রমজান—মুমিনের অন্তরে এক প্রশান্তির পরশ, স্রষ্টার কাছে আত্মসমর্পণের এক পবিত্র উৎসব। সারা বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটি মুসলিমের কাছে এই মাসটি কেবল সংযমের নয়, বরং আত্মিক পরিশুদ্ধি ও ভ্রাতৃত্বের এক পরম মুহূর্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র হাদিস অনুযায়ী, রোজাদারের জন্য সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্তগুলোর একটি হলো ইফতার। আর সেই ইফতার যখন উত্তর আফ্রিকার নীল জলরাশির দেশ আলজেরিয়ায় হয়, তখন তাতে যুক্ত হয় এক অনন্য সাংস্কৃতিক আভিজাত্য।
জনসংখ্যাবিষয়ক অনলাইন ডেটাবেজ ‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ’ (ডব্লিউপিআর)-এর তথ্য অনুযায়ী, মুসলিম জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ দশটি দেশের একটি আলজেরিয়া। দেশটির প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষ অর্থাৎ প্রায় সাড়ে চার কোটি মুসলিম অত্যন্ত ভক্তি ও নিষ্ঠার সঙ্গে রমজান পালন করেন। ধর্মীয় আবহে এক হলেও ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক কারণে দেশটিতে ইফতারের আয়োজন বেশ বৈচিত্র্যময় এবং বাহারি পদের।
বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মতো আলজেরিয়াতেও খেজুর বা পানি দিয়ে রোজা ভাঙা হলেও, তাদের খাবারের তালিকায় থাকে বিশেষ সব ঐতিহ্যবাহী খাবারের সমারোহ:
সোয়ারবা ও পিজ্জা: আলজেরীয় ইফতারের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো বিশেষ এক ধরনের পিজ্জা এবং ‘সোয়ারবা’ (Chorba)। সোয়ারবা হলো মাংস, টমেটো ও বিভিন্ন মসলা দিয়ে তৈরি এক সুস্বাদু ঘন স্যুপ, যা ছাড়া তাদের ইফতারের টেবিল প্রায় অপূর্ণ।
আলজেরীয় গৃহিণীদের নিপুণ হাতে তৈরি ‘দোলমা’ ইফতারের প্রধান অনুষঙ্গ। এটি মূলত আলু ও বিভিন্ন সবজি দিয়ে তৈরি এক প্রকার মুখরোচক খাবার। এর সঙ্গে থাকে মুচমুচে সবজি রোল, যা পুষ্টি ও স্বাদের ভারসাম্য বজায় রাখে।
মাগরিবের নামাজের পর আলজেরীয়দের দস্তরখানে এক বিশেষ পানীয়ের উপস্থিতি দেখা যায়, যা ‘সিগার’ নামে পরিচিত। এটি মূলত বিভিন্ন ধরনের বাদাম দিয়ে তৈরি এক ধরনের মিষ্টি পানীয়, যা দিনের ক্লান্তি দূর করে শরীরে তৎক্ষণাৎ শক্তি জোগায়।
আলজেরিয়ার ইফতার মানে কেবল খাবারের আয়োজন নয়, বরং এটি আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে মেলামেশার এক বিশেষ মাধ্যম। আলজেরীয়রা বিশ্বাস করে, ইফতারের সওয়াব কেবল নিজে খেলে নয়, বরং অন্যকে আপ্যায়নের মাধ্যমে পূর্ণতা পায়। তাদের দস্তরখানে হরেক পদের স্যুপ এবং ঐতিহ্যবাহী পিঠা-পুলি তাদের সমৃদ্ধ রন্ধনশৈলীর পরিচয় দেয়।
সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক কারণে খাবারের নাম ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু প্রতিটি দস্তরখানের মূল সুরটি এক, তা হলো- মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা। আলজেরিয়ার এই বর্ণিল ইফতার আয়োজন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বিশ্বের যেখানেই হোক না কেন, মাহে রমজান সব মুসলমানকে এক সুতোয় গেঁথে দেয়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক