মানবজাতিকে নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও কর্তব্য দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা কি ধারণা করেছ যে, আমি তোমাদের এমনিই সৃষ্টি করেছি? আর তোমরা আমার দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে না?’ (সুরা আল-মুমিনুন, আয়াত: ১১৫)।
মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য
কোরআনে মানুষকে মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যে ব্যক্তি কারও অধিকারের আওতাধীনে তারই অর্পিত ক্ষমতা-ইখতিয়ার ব্যবহার করে তাকে খলিফা বলে। খলিফা নিজে মালিক নয় বরং আসল মালিকের প্রতিনিধি। যদি সে নিজেকে মালিক মনে করে বসে এবং তার ওপর অর্পিত ক্ষমতাকে নিজের ইচ্ছেমতো ব্যবহার করতে থাকে অথবা আসল মালিককে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে মালিক বলে স্বীকার করে নিয়ে তারই ইচ্ছে পূরণ করতে এবং তার নির্দেশ পালন করতে থাকে। তাহলে এগুলো সবই বিদ্রোহ ও বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে গণ্য হবে।
এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘সেই সময়ের কথা একটু স্মরণ করো যখন তোমাদের রব ফেরেশতাদের বলেছিলেন, আমি পৃথিবীতে একজন খলিফা বা প্রতিনিধি নিযুক্ত করতে চাই।’ তারা বলল, ‘আপনি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে নিযুক্ত করতে চান যে সেখানকার ব্যবস্থাপনাকে বিপর্যস্ত করবে এবং রক্তপাত করবে? আপনার প্রশংসা ও স্তুতিসহকারে তাসবিহ পাঠ এবং আপনার পবিত্রতা বর্ণনা তো আমরা করেই যাচ্ছি।’ আল্লাহ বললেন, ‘আমি যা জানি তোমরা তা জানো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ৩০)
আয়াতে বর্ণিত ‘খলিফা’ শব্দের অর্থ নির্ণয়ে বিভিন্ন মত এসেছে। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রহ.) বলেন, এর অর্থ স্থলাভিষিক্ত হওয়া। অর্থাৎ আল্লাহতায়ালা ফেরেশতাদের সম্বোধন করে বলেছেন যে, আমি তোমাদের ছাড়া এমন কিছু সৃষ্টি করতে যাচ্ছি যারা যুগ যুগ ধরে বংশানুক্রমে একে অপরের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে। ইবনে জারির (রহ.) বলেন, আয়াতের ব্যাখ্যা হচ্ছে, আমি জমিনে আমার পক্ষ থেকে প্রতিনিধি নিয়োগ করতে চাই, যে আমার সৃষ্টিকুলের মধ্যে ইনসাফের সঙ্গে আমার নির্দেশ বাস্তবায়ন করবে। আর এ প্রতিনিধি হচ্ছে আদম এবং যারা আল্লাহর আনুগত্য ও আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে ইনসাফের সঙ্গে তার বিধান প্রতিষ্ঠায় আল্লাহর স্থলাভিষিক্ত হবে। (ইবনে কাসির)
নবিরাই আল্লাহর মনোনীত প্রতিনিধি
সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করাও মানুষের অন্যতম দায়িত্ব। যুগে যুগে নবি ও রাসুলরা সমাজের সর্বত্র ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে পৃথিবীতে এসেছিলেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, (হে দাউদ); নিশ্চয় আমি তোমাকে জমিনে খলিফা (প্রতিনিধি) বানিয়েছি, অতএব তুমি মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার করো আর প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। কেননা তা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে। নিশ্চয় যারা আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হয় তাদের জন্য কঠিন আজাব রয়েছে। কারণ, তারা হিসাব দিবসকে ভুলে গিয়েছিল। (সুরা সোয়াদ, আয়াত: ২৬)
মুমিনরা পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি
উবাই ইবনে কাব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং তার সাথিরা যখন মদিনায় তাশরিফ আনলেন, তখন সব আরব এক বাক্যে তাদের শত্রুতে পরিণত হলো। সাহাবারা তখন রাত-দিন অস্ত্ৰ নিয়ে থাকতেন। তখন তারা বলল, আমরা কি কখনো এমনভাবে বাঁচতে পারব যে, আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় না করে সন্তুষ্টচিত্তে ঘুমাতে পারব? তখন নাজিল হয়, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ইমান আনে ও সৎকাজ করে আল্লাহ তাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, তিনি অবশ্যই তাদের জমিনে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন, যেমন তিনি প্রতিনিধিত্ব দান করেছেন তাদের পূর্ববর্তীদের এবং তিনি অবশ্যই, তাদের জন্য প্রতিষ্ঠিত করবেন তাদের দ্বীনকে যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়ভীতির পরে তাদের নিরাপত্তা দান করবেন। তারা আমার ইবাদত করবে, আমার সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করবে না। আর এরপর যারা কুফরি করবে তারাই ফাসিক।’ (সুরা নুর, আয়াত: ৫৫)। আল্লাহতায়ালার হুকুম আহকাম ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে যথাযথ পালন ও প্রতিষ্ঠিত করাই মানুষের মূল উদ্দেশ্য। আল্লাহতায়ালা জিন এবং মানুষকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে সৃষ্টি করেছেন। তাহলো একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি জিন এবং মানুষকে আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা আজ-জারিয়াত, আয়াত: ৫৬)
সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিকে খলিফাতুল্লাহ বলা যাবে?
নবি-রাসুলদের পরে কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিকে ‘খলিফাতুল্লাহ’ বা আল্লাহর প্রতিনিধি সম্বোধন করা অনুচিত। এক ব্যক্তি ওমর (রা.)-কে খলিফাতুল্লাহ বলে সম্বোধন করলে তিনি তাকে ভর্ৎসনা করে বলেন, ‘তোমার অমঙ্গল হোক! তুমি কতই না দূরবর্তী সম্বোধন করলে। আমার মা আমার নাম রেখেছেন ওমর। তুমি যদি এই নামে আমাকে সম্বোধন করো আমি তা মেনে নেব। অতঃপর বড় হলে আমার উপনাম হয়েছে আবু হাফস। তুমি আমাকে এই নামে সম্বোধন করলে আমি তা মেনে নেব। অতঃপর তোমরা আমার ওপর তোমাদের বিষয়গুলো তথা খিলাফতের দায়িত্ব অর্পণ করেছ এবং নাম রেখেছ আমিরুল মুমিনিন। তুমি যদি এই নামে সম্বোধন করো, সেটাই তোমার জন্য যথেষ্ট হবে।’ (আল ফুতুহাতুর রব্বানিয়্যাহ, পৃষ্ঠা-৫৬)
লেখক: প্রাবন্ধিক