ঢাকা ২২ আষাঢ় ১৪৩৩, সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
হলিউড স্টুডিওগুলোর এআই ব্যবহারের তথ্য জানতে চায় মিডজার্নি প্রশ্ন ফাঁসের গুজব ছড়ালে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: ডিসি ফরিদা কক্সবাজারে পাহাড়ধসে ১ জনের মৃত্যু কমলো স্বর্ণের দাম, ভরি কত এখন? শহরে চাপ কমাতে ৪ উপশহর গড়ার প্রস্তাব সিডিএ চেয়ারম্যানের রাঙামাটিতে অবৈধ অটোরিকশা বন্ধে ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম ১১ অঞ্চলে ঝড়ের সতর্কতা, নদীবন্দরে ২ নম্বর সতর্ক সংকেত সমন্বয় ও নিঃসরণ অধ্যায়ের ৮টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ৩য় পর্ব, অষ্টম শ্রেণির বিজ্ঞান ডিসেম্বরে শিক্ষার্থীদের নতুন বই দিতে চায় সরকার: শিক্ষামন্ত্রী পল্লী উন্নয়ন বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান অ্যাজেন্ডা: স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বেরোবি প্রেসক্লাবে আলোচনা সভা ও ফল উৎসব ব্রাজিলের পরাজয়ে অসুস্থ নারীভক্তকে হাসপাতালে নিলেন আর্জেন্টিনা সমর্থক ২৭তম বিসিএসে আরও ৭৭ জনকে নিয়োগ, প্রজ্ঞাপন জারি হিলিতে জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস উপলক্ষে র‌্যালি তবে কি রোনালদোকে ভয় পাচ্ছেন স্পেন কোচ? ব্রুনোর পেনাল্টি নেওয়ার ব্যাখ্যা দিলেন আনচেলত্তি চট্টগ্রামে আহত ছাত্রদল নেতা সাইফুদ্দিনের মৃত্যু সিটিজেনস ব্যাংক পিএলসির ৪র্থ বছরে পদার্পণ বাংলা একাডেমিতে শেষ শ্রদ্ধায় সিক্ত অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক পার্বত্য তিন জেলায় বাঙালিদের আয়কর ছাড় ও বন্ধ ঋণ চালুর দাবি নরওয়ে গোলকিপারকে ‘বেকুব’ বলেছিলেন নেইমার প্রশান্ত মহাসাগরে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে চীন ৪০ পাউন্ডে শুরু করে মাসে ৩ লাখ টাকা! ভিন্টেজ পোশাক বিক্রি করে তরুণীর অসাধারণ সাফল্য প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিতে নগর গবেষণাকেন্দ্র উদ্বোধন বিশ্বকাপ ব্যর্থতার পরও আনচেলত্তির ওপর আস্থা, থাকছেন ২০৩০ পর্যন্ত উত্থানে শেয়ারবাজার ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্পের সফরের আগে কিয়েভে রুশ হামলা, নিহত ৯ সব হাসপাতালে বাধ্যতামূলকভাবে লেবার রুম স্থাপনের নির্দেশ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দাশেরকান্দি পয়োশোধনাগার: বাজেট ও মেয়াদ শেষ হলেও প্রকল্প সম্পূর্ণ হয়নি ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৩৪২

খেলাধুলাবঞ্চিত পথশিশুরা

প্রকাশ: ২৭ মে ২০২৪, ১০:৪৪ এএম
আপডেট: ১৪ জুলাই ২০২৪, ০৩:৩৮ পিএম
খেলাধুলাবঞ্চিত পথশিশুরা
ছবি : সংগৃহীত

যে বয়সে এক দুরন্ত শৈশব পার করার কথা ছিল, সেই বয়সে ময়লা চটের ঝোলা কাঁধে নিয়ে প্লাস্টিকের বোতল টোকায় রকিব। বয়স কত জানে না। তবে আন্দাজ করা যায় ১৩ বা ১৪ হবে। মানুষ তাকে টোকাই নামে ডাকে। বাবা-মা ছাড়া রকিব থাকে কমলাপুর রেলস্টেশনে। তার সঙ্গে আরও অনেক শিশু থাকে। স্টেশনই তাদের ঘর যেন। যে বয়সটা তাদের কাটিয়ে দেওয়ার কথা ছিল খেলাধুলা করে, সে বয়সে টিকে থাকার জন্য তাদের যুদ্ধ করতে হচ্ছে জীবনের সঙ্গে।

কিন্তু রকিবের খেলতে ইচ্ছা করে। এই বয়সে অন্যান্য শিশুর মতো সেও চায়, ঘুম থেকে ওঠার পর ছোট মাথায় দুই বেলা খাবার জোগানোর চিন্তা থাকবে না। ছেঁড়া জামা আর ময়লা চটের বস্তা কাঁধে নিয়ে বের না হয়ে একটা পরিষ্কার জামা ও বল হাতে খেলতে বের হবে সমবয়সীদের সঙ্গে। কিন্তু খেলতে বের হলে বোতল টোকাবে কখন? বোতল না টোকালে যে, তার কপালে খাবার জুটবে না!

খেলাধুলা শুধু সাময়িক আনন্দের অনুষঙ্গ না। শিশু বিশেষজ্ঞরা বলেন, একটি শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। মানুষের মেধা-মননের সুস্থ গঠনের জন্য একটি শিশুর খেলাধুলা করা দরকার। শরীর ভালো রাখার জন্য একটি শিশুর জন্য দরকার শরীরচর্চা করা। আর শরীরচর্চার একটা মজাদার মাধ্যম হতে পারে খেলাধুলা। পরিচ্ছন্ন বিনোদন ও খেলাধুলায় যে শিশু বেড়ে ওঠে, তার পক্ষে সফল মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা সম্ভব।

বাংলাদেশে শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করা অনেক সংগঠন শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে খেলাধুলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। সেভ দ্য চিলড্রেনের পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন খবরের কাগজকে বলেন, ‘খেলাধুলা শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের পাশাপাশি সামাজিক বিকাশেও সাহায্য করে। শারীরিক ক্ষেত্রে দৌড়ঝাঁপ করার ফলে পেশি গঠন, অস্থি গঠনসহ শারীরিক বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে। একই সঙ্গে খেলাধুলার ফলে মানসিকভাবেও শিশু চাঙা থাকে, চিন্তামুক্ত থাকে। সামাজিক দক্ষতার ক্ষেত্রে খেলাধুলা আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, দলগতভাবে কাজ করার মানসিক দক্ষতা বাড়ায়, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করার দক্ষতা বাড়ায়, নানা ধরনের মানসিক চাপ কীভাবে মোকাবিলা করবে, তা শেখায়। পাশাপাশি দলগতভাবে কাজ করার দক্ষতা অর্জনের গুণগুলো এই খেলাধুলা তৈরি করে দেয়। সুতরাং এটা বলা যায়, শিশুদের বেড়ে ওঠার জন্য খেলাধুলা অপরিহার্য।’ 

চলতি বছরের মার্চ মাসে প্রকাশিত বাংলাদেশের পথশিশুদের ওপর ইউনিসেফের গবেষণা ‘স্ট্রিট সিচুয়েশন ইন বাংলাদেশ ২০২৪’-এর তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৩০ লাখ ৪০ হাজারের বেশি পথশিশু রয়েছে। এদের শিশুকাল থেকেই সংগ্রাম করে চলতে হয় জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে। জীবিকার তাগিদে ছোট বয়সেই বন্ধ হয়ে যায় তাদের স্বপ্ন দেখার আকাঙ্ক্ষা। শুধু খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাই এই শিশুদের মূল লক্ষ্য। ফলে অল্প বয়সেই মানসিক অবসাদে ভোগে পথশিশুরা। হতাশাগ্রস্ত হয়ে বেছে নেয় মাদকের পথ। এমতাবস্থায় শিশু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হতাশা কাটাতে একটি মাধ্যম হতে পারে খেলাধুলা। 

পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান পথশিশু সেবা সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবী রাশেদ ইসলাম খবরের কাগজকে তার অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি প্রতি শুক্রবার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে পথশিশুদের নিয়ে ফিল্ডওয়ার্ক করে থাকেন। এই ফিল্ডে শিশুদের অনানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা, প্রাথমিক চিকিৎসা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা করা ও স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতাবিষয়ক শিক্ষা দেওয়া হয়। এ ছাড়াও শিশুদের মননের বিকাশের জন্য শিক্ষামূলক কার্টুন ও ভিডিওক্লিপ দেখানো হয়। রাশেদ জানান, শিশুরা সবচেয়ে বেশি উপভোগ করে খেলাধুলা। সারা সপ্তাহজুড়ে বিভিন্ন কারণে তাদের যে মানসিক অবসাদ জমা হয়, এক দিনের ফিল্ডে খেলাধুলার মাধ্যমে মানসিকভাবে উৎফুল্ল থাকে তারা। রাশেদ হাসান আরও বলেন, ‘শুধু শারীরিক খেলাধুলাই না, শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য বিভিন্ন রকম ব্রেন-স্পোর্টসেরও আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে পাজল, সুডুকো, সংখ্যার খেলা শিশুরা বেশি পছন্দ করে। সারা সপ্তাহ শেষে এক দিন মন ভরে খেলতে পারবে বলে এদিন শিশুরা দলে দলে ছুটে আসে এই ফিল্ডে।’

তবে একটি শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য শুধু খেলাধুলা নয়, দরকার অন্যান্য সুস্থ বিনোদনের মাধ্যমও। বই পড়া, ছবি আঁকা, গান শোনা, ভালো সিনেমা দেখা ও কার্টুন দেখা শিশুর জীবন গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখে। একটি শিশুর বেড়ে ওঠা প্রয়োজন আপাদমস্তক ইতিবাচক ও সৃজনশীল পরিবেশে। তবে রকিবের মতো পথশিশুদের সে সুযোগ কোথায়?

দাশেরকান্দি পয়োশোধনাগার: বাজেট ও মেয়াদ শেষ হলেও প্রকল্প সম্পূর্ণ হয়নি

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ১১:৪৫ এএম
আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২৬, ১২:০৪ পিএম
দাশেরকান্দি পয়োশোধনাগার: বাজেট ও মেয়াদ শেষ হলেও প্রকল্প সম্পূর্ণ হয়নি
ছবি: খবরের কাগজ

৩ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। এর মধ্যে চীন ঋণ হিসেবে দিয়েছে ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। তার পরও গুলশান, বনানী, বসুন্ধরা, ভাটারা, বাড্ডা, বারিধারা এলাকার বর্জ্য নিয়ে আসার জন্য প্রয়োজনীয় পাইপলাইন বা স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণরূপে তৈরি হয়নি। ফলে প্ল্যান্টটি পূর্ণ ক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। সক্ষমতার অর্ধেক বর্জ্য পরিশোধন হচ্ছে।

লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আয় হচ্ছে না। তারপরও ২০২৭ সাল থেকে এই ঋণের কিস্তি টানতে হবে। এ ছাড়া বর্জ্যশোধনের নির্গত ধোঁয়া থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। সম্ভাব্যতা যাচাই করার পরও পরিকল্পনায় ত্রুটি থেকে গেছে। আড়াই বছর আগে কাজ শেষ হলেও পরিবহনপুলে জমা হয়নি জিপগাড়ি, পিকআপ ও মোটরসাইকেল। দাশেরকান্দি পয়োশোধনাগার প্রকল্পটির এই হচ্ছে বাস্তব চিত্র। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে। 

এটি দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম পয়োশোধনাগার ও দেশের প্রথম আধুনিক বড় আকারের শোধনাগার। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রার মাত্র এক-চতুর্থাংশ বর্জ্য পরিশোধন করতে পারছে। রাজধানীর পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে ঢাকা ওয়াসার মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে দাশেরকান্দি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। ২০১৫ সালের ২৫ আগস্টে প্রকল্পটি অনুমোদন পায় একনেক সভায়।

২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়ন করার জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়। তখন খরচ ধরা হয় ৩ হাজার ৩১৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে চীনের ঋণ ধরা হয় ২ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা। বাকি ১ হাজার ১২৪ কোটি টাকা সরকারি কোষাগার থেকে খরচ করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ হয়নি। দুই বার সংশোধন করে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। খরচও বাড়ানো হয় ৩ হাজার ৭১২ কোটি টাকা। পরে খরচ ধরা হয় ৩ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। 

প্রকল্পের প্রধান প্রধান কাজ ধরা হয় ৭৪ কোটি টাকা খরচ করে স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট একটি, ট্রাংক স্যুয়ারেজ লাইন প্রায় ১০ কিলোমিটার ও স্যুয়ারেজ লিফটিং স্টেশন একটি। লক্ষ্য ছিল ঢাকা মহানগরীর জন্য পরিবেশসম্মত ও টেকসই পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও জনসম্পদের দূষণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা এবং ঢাকা শহরের গুলশান, বারিধারা, কুড়িল, সংসদ ভবন এলাকা, ফার্মগেট, আফতাব নগর, হাতিরঝিল এলাকার সৃষ্ট পয়োবর্জ্য পরিশোধন করে বালু নদীতে নিষ্কাশিত করার মাধ্যমে পানি ও পরিবেশ দূষণ রোধ করা। এ ছাড়া সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার ফেজ-১ ফেজ-২-এর ইনটেক পয়েন্টে শীতলক্ষ্যা নদীর পানির দূষণ কমানো। 

এসব কাজ করার জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যাতায়াতের জন্য ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা খরচ করে একটি ডাবল কেবিন পিকআপ, একটি জিপ গাড়ি ও ৫টি মোটরসাইকেল কেনা হয়। আড়াই বছর আগে কাজ শেষ হয়েছে। তার পরও পরিবহন পুলে জমা দেয়নি এসব গাড়ি। ঢাকা ওয়াসায় ব্যবহার করা হচ্ছে। পরামর্শকদের পেছনে খরচ করা হয় ২৫ কোটি টাকা। এভাবে বিভিন্ন খাতে ৩ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও সংশ্লিষ্ট এলাকার স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্ক এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। ফলে শোধনাগার নির্মাণ শেষ হলেও প্রয়োজনীয় বর্জ্য সেখানে পৌঁছাচ্ছে না। 

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্ল্যান্টটির নকশাগত সক্ষমতা দৈনিক ৬০০ মিলিয়ন লিটার (এমএলডি) বা ৬০ কোটি লিটার বর্জ্য পরিশোধনের। কিন্তু স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্ক অসম্পূর্ণ থাকায় বর্ষাকালে ৪৮০ এমএলডি ও শুষ্ক মৌসুমে এটি মাত্র ৩০০ এমএলডি সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে। ফলে বিপুল বিনিয়োগের পরও কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। প্রত্যাশিত রাজস্বও অর্জিত হচ্ছে না। অথচ ২০২৭ সাল থেকে এই ঋণের কিস্তি দেওয়া শুরু হবে। অথচ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আয় হচ্ছে না। ফলে এই প্রকল্পটি ঋণের বোঝাস্বরূপ। প্রকল্প চালুর আগেই বর্জ্য সংগ্রহের লাইন তৈরি করা দরকার ছিল।

ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আগে থেকেই জানত। তারপরও নেটওয়ার্ক তৈরি না করে প্ল্যান্ট নির্মাণের কাজ শেষ করে, যা পরিকল্পনার বড় ধরনের অসংগতি। দীর্ঘ ৯ বছরে ৭৪টি অডিট আপত্তি তোলা হলেও মাত্র ২০টির নিষ্পত্তি হয়েছে। এখনো ৫৪টি আপত্তি অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে। কাজের মান দেখভাল করার জন্য বছরে ৩টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) ও প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি (পিএসসি) সভা করার কথা। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা মাত্র ২০ শতাংশ পিআইসি ও ১১ শতাংশ পিএসসি সভা হয়েছে। 

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রামপুরা-বাড্ডা এলাকার পয়োলিফটিং স্টেশন ও দাশেরকান্দি প্ল্যান্টে কঠিন বর্জ্য পৃথক করে সংরক্ষণের যে ব্যবস্থা রয়েছে তার একটি অংশ অকেজো অবস্থায় থাকায় সেবাদান ব্যাহত হচ্ছে। হাতিরঝিল খালের পানির মান আগের তুলনায় উন্নত হলেও গুলশান-১ গুদারাঘাট এলাকা এখনো দুর্গন্ধের জন্য চলাচল কষ্টকর হচ্ছে। প্রথম প্রকল্প পরিচালক ছিলেন প্রকৌশলী মো. মোহসিন আলী মিয়া ও পরে প্রকৌশলী মো. মমতাজুর রহমান। 

হাতিরঝিল উত্তর ও দক্ষিণ পাশের বিদ্যমান ১১টি স্পেশাল স্যুয়ারেজ ডাইভার্সন স্ট্রাকচার (এসএসডিএস) এর মাধ্যমে সংযুক্ত এলাকার পয়োবর্জ্য সরাসরি রামপুরা খালের মাধ্যমে বালু হয়ে শীতলক্ষ্যা নদীতে নিষ্কাশনের পরিবর্তে এই প্ল্যান্টে শোধন করা হচ্ছে। ফলে বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর পানি দূষণ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। 

দুর্নীতিসংশ্লিষ্টদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি (সম্ভাব্যতা যাচাই) করার পরও পরিকল্পনায় ত্রুটি থেকে গেছে। ফলে এত টাকা খরচ করেও প্রকল্পটি প্রত্যাশিত কাজে আসছে না। ঘোড়ার আগে গাড়ি কেনা হয়েছে। এখানে দুর্নীতি হয়েছে। আসলে প্রকল্পের অর্থনৈতিক ও কারিগরি সম্ভাব্যতা যাচাই যথাযথভাবে হয়েছিল কি না, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। প্রকল্পের সঙ্গে যারাই

সংশ্লিষ্ট তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। তা না হলে অন্যরা আবার এভাবে অর্থের অপচয় করবেন।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে ঢাকা ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আলমগীর হাছিন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। পরে উপপ্রধান জনতথ্য কর্মকর্তা মো. আব্দুল কাদেরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘এটা একটা টেকনিক্যাল প্রকল্প। সংশ্লিষ্ট যারা আছেন তাদের সঙ্গে কথা বলে তথ্য নিতে সময় লাগবে।’

এনসিটি পরিচালনার ভার পাচ্ছে ডিপি ওয়ার্ল্ড!

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৯ এএম
আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩২ এএম
এনসিটি পরিচালনার ভার পাচ্ছে ডিপি ওয়ার্ল্ড!
চট্টগ্রাম বন্দর/ ছবি: সংগৃহীত

সরকারের চলমান কার্যক্রম ও চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যানের সম্প্রতি দেওয়া বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত মিলছে যে, বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার ভার সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছেই যাচ্ছে। কিন্তু এই টার্মিনালের পরিচালনার ভার বিদেশিদের না দিতে ৫ মাস আগে ৭ দিনের কর্মবিরতি দিয়ে বন্দর অচল করে দেয় বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সংগঠন। বর্তমানে এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়ার বিষয়টি আবার আলোচনায় এলেও নীরব ভূমিকায় রয়েছেন ৫ মাস আগে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতারা।

গত ৪ জুন এই বিষয়ে দুটি দাপ্তরিক চিঠি ইস্যু করে মন্ত্রণালয়। প্রথম চিঠিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে উদ্দেশ করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন-১ অধিশাখার সিনিয়র সহকারী সচিব ফারজানা হোসেন স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের এনসিটি টার্মিনাল পরিচালনা প্রতিষ্ঠান নিয়োগের লক্ষ্যে চলমান নেগোসিয়েশন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অথবা নেগোসিয়েশন এগিয়ে নিতে ইচ্ছুক না হলে, সে ক্ষেত্রে এ প্রক্রিয়া বাতিল করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

সেদিন প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে পর্যালোচনা করতে নৌপরিবহনমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভা শেষে মন্ত্রণালয়ের একই কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত আরেকটি চিঠি ইস্যু হয়। ওই চিঠিতে বন্দর চেয়ারম্যানের উদ্দেশে বলা হয়, পিপিপি প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যালোচনার লক্ষ্যে নৌপরিবহনমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ৪ জুনের সভার আলোচনা মোতাবেক ওই প্রকল্পের পরিচালনা প্রতিষ্ঠান নিয়োগের লক্ষ্যে নেগোসিয়েশন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। বর্তমানে সরকার এনসিটি নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে দর-কষাকষির পর্যায়ে রয়েছে। 

এদিকে গত ১ জুলাই বন্দরের ওয়ান স্টপ সার্ভিস ভবনের উদ্বোধন শেষে এনসিটি ইস্যুতে বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, সম্প্রতি দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ইউএই প্ল্যাটফর্ম বৈঠকে এনসিটির বিষয়টি আবারও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এরপর সরকার একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করেছে, যা পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করছে। 

কোনো কিছু গোপন করা হবে না জানিয়ে বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, আলোচনা ও দর-কষাকষিতে বাংলাদেশের স্বার্থে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। দেশের স্বার্থই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। সরকারের ওপর আস্থা রাখুন। পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে পরিচালিত হচ্ছে। কোনো কিছু গোপন করা হবে না এবং এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না, যা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে। 

বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান আরও বলেন, আরব আমিরাতে আমাদের প্রায় ২৬ লাখ প্রবাসী আছেন। দেশটি থেকে প্রতিবছর প্রায় ৪ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আমাদের দেশে আসে। বিভিন্ন কারণে এতদিন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এ কারণে বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে পারস্পরিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নেও মাঝেমধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। 

সরকারের কার্যক্রম ও বন্দর চেয়ারম্যানের বক্তব্য থেকে ধারণা করা যায়, এনসিটি পরিচালনার ভার ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দিতেই সব প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। 
পাঁচ মাস আগের সেই সরব আন্দোলন এখন কেন নীরবতায় রূপ নিল তা জানার চেষ্টা করেছে খবরের কাগজ। এই নীরবতা কি আন্দোলনের নয়া কৌশল নাকি বন্দর শ্রমিক নেতাদের সমর্থিত দল ক্ষমতায় থাকার কারণই জোরদার আন্দোলনের পথে বড় বাধা, তা বের করার চেষ্টা করেছে প্রতিবেদক।

পাঁচ মাস আগে কেমন ছিল আন্দোলনের গতি চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি দুপুরে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি প্রক্রিয়া বৈধ বলে রায় দেন হাইকোর্ট। সেদিন বেলা সাড়ে ১১টায় ওই রায়কে কেন্দ্র করে অফিস চলাকালীন চট্টগ্রাম বন্দরের কিছু কর্মচারী বন্দর ভবনে, ফয়ারে এবং বন্দর ভবন এলাকায় মিছিলে অংশ নেন। সেখানে নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন ও হুমায়ুন কবীর এবং বন্দর শ্রমিক দলের সদস্য আনোয়ারুল আজীম ও ফরিদুর রহমান।

বন্দরের কোনো টার্মিনাল বিদেশিদের ইজারা না দিতে দফায় দফায় আন্দোলন চালিয়ে যায় চট্টগ্রাম সুরক্ষা কমিটি, চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল, চট্টগ্রাম বন্দর ইসলামী শ্রমিক সংঘ, গণ-অধিকার পরিষদ, বাংলাদেশে জুয়েলারি সমিতি চট্টগ্রাম বিভাগ, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দেশপ্রেমিক জনগণ প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টিসহ (সিপিবি) বিভিন্ন রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সংগঠন।

এনসিটি বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা না দেওয়াসহ বিভিন্ন দাবিতে গত ৩১ জানুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি (৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি বাদে) পর্যন্ত সাত দিনের ধর্মঘট পালন করেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। এই ধর্মঘটের কারণে পণ্য সরবরাহে ভাটা পড়ে। ইয়ার্ডে বাড়তে থাকে কনটেইনারের সারি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রমজানের পণ্য খালাসের স্বার্থে ৯ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধর্মঘট স্থগিত রাখে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। এই অচলাবস্থার কারণে হাজার হাজার কোটি টাকার লোকসানের মুখে পড়ে বন্দর। 

পরবর্তী সময় কর্মসূচি নিয়ে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি আলোচনায় বসলেও আর কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করেনি সংগঠনটির নেতারা। মূলত ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জোরদার ছিল আন্দোলন। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ক্ষমতায় আসে বিএনপি। এরপর থেকেই নীরব ভূমিকা পালন করে আসছে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ, বন্দর শ্রমিক দলসহ অন্যান্য রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সংগঠন। 

বর্তমানে আন্দোলন কারা চালিয়ে যাচ্ছে

এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) এবং চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটি। ইজারা প্রক্রিয়া বাতিলসহ বিভিন্ন দাবি নিয়ে তারা স্মারকলিপি প্রদান, সমাবেশ ও মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে।

হঠাৎ নীরবতার কী কারণ? 

বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকনের সঙ্গে গত ৮ জুন ও ১৬ জুন কথা হলে তিনি জানান, সরকার এনসিটি ইস্যুতে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিলে আন্দোলন জোরদার করা হবে। এরপর স্কপ বা বন্দর রক্ষা কমিটি বিভিন্ন কর্মসূচি দিলেও তার সংগঠন ছিল নীরব। সম্প্রতি বন্দর চেয়ারম্যান এনসিটি ইস্যুতে মুখ খুললে স্কপ বা বন্দর রক্ষা কমিটি সঙ্গে সঙ্গে বিবৃতি দিলেও নীরব ভূমিকায় ছিল বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। অথচ ফেব্রুয়ারির আন্দোলনের সময় বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতারা অগ্রণী ভূমিকায় ছিলেন। 

এই নীরবতার কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু ধারণা পাওয়া যায় বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের আরেক সমন্বয়ক ও বন্দর শ্রমিক দলনেতা হুমায়ুন কবীরের বক্তব্যে। গতকাল রবিবার তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আমরা যেভাবে আন্দোলন করেছিলাম, সেখান থেকে এক চুলও বিচ্যুত হইনি। আগে যেভাবে আন্দোলন করেছি, সে আন্দোলন করতে আমরা এখনো প্রস্তুত। যেহেতু এখন আমাদের সরকার ক্ষমতায়, এনসিটি-সিসিটি ইস্যুতে আমরা সরকারকে বোঝাতে চাই এবং সে পদক্ষেপ আমরা নিয়েছি। কিন্তু সরকার যদি না বোঝে তখন শ্রমিকের স্বার্থে যেটা করার আমরা সেটা করব।’

হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘আগের সরকার ছিল অরাজনৈতিক সরকার, তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। এখন গণতান্ত্রিক সরকার। আমরা বিশ্বাস করি, বর্তমান সরকার এ রকম কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না। ইতোমধ্যে আমাদের ওই রকমই কথা হয়েছে। গোপনীয়তার স্বার্থে আমরা অনেক কথা বলতে পারি না। আমরা আশা করছি সরকারকে এই ব্যাপারে বোঝাতে সক্ষম হয়েছি। আমরা আগামী সপ্তাহে সংবাদ সম্মেলন করব। সেখানে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট করব।’ 

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা দল করি বলেই সরকারকে বোঝানোর চেষ্টা করছি। আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করার চেষ্টা করছি। সরকার যদি না বোঝে তখন আমাদের ভিন্ন চিন্তা করতেই হবে।’ 

এনসিটির যন্ত্রপাতির মেয়াদ নিয়ে ভিন্ন তথ্য

গত ১ জুলাই ওয়ান স্টপ সার্ভিস ভবনের উদ্বোধন শেষে এনসিটি ইস্যুতে কথা বলেন বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান। কথার একপর্যায়ে তিনি বলেছিলেন, বন্দরের অধিকাংশ ক্রেন ও যন্ত্রপাতি পুরোনো হয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী যন্ত্রপাতির সচল থাকার হার ৯৩ শতাংশের বেশি হওয়া প্রয়োজন হলেও বর্তমানে তা প্রায় ৭০ শতাংশে নেমে এসেছে। আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে এ হার আরও কমে প্রায় ৫০ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তখন কিন্তু আমরা এখন যে অর্জন দেখাচ্ছি সেটিও বাধার সম্মুখীন হবে। নিজস্ব অর্থায়নে নতুন যন্ত্রপাতি কিনতে চাইলে তিন থেকে চার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। এর সঙ্গে ভ্যাট-ট্যাক্স যুক্ত হয়ে ব্যয় আরও বাড়বে এবং পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে তিন থেকে চার বছর সময় লাগতে পারে। কিন্তু ডিপি ওয়ার্ল্ড দায়িত্ব পেলে তাদের বিনিয়োগে এক বছরের মধ্যে যন্ত্রপাতি বসাবে। কারণ যন্ত্রপাতি বসিয়ে তো তাদের আয় করতে হবে। লাভ না করলে তারা বিনিয়োগ কেন করবে? 

কিন্তু খবরের কাগজের সঙ্গে আলাপকালে গত ১৬ জুন বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন জানান, বর্তমানে এনসিটিতে বসানো যন্ত্রপাতির মেয়াদ রয়েছে ১৫ বছরের ওপরে। এখানে নতুন করে বিনিয়োগের কিছু নেই। 

অপরদিকে গতকাল হুমায়ুন কবীরও একই সুরে বলছেন, আমাদের যন্ত্রপাতিগুলো একেবারেই আধুনিক এবং সক্ষম। আমরা বন্দর চেয়ারম্যানের সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্বে জড়াতে চাই না। চেয়ারম্যান তার দৃষ্টিভঙ্গিতে কথা বলেছেন। আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখি আমাদের যন্ত্রপাতিগুলো একেবারেই আধুনিক এবং সক্ষম। আমাদের যন্ত্রপাতি ভালো আছে তার প্রমাণ হলো- আমরা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৫ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছি, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় ৭ শতাংশ বেশি। যন্ত্রপাতি ভালো আছে বলেই তো এটা সম্ভব হয়েছে।

সেদিন এনসিটি ইস্যুতে আর যা বলেছিলেন বন্দর চেয়ারম্যান

গত ১ জুলাই বন্দর চেয়ারম্যান আরও বলেন, ২০১৯ সাল থেকেই এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং প্রতিটি ধাপ আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখেই এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বন্দর কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের নয়; এটি দেশের ১৮ কোটি মানুষের সম্পদ। এনসিটি-সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত রাষ্ট্র, জনগণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়া হবে।

তিনি জানান, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের (জি-টু-জি) প্ল্যাটফর্ম বৈঠকে প্রথম ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি পরিচালনার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এরপর পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রকল্প হিসেবে বিষয়টি এগিয়ে নিতে লেনদেন-পরামর্শক (ট্রানজ্যাকশন অ্যাডভাইজার) নিয়োগ দেওয়া হয়। এ প্রক্রিয়ায় বিশ্বব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আইএফসিও যুক্ত রয়েছে।

তবে এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে আরও জানতে গতকাল বন্দর চেয়ারম্যানকে ফোন দিলে তিনি কল রিসিভ করেননি। 

চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক খবরের কাগজকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর আমাদের সবার সম্পদ। বন্দর শুধু চট্টগ্রাম নয়, পুরো দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এখানে বিদেশি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই সবকিছু যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যেন এটি সবার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে।

এনবিআরের অদক্ষতায় নিষ্পন্ন হচ্ছে না রাজস্ব মামলা!

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:১১ এএম
আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০১:১৫ পিএম
এনবিআরের অদক্ষতায় নিষ্পন্ন হচ্ছে না রাজস্ব মামলা!
ছবি: খবরের কাগজ

১০-১৫ বছর বা এর আগেরও বহু রাজস্ব মামলা আদালতে অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়ে আছে। কবে এসব নিষ্পন্ন হবে তার সময় জানাতে পারেনি কেউ। প্রায় ৩১ হাজার রাজস্ব মামলা অনিষ্পন্ন থাকায় প্রায় এক লাখ কোটি টাকার রাজস্ব অনাদায়ী রয়েছে। এর সঙ্গে নতুন রাজস্ব মামলা যোগ হচ্ছে। ফলে অনাদায়ী রাজস্বের পরিমাণও বাড়ছে। অর্থনীতির বিশ্লেষকরা রাজস্ব মামলা নিষ্পন্ন না হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দক্ষতা-সক্ষমতার অভাবকে দায়ী করেছেন। 

  • দেশে আয়কর, মূসক ও শুল্কসংক্রান্ত প্রায় ৩১ হাজার ৭০০টি রাজস্ব মামলা দীর্ঘদিন ধরে আদালতে অনিষ্পত্তি অবস্থায় রয়েছে।
  • এসব মামলায় জড়িত রাজস্বের পরিমাণ প্রায় এক লাখ কোটি টাকা, যা এখনো আদায় করা সম্ভব হয়নি।
  • অনেক রাজস্ব মামলা ১০ থেকে ১৫ বছর, এমনকি এক বা দুই যুগ ধরে আদালতে ঝুলে আছে।

মামলা সম্পর্কে দায়িত্বরত এনবিআর কর্মকর্তাদের ধারণা কম থাকা, আদালতে সময়মতো তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে না পারা, মামলা শেষ হওয়ার আগেই দায়িত্বরত কর্মকর্তার বদলি হওয়াও রাজস্ব মামলা নিষ্পন্নতে বিলম্ব হওয়ার কারণ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। 

অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, অভিজ্ঞ আইনজীবীদের ফি বেশি থাকে। কিন্তু রাজস্ব মামলা পরিচালনায় বাজেট কম থাকে। এই বাজেটে অভিজ্ঞ আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয় না। এমন পরিস্থিতিতে রাজস্ব মামলা পরিচালনায় কম ফিয়ের অল্প অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আইনজীবী নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়। এতে মামলা পরিচালনায় দক্ষতার ঘাটতি থাকে। 

তারা দাবি করেন, অনাদায়ী রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হলে এনবিআরের হিসাবে ঘাটতি থাকবে না, বরং লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি রাজস্ব আদায় হবে। ফলে সরকারের অর্থসংকট কমবে। দেশের অর্থনীতিতে গতি আসবে। 

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, এক/দুই যুগ আগে করা বহু রজস্ব মামলা এখনো আদালতে পড়ে আছে। এর সঙ্গে নতুন নতুন মামলা যুক্ত হচ্ছে। কবে এসব মামলা নিষ্পত্তি হবে তা বলা সম্ভব না। ফলে এসব মামলায় জড়িত প্রায় এক লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়া কবে শেষ হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। 

তিনি বলেন, ‘আমি যখন এনবিআরের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি তখন অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসে যোগাযোগ করেছি। বিশেষ আদালত গঠন করে আদালতে জমে থাকা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু বিষয়টির খুব একটা অগ্রগতি হয়নি।’

আদালতে রাজস্ব মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ার কারণ হিসেবে এনবিআরে প্রস্তুতির অভাবকে দায়ী করে রাজস্ব খাতের এই বিশ্লেষক বলেন, এনবিআরের দক্ষ কর্মকর্তারা মামলা নিষ্পত্তিসংক্রান্ত কাজে জড়িত থাকতে বেশির ভাগ সময়ে আগ্রহী হন না। অনেক সময় মামলা সম্পর্কে রাজস্ব কর্মকর্তার জানাশোনায় ঘাটতি থাকে। মামলা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার জানাশোনা বাড়তে থাকলে অনেক সময় তাকে বদলি করে দেওয়া হয়। নতুন কর্মকর্তা এসে মামলা পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে তাকে প্রথম থেকে বুঝতে হয়। এতে মামলা নিষ্পত্তিতে সময় লেগে যায়।
 
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক সাবেক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, ‘মামলা নিষ্পত্তিতে আদালতে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। তথ্য-প্রমাণ জোগাড়েও অনেক ভোগান্তি হয়। এর চেয়ে মাঠপর্যায়ের কাজে ঝামেলা কম। এ ছাড়া মাঠপর্যায়ের অনৈতিক সুবিধা পাওয়ার সহজ সুযোগও বেশি থাকে। তবে মতিউরের মতো এমন অনেক কর্মকর্তা এখনো এনবিআরে আছেন।’ এদের মতো কর্মকর্তারা আদালতে এনবিআরের বিপক্ষদের কাছ থেকে মোটা অঙ্ক নিয়ে কৌশলে মামলা পরিচালনায় সময় ক্ষেপণ করেন বলেও জানান এই কর্মকর্তা। এনবিআরের তদন্তেও মামলায় বিপক্ষদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে এনবিআরসংশ্লিষ্টদের মামলায় সময়ক্ষেপণের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। 

অর্থনীতির আরেক সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসির উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, সাধারণত করদাতা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাওনা রাজস্ব আদায় করতেই এনবিআরে তলব করা হয়। এরপর চূড়ান্ত নোটিশ দেয় বা হিসাব জব্দের মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। মামলা করে সাধারণত করদাতা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এনবিআরের পাওনা পরিশোধের প্রয়োজন হয় না। এটাকে করদাতা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সুবিধা হিসেবে দেখে। এটা আসলে কর ফাঁকি দেওয়ার একটি কৌশল। এসব মামলা নিষ্পত্তি করতে হলে এনবিআরকে আরও কৌশলী ও দক্ষ হতে হবে। সরকার আসে সরকার যায়, কিন্তু আদালতে রাজস্ব মামলার সংখ্যা কমছে না, বরং বাড়ছে।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, রাজস্ব-জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) হার আগের চেয়ে কমে ৮ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে। চলতি অর্থবছর শেষে ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ৮৮ হাজার কোটি টাকা থেকে ৯০ হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি। মামলা করা না করে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) আইনের আওতায় মামলা নিষ্পত্তিতে গুরুত্ব বাড়াতে হবে। আশা করি, নতুন সরকার বিষয়টি ভেবে দেখবে। 

এনবিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের আদালতে আয়কর, মূসক ও শুল্কসংক্রান্ত মোট মামলার পরিমাণ ৩১ হাজার ৭০০টি। জড়িত অর্থের পরিমাণ ৯৯ লাখ ৭০০ কোটি টাকা। কমপক্ষে ৪ হাজার ৭০০ করসংক্রান্ত মামলার বিপরীতে জড়িত অর্থের পরিমাণ অন্তত ৩৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। মূসকের মামলার পরিমাণ ১১ হাজারের বেশি, জড়িত অর্থের পরিমাণ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। শুল্কের মামলার সংখ্যা ১৫ হাজারের বেশি। এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রামেই ১২ হাজার মামলা চলমান। জড়িত অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা।

মামলাজটের এমন বেহাল দশায়ও নতুন করে এনবিআর আরও প্রায় এক লাখ রিটার্ন অডিটের কাজ শুরু করেছে। এরই মধ্যে ৯২ হাজার ৮৪৯ করদাতাকে অডিটের জন্য বাছাই করে এনবিআরের ওয়েবসাইটে (nbr.gov.bd) প্রকাশ করেছে। এনবিআর সূত্র জানায়, অডিটে নিষ্পত্তি না হলে অনেকে নতুন করে মামলা করবে। এতে আদালতে মামলার সংখ্যা আরও বাড়বে। 

বাংলাদেশ ভ্যাট প্রফেশনালস ফোরামের চেয়ারম্যান ড. মো. আব্দুর রউফ খবরের কাগজকে বলেন, মামলাজট দীর্ঘদিনের বিষয়। এসব মামলাজট কমানোর জন্য এনবিআরকে নতুন কৌশলে যেতে হবে। 

তিনি বলেন, ২০১১ সালে মামলাজট কমানোর জন্য এডিআর পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়েছিল। তবে এ পদ্ধতিও মামলাজট কমাতে সফল হয়নি।

রাজস্ব খাতের এই বিশেষজ্ঞ বলেন, সবচেয়ে বেশি মামলা আছে বর্তমানে হাইকোর্ট বিভাগে। হাইকোর্ট বিভাগে শুধু ভ্যাটসংক্রান্ত মামলা আছে প্রায় ৪ হাজার ৫০০, যেখানে রাজস্ব জড়িত আছে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা। ভ্যাট অফিস, অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস এবং আদালত একত্রে ক্রাশ প্রোগ্রাম গ্রহণ করে অন্তত সমজাতীয় মামলাগুলো নিষ্পত্তি করা যায়। এর জন্য এনবিআরসংশ্লিষ্টদের দক্ষতা বাড়াতে হবে।
 
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি ও ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তাসকীন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, রাজস্ব আইন ও বিধির ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা, দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং কর নির্ধারণে মতপার্থক্যের কারণে মামলা বাড়ছে। ব্যবসায়ী এই নেতা বলেন, কর নির্ধারণ, মূল্যায়ন ও রিটার্ন যাচাইয়ের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু হলে ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তের সুযোগ কমে যাবে, ফলে করদাতা ও কর প্রশাসনের মধ্যে বিরোধও হ্রাস পাবে, যা ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।

কর্ণফুলী টানেল: নিয়ম ভেঙে লুটপাটের মহোৎসব

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৩ এএম
আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৮ এএম
কর্ণফুলী টানেল: নিয়ম ভেঙে লুটপাটের মহোৎসব
ছবি: খবরের কাগজ

কর্ণফুলী টানেল নির্মাণে সরকারি অর্থের নয়ছয় ও লুটপাটের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে মহা-হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের (সিএজি) নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সরকারি বিধিমালা লঙ্ঘন করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অবৈধভাবে হয়েছে নানা সমঝোতা। ভেরিয়েশন অর্ডারের নামে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান, কাজের দাম বাড়িয়ে দেখানো এবং ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে এই প্রকল্প থেকে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির ফলে কেবল সরকারি অর্থের অপচয়ই হয়নি, বরং রাষ্ট্রের রাজস্বের বড় একটি অংশ হাতছাড়া হয়েছে। ২০১৫-১৬ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত সব মিলিয়ে ১ হাজার ৯০১ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে বলে সিএজির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 

২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঠিকাদার লুটে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা

২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঠিকাদার প্রকৃতপক্ষে যতটুকু কাজ করেছেন বা খরচ করেছেন তার চেয়ে বেশি টাকা তাকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের ১০ কোটি ২৯ লাখ টাকা গচ্চা গেছে। ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে সময়মতো নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়নি। অথচ জরিমানা না করে ঠিকাদারকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের ২৮৬ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এটি একটি বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম।
সরকারি কেনাকাটাসংক্রান্ত আইন অমান্য করে এবং কোনো প্রতিযোগিতা (টেন্ডার) ছাড়াই ২১ কোটি ২৫ লাখ টাকা খরচ করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত।

কেনাকাটায় বিস্তর অনিয়ম, দেদার লুটপাট

সিএজির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়কে নির্মাণকাজের ব্যয় হিসেবে দেখানোর চেষ্টাও করা হয়েছে। এতে সরকারের ৪৮ কোটি টাকা অপচয় হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ প্রকল্পের নকশা, নির্মাণ উপাদান সংগ্রহ এবং নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে প্রকল্প কর্মকর্তাদের বুঝিয়ে দিতে ‘টার্ন কি’ চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির আওতায় ভেরিয়েশনের মাধ্যমে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত ৫৮ কোটি টাকা দেওয়া হয়। প্রকল্প তত্ত্বাবধানে পরামর্শক থাকা সত্ত্বেও আলাদা করে নির্মাণকাজের পরামর্শক নিয়োগে ব্যয় দেখানো হয়। এতে সরকারের ৭০ কোটি টাকারও বেশি অর্থের অপচয় হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস (বিবিএস) পণ্যের যে দাম নির্ধারণ করে রেখেছিল, সরকারি কেনাকাটায় তার চেয়ে বেশি দাম দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ বিদেশি পণ্য কেনার সময় নিয়ম লঙ্ঘন করে উচ্চমূল্য দেখানো হয়েছে। এতে ৪২ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ হয়েছে। অন্যায্য মূল্য সমন্বয়ের কারণে সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে ২২৪ কোটি টাকা। টানেলের জন্য প্রয়োজন না হওয়া সত্ত্বেও সার্ভিস এরিয়া নির্মাণের জন্য ৫০৩ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে। প্রকল্পের সাইট অফিসে বাংলো মেরামতে অস্বাভাবিক উচ্চব্যয় দেখানো হয়েছে। এতে ১০ কোটি টাকা অর্থের অপচয় হয়েছে। ডিজেল জেনারেটর কিনতেও ৬ কোটি টাকা অপচয় করা হয়েছে।

একই কাজের জন্য টাকা একবার খরচ হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন খাতে ঘুরিয়ে সেটাকে অস্বাভাবিকভাবে বড় অঙ্কের খরচ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এতে সরকারের ২৫০ কোটি টাকা অপচয় করা হয়েছে।

প্রকল্প শেষ হওয়ার পর ব্যবহৃত যানবাহনগুলো নিয়ম অনুযায়ী মূল প্রকল্পে ফেরত বা জমা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেগুলো ফেরত না দিয়ে ব্যক্তিগত বা অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে সরকারের ১৪ কোটি টাকা মূল্যের অর্থের অপচয় হয়েছে। ঝোপঝাড় পরিষ্কার না করে এবং আনুষঙ্গিক বৃক্ষরোপণ কাজ সম্পন্ন না করায় সরকারের ৪৯ কোটি টাকা অপচয় হয়েছে। পরামর্শকদের থাকা-খাওয়া বাবদ ৮ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারি ক্রয় বিধিমালা অনুসরণ না করে প্রকল্পের কাজের পরিধি পরিবর্তন করা হয়েছে; যাকে ‘ভেরিয়েশন অর্ডার’ বলে। এতে সরকারের ৭৩ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ করা হয়েছে। পরামর্শকের পাওনা থেকে আয়কর কম কর্তন করা হয়েছে। এতে সরকারের প্রায় ৯ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। সাব-কন্ট্রাক্টরকে বিল পরিশোধ করার সময় নির্ধারিত ভ্যাট কেটে রাখা হয়নি। এতে সরকারের ২ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।

অর্জিত ব্যাংক সুদ জমা হয়নি কোষাগারে

২০২১-২২ অর্থবছরে প্রকল্পের অর্জিত ব্যাংক সুদ সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ায় সরকার ২ কোটি টাকার রাজস্ব হারায়। তখন সরকারি ক্রয় পদ্ধতির তোয়াক্কা না করে, কাজের সঠিক দাম যাচাই না করে ঠিকাদারদের সঙ্গে চুক্তি করে ফেলেন প্রকল্প কর্মকর্তারা। এতে ৬ কোটি টাকার অনিয়ম ধরা পড়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পে দাতা সংস্থা থেকে সরাসরি ঠিকাদার বা সরবরাহকারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অর্থ পরিশোধ প্রক্রিয়ায় ১৪ কোটি টাকা নয়ছয় করা হয়েছে।

২০১৯-২০, ২০২০-২১ এই দুই অর্থবছরে প্রকল্প কর্মকর্তারা আইএফআইসি ও মিডল্যান্ড ব্যাংকে অনিয়মিতভাবে ফিক্সড ডিপোজিট রিসিট এফডিআর (FDR) কেনাকাটা করেন। এতে সরকারের ১৫ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। ওই দুই অর্থবছরের আর্থিক বিবরণীতে উল্লিখিত আমদানি শুল্ক ও মূল্য সংযোজন করের সমাপনী স্থিতি এবং চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের স্থিতির মধ্যে বিস্তর তফাত পাওয়া যায়। এতে ৩৩ কোটি টাকারও বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে অডিট আপত্তি এসেছে। ভূমি অধিগ্রহণের জন্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনকে অগ্রিম অর্থ দেওয়া হলেও কর্মকর্তারা প্রকল্প কার্যালয়ে কাঙ্ক্ষিত জমি হস্তান্তর করেনি। এতে ১০৫ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে।

২০১৯-২০, ২০২০-২১ অর্থবছরের চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কমিউনিকেশনকে ট্যাগ বোট ক্রয়ের জন্য অতিরিক্ত ১ কোটি টাকা দেওয়া হয়। প্রকল্পের ক্রয় প্রস্তাবনায় না থাকলেও ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার তৈরির জন্য এই প্রতিষ্ঠানকে ৪৯ লাখ টাকা বিল দেওয়া হয়।

শুরু থেকেই ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ

২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রকল্প কার্যালয় থেকে ঠিকাদারদের অগ্রিম বিল প্রদান করা হয়েছিল। কিন্তু সেই অর্থবছরে প্রকল্প ব্যয়ের চূড়ান্ত হিসেবে ২০১ কোটি টাকার অনিয়ম ধরা পড়েছে। একই অর্থবছরে সরকারি আদেশ অমান্য করে প্রকল্পের আনুষঙ্গিক ব্যয় বাবদ চট্টগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসককে ৪ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল। পরের ২০১৬-১৭ অর্থবছরেও একই অনিয়ম হয়েছে। সরকারের আদেশ অবজ্ঞা করে জেলা প্রশাসককে আরও ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা দেওয়া হয়। তখন ভূমি অধিগ্রহণে নানা অনিয়মে ১৪৩ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে আরও বলা হয়, বিদেশি পরামর্শকের বিল থেকে আয়কর কম কাটা হয়েছে। এতে সরকার ১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা রাজস্ব হারায়। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বিমা কাভারেজ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল সে বছরই; কিন্তু তা করেনি প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। 

কর্ণফুলী টানেলে দিনে ১০ লাখ টাকা লোকসান

ট্রাফিক পূর্বাভাসের সঙ্গে বাস্তবতার আকাশ-পাতাল পার্থক্যের কারণে বর্তমানে টানেলটি পরিচালনায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। আইএমইডির প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, প্রকল্পের অব্যবস্থাপনা এবং অদূরদর্শী পরিকল্পনার ফলে এটি এখন জাতীয় অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের বোঝার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সময় দাবি করা হয়েছিল, উদ্বোধনের পর প্রতিদিন ১৭ হাজার যানবাহন চলবে এবং ২০২৬ সাল নাগাদ এই সংখ্যা বেড়ে ২৮ হাজার ৩০৫টিতে দাঁড়াবে। অথচ বর্তমানে টানেল ব্যবহার করছে প্রাক্কলিত লক্ষ্যের মাত্র ১৪ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০টি যানবাহন।

এই ভরাডুবির ফলে ২০২৪-এর নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রাপ্ত উপাত্ত অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে। বর্তমানে টোলের মাধ্যমে যে আয় হচ্ছে, তা টানেলটির মোট পরিচালন ব্যয়ের মাত্র ৫৪ থেকে ৫৫ শতাংশ মেটাতে সক্ষম।

আইএমইডির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, কেবল টানেল নির্মাণ করলেই হয় না, এর সঙ্গে সংযোগকারী শিল্পাঞ্চল ও পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। দক্ষ জনবলের অভাব ও দুর্বল সংযোগ সড়কের কারণে টানেলটির সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

‘ওপেন সিক্রেট’ মাদক

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪৩ এএম
আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৪ এএম
‘ওপেন সিক্রেট’ মাদক
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

হাত বাড়ালেই যেন মিলছে মরণনেশা ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে গেছে। চিহ্নিত মাদক স্পটের গণ্ডি পেরিয়ে এখন রাজধানীর অলিগলি, মহল্লা ও আবাসিক এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে মাদকের কারবার। 

সংশ্লিষ্ট অপরাধ বিশ্লেষক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, মায়ানমারভিত্তিক ইয়াবা ট্যাবলেট মারাত্মক হারে ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ শহর ও প্রত্যন্ত গ্রামে। এ ছাড়া হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিল, ক্রিস্টাল মেথ (আইস), সিসা, এলএসডিসহ আরও একাধিক কৃত্রিম মাদকেরও ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে বিভিন্ন এলাকায়।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চিহ্নিত মাদকের স্পটে কেনাবেচা ছাড়াও অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিয়ে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পেজ বা গ্রুপ খুলে মাদক বেচাকেনা চলছে। এমনই একটি চক্রের তিন সদস্যকে প্রায় ৬৬ কেজি সিসা, বিভিন্ন সরঞ্জামসহ গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর ভাটারা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। গ্রেপ্তার তিনজনের মধ্যে দুজনই ইরানি বংশোদ্ভূত সহোদর, যারা পারিবারিক ব্যবসার সূত্রে ঢাকায় বসবাস করে আসছিলেন। একই দিন টেকনাফ সীমান্ত এলাকা থেকে দুই কেজি ক্রিস্টাল মেথ (আইস) ও একটি রাইফেল জব্দ করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। তার আগের দিন বুধবার টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ এলাকায় বিজিবির পৃথক দুটি অভিযানে ২ লাখ ৯০ হাজার পিস ইয়াবাসহ দুজনকে আটক করা হয়। এ ছাড়া গতকাল শুক্রবার পাকস্থলীর ভেতরে করে পাচারকালে ১ হাজার ৩২০ পিস ইয়াবাসহ দুই মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করে ডিএমপির ‘সিটিটিসি’ ইউনিট।
 
ম কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের পণ্যের দোকানের আড়ালে বা ভ্রাম্যমাণ ক্ষুদ্র দোকান, এমনকি হাঁটাচলার মাঝেই লেনদেন হচ্ছে ইয়াবা-গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য। অনেকে পাকস্থলীর ভেতর, বিভিন্ন পণ্যের ভেতর, যানবাহনে কৌশলে লুকিয়ে বা মোবাইল ফোনের ব্যাটারির চেম্বারে করেও ইয়াবা বহন করছে। এমনকি ঢাকার কিছু এলাকায় ইয়াবা ও গাঁজা সেবন এখন অনেকটাই ‘ওপেন সিক্রেট’। 

চিহ্নিত মাদক স্পট ও কারবারিদের তৎপরতা

একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা ও ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরে সুনির্দিষ্টসংখ্যক কোনো মাদক স্পট নেই। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মাদক কারবারিদের তৎপরতা অনুসারে মাদকের স্পটের বিভিন্ন সংখ্যা অনেকেই বলে থাকেন। সে হিসাবে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আটটি ক্রাইম জোনে বর্তমানে মাদক বেচাকেনার জন্য স্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ২৪৭টি স্থান। এ ছাড়া এসব মাদক কারবারের নেপথ্যে অন্তত ২৩১ জন ডিলার পর্যায়ের মাদক ব্যবসায়ী এবং ৩ হাজার ৫০০-এর বেশি মাদক কারবারি সক্রিয় রয়েছেন। 

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) হালনাগাদ পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকার চারপাশের অন্তত ১০৫টি রুট দিয়ে প্রতিদিন ইয়াবা, আইস (ক্রিস্টাল মেথ), হেরোইন ও ফেনসিডিলের মতো ভয়াবহ মাদক প্রবেশ করছে।এর মধ্যে সম্প্রতি মেরুল বাড্ডার কাঁচাবাজার এলাকায় মাদকের নতুন স্পট চোখে পড়েছে সাধারণ বাসিন্দাদের। বাড্ডা থানা ভবন থেকে মাত্র কয়েক শ মিটার দূরত্বে এই কাঁচাবাজার রোডে এখন অনেকটা প্রকাশ্যেই ইয়াবা বেচাকেনা চলছে বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রত্যক্ষদর্শী। স্থানীয় ওই ব্যক্তির দাবি, স্থানীয় পুলিশও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। কিন্তু রহস্যজনক কারণে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। 

অন্যদিকে সায়েদাবাদ জনপদের মোড় থেকে দয়াগঞ্জ সড়কের একটি রিকশা গ্যারেজ ঘিরে আরেকটি নতুন মাদক স্পটের খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, জনপদের মোড় থেকে দয়াগঞ্জ সড়কের দিকে কিছুটা এগোলেই ডান পাশে সেই রিকশা গ্যারেজ। রিকশার গ্যারেজ হলেও এটি মূলত মাদকের আস্তানা। স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির অভিযোগ, রিকশা গ্যারেজের আড়ালে এখানে ইয়াবা, হেরোইন ও গাঁজা কেনাবেচা চলে। এমনকি যাদের রিকশার চালক হিসেবে এখানে দেখা যায়, তাদের বেশির ভাগই মাদকের কারবার ও ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত। তাদের সংশ্লিষ্ট থানার এলাকাভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা মদদ দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। থানায় ফোন করে অভিযোগ জানানোর পরও এই মাদক স্পটটি বন্ধ হয়নি বলে জানান স্থানীয়রা। 

এলাকাভিত্তিক স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, কারওয়ান বাজার লেভেল ক্রসিং থেকে নাখালপাড়া রেলস্টেশন পর্যন্ত রেললাইনের দুই পাশ মাদকের অন্যতম প্রধান ও উন্মুক্ত হটস্পট। অন্যদিকে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প ও টাউন হল এলাকা এখন মাদকের বড় স্পট হিসেবে পরিচিত। মিরপুর ও পল্লবীর বিভিন্ন বিহারি ক্যাম্প, আগারগাঁওয়ের বস্তি এলাকা মাদকের পুরোনো ও অন্যতম বড় স্পট। এ ছাড়া বাড্ডা, মহাখালী, তেজগাঁও, তুরাগ, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, ডেমরা, খিলগাঁও, সবুজবাগ, হাজারীবাগ, রায়েরবাজার, গাবতলী-বাগবাড়ী, ফকিরাপুল কালভার্ট বস্তি, গোলাপবাগ, সিটি কলোনি এবং গোপীবাগ মেথরপট্টি রেললাইন এলাকাও মাদকের হটস্পট হিসেবে পরিচিত। 

রাজধানীর সবচেয়ে কুখ্যাত তিন ‘মাদকের হাট’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিবেদন ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ঢাকার অন্তত তিনটি মাদক স্পটকে অনেকটা মাদকের হাট হিসেবে ধরা হয়। ২৪ ঘণ্টাই খোলাবাজারের মতো বিভিন্ন ধরনের মাদক কেনাবেচা হয় এসব স্পটে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঝেমধ্যে অভিযানও চালায়, কিন্তু তার পরও চলছে মাদক কেনাবেচা। এই তিনটি হটস্পটের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে–আটকে পড়া পাকিস্তানি নাগরিকদের বসবাস কেন্দ্র মোহাম্মদপুরের ‘জেনেভা ক্যাম্প’। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের দাবি, এটি রাজধানীর সবচেয়ে ভয়াবহ মাদকের ট্রানজিট পয়েন্ট। ক্যাম্পের মুরগিপট্টি, বাবর রোড এবং হুমায়ুন রোড এলাকায় নারী ও শিশুদের ব্যবহার করে ইয়াবা-হেরোইন বিক্রি করা হয়। এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়ই সশস্ত্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সম্প্রতি মাদক-ছিনতাইকারী চক্র ওই এলাকায় অভিযানে যাওয়া পুলিশের ওপরও হামলা চালায়।

এদিকে কারওয়ান বাজার লেভেল ক্রসিং থেকে নাখালপাড়া পর্যন্ত বিস্তৃত রেললাইন এলাকা আরেকটি ‘মাদকের বাজার’ হিসেবে পরিচিত। ভাসমান খুচরা বিক্রেতারা এখানে ব্যাপকভাবে সক্রিয়। পাশাপাশি রেললাইনের আশপাশে এখানে মাদকসেবীদের সবচেয়ে বড় মিলনমেলাও বসে।

এ ছাড়া মিরপুর বিহারি ক্যাম্প আরেকটি অন্যতম প্রধান মাদক স্পট হিসেবে পরিচিত। এই ক্যাম্পগুলোতে রাতে হাঁকডাক ছেড়ে মাদক বিক্রি হয়। ঘনবসতির সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা খুব সহজেই পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপন করে।

যা বলছেন অপরাধ বিশেজ্ঞরা

মাদকের নেটওয়ার্ক অনেক শক্তিশালী ও উচ্চপর্যায়ের বলে মনে করেন অপরাধ বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের এই অধ্যাপক গত শুক্রবার খবরের কাগজকে বলেছেন, ‘মাদকের নেটওয়ার্ক অনেক উচ্চপর্যায়ের। মাদক চোরাচালান বন্ধ হয়ে গেলে সরকারিভাবে দায়িত্বশীল অনেকেরই নিয়মিত আয়ের উৎস কমে যাবে। অন্যদিকে দেশের সীমান্ত এলাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে একশ্রেণির প্রভাবশালী রাজনীতিক-ক্ষমতাধর ব্যক্তিরাও মাদক কারবারে মদদ দিয়ে যাচ্ছে। ফলে দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা মুখে মাদকবিরোধীর বড় কথা বললেও তাদের অনেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাদক বিস্তারে কাজ করছে। মাদক চোরাচালান বন্ধ না হওয়ার পেছনে এগুলো বড় কারণ।’

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, মাদক চোরাচালানের রুট এবং কেনাবেচার চিহ্নিত কিছু স্পটের খবর বিভিন্ন মাধ্যমে জানা গেলেও সুনির্দিষ্টভাবে সেটি নির্ধারণ করা কঠিন। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের মাদকের এতটাই বিস্তার ঘটেছে যে, রাজধানীসহ বড় শহরগুলোর প্রায় সব এলাকায় বা পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে মাদক কারবারি ও সেবনকারীদের তৎপরতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে মাদকবিরোধী সামাজিক অংশগ্রহণ ও সচেতনতা বাড়ানো খুব জরুরি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদারকিতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের যুক্ত করে সামাজিক নেটওয়ার্ক গড়ার মাধ্যমে মাদকবিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় দেশের বর্তমান ও আগামী প্রজন্ম অন্ধকারে ডুবে যাবে।’

মাদক থেকেই অধিকাংশ অপরাধের সূত্রপাত ঘটে বলে মনে করেন সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক। গতকাল তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘মাদক দেশের যুবসমাজকে ধ্বংসের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। কারণ অধিকাংশ অপরাধের সূত্রপাত হয় মাদক থেকে। পাশাপাশি মাদক যেমন কর্মস্পৃহা কমিয়ে দিচ্ছে, তেমনি তরুণ সমাজের মেধা ধ্বংস করে দিচ্ছে, যা বৈজ্ঞানিকভাবেও স্বীকৃত। ফলে মাদকের ছোবলে আমাদের সম্ভাবনার একটি জাতি (জেনারেশন) পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। মুখে আমরা অনেকেই মাদকবিরোধী নানা রকম কথা বলে থাকি, কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোর কোনো পদক্ষেপ এবং সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতা দেখা যাচ্ছে না।’
 
ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘আগে একসময়ে পাড়া-মহল্লাগুলোতে বিট পুলিশিং ও কমিউনিটি পুলিশিং ব্যাপক কার্যকর ছিল। পুলিশের নিয়মিত টহল বা আনাগোনা দেখা যেত। এখন এগুলো খুব একটা চোখে পড়ে না। যদিও পুলিশকে আরও নানা কাজে যুক্ত থাকতে হয়। অন্যদিকে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি মাদক কারবারিসহ পেশাদার অপরাধীদের ভয়ভীতিও কমে গেছে। অনেকে প্রকাশ্যই মাদক কেনাবেচা বা সেবন করে যাচ্ছে। ফলে মাদকবিরোধী কঠোর অবস্থান আরও দৃশ্যমান করতে হবে। মাদকবিরোধী সামাজিক নেটওয়ার্ক গড়ে নজরদারি বৃদ্ধি ও সাঁড়াশি অভিযান চালানো জরুরি।’ 

যা বলছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) এস এন মো. নজরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘মাদকবিরোধী অভিযান ডিএমপির নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে চলমান রয়েছে। আমাদের বিভিন্ন গোয়েন্দা দল থেকে যখনই তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তখনই অভিযান চালানো হচ্ছে। কিন্তু তার পরও মাদকের বিস্তার কমছে না, বরং মারাত্মক হারে গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে যাচ্ছে। এ জন্য সবার আগে সীমান্ত ‘সিল’ (বন্ধ) করার ব্যবস্থা করতে হবে। সীমান্তে টহল বৃদ্ধিসহ কঠোরভাবে যদি মাদক প্রবেশ বন্ধ করা যায়, তাহলে রাজধানী ঢাকাসহ অন্য সবখানেই মাদক কমে যাবে। এর বাইরেও মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলাও জরুরি। মসজিদ, মন্দির, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সবখানে মাদকের কুফল তুলে ধরতে হবে। সমাজে যাদের কথা সবাই মান্য করে, তাদের এ বিষয়ে বিশেষ ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানান ডিএমপির এই অন্যতম শীর্ষ কর্মকর্তা।