পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ক্রাফট ইন্সট্রাক্টররা দীর্ঘদিন পদোন্নতি পাচ্ছেন না। এর ফলে আদালতে একটি মামলা করেছেন ক্রাফট ইন্সট্রাক্টররা। এ বিষয় নিয়ে অপর একটি শিক্ষক মহল কারিগরি শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে আন্দোলনে নামিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এখানে শিক্ষার্থীদের কোনো ধরণের স্বার্থ না থাকলেও শিক্ষকদের প্ররোচনায় সড়ক দখল করে অবরোধ করছেন তারা। এদিকে গত ২০ মার্চ থেকে ক্রাফট ইন্সট্রাক্টরদের ক্যাম্পাসে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। তাদের পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করতে চান শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সিন্ডিকেট। যদিও আন্দোলনের বিষয়টি নিয়ে কারিগরি অধিদপ্তর বিব্রত বলে জানা গেছে।
সব শেষে বুধবার (১৭ এপ্রিল) সকাল থেকে সারা দেশে আন্দোলন করেছে শিক্ষার্থীরা। এর আগে গত রমজান মাসে আন্দোলন করে সড়ক অবরোধ করেছিলেন তারা। আদালতে মামলার রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বার বার জনদুর্ভোগ তৈরি করে সড়ক অবরোধ করছেন শিক্ষার্থীরা।
জানা গেছে, সম্প্রতি আদালতের দেওয়া একটি রায়কে কেন্দ্র করে দেশের কারিগরি অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশের সাধারণ মানুষের উপর।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ক্রাফট ইন্সট্রাক্টর বা দক্ষ প্রশিক্ষক পদটি কারিগরি শিক্ষার অর্গানোগ্রাম, প্যাটার্ন, বাংলাদেশ সরকারের গেজেট, মন্ত্রণালয়ের আদেশ, বদলির আদেশ, প্রশিক্ষণ আদেশ অনুযায়ী শিক্ষক পদ। দেখা গেছে, কারিগরিতে যারা শ্রেণি কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত, তারা সবাই নির্দিষ্ট মেয়াদ চাকরি করার পর ৫০ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশ পদোন্নতি পাচ্ছেন। কিন্তু সবার পদোন্নতি থাকলেও ক্রাফট ইন্সট্রাক্টর পদধারীদের কোনো পদোন্নতির সুযোগ রাখা হয়নি। অন্যদের ক্ষেত্রে ডিপ্লোমা পাশ করে জুনিয়র ইন্সট্রাক্টর ১০ম গ্রেডে নিয়োগ পেয়ে পর্যায়ক্রমে ৪র্থ গ্রেডে অধ্যক্ষ পর্যন্ত হওয়ার সুযোগ থাকলেও ক্রাফট ইন্সট্রাক্টরদের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি। অনেকেই ক্রাফট ইন্সট্রাক্টর পদে নিয়োগ পেয়ে কোনো পদোন্নতি ছাড়াই অবসর নিচ্ছেন।
সম্প্রতি আদালতের রায়ে গত ৫০ বছরের একটি অমীমাংসিত বিষয় সমাধান হয়েছে। কিন্তু ছাত্রদের ভুল বুঝিয়ে রাজপথে নামিয়ে দেন এ রায়ের বিরুদ্ধে থাকা পলিটেকনিক শিক্ষকদের একটি বড় অংশ। ফলে সারাদেশে এক অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে মানুষকে জিম্মি করে আদালতের রায় বাতিল করতে চাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের বোঝানো হয়েছে, জুনিয়র ইন্সট্রাক্টর পদটি তাদের জন্য বরাদ্দ করা। পদটি ক্রাফট ইন্সট্রাক্টররা ৫০ শতাংশ নিয়ে গেলে তাদের পদ কমে যাবে। অথচ তারা যে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের ৫০ শতাংশ পদ নিয়ে যায়, সেই ব্যাপারে বিএসসি ইঞ্জিনিয়াররা কোনো প্রতিবাদ করেন না। ক্রাফট ইন্সট্রাক্টর পদে বর্তমানে পদার্থ ও রসায়নে অনার্স পাসদের নিয়োগ দেওয়া হয়, যাদের সংখ্যা প্রায় ১০০০ জন। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার ৫০০ জন, বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার ৫০০ জন। অল্প কিছু লোক আছেন, যারা এইচএসসি ভোকেশনাল পাশ। অর্থাৎ এই পদে অর্ধেকের বেশি লোকই কারিগরি শিক্ষা থেকে আসা।
চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ক্রাফট ইন্সট্রাক্টর মীর মো. বায়জীদ হোসেন ও মো. রুবেল মিয়া বলেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে আমরা পদোন্নতি পাই না। কেউ বঞ্চিত হলেও কি আদালতে যাওয়া যাবে না? কেউ আদালতে গেলে তাকে ছাত্র লেলিয়ে হেনস্থা করা কি বিবেকবান মানুষের কাজ? যারা আদালতে গিয়েছেন তাদেরসহ এই পদের সবাইকে হত্যার হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নিজের কর্মস্থলে আমাদের ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, যাদের যোগ্যতা আছে কেবল তারাই পদোন্নতি পাবেন। এখানে অযোগ্য লোককে পদোন্নতি দেওয়ার কথা বলা হয়নি। তবুও আমাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার জন্য শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছে।’
চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সপ্তম পর্বের শিক্ষার্থী তকির আহমেদ শমীক খবরের কাগজকে বলেন, ‘সাধারণ শিক্ষা থেকে এসে ক্রাফট ইন্সট্রাক্টর হয়ে এখন প্রমোশনের জন্য আদালতে মামলা করা হয়েছে। এদের প্রমোশন দিলে কারিগরি থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থীরা চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কিন্তু ক্রাফট ইন্সট্রাক্টর পদে কারিগরি থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থীরাও চাকরি করছেন দীর্ঘদিন থেকে। তাদের প্রমোশন হচ্ছে না। এ পদ থেকে উপরের দিকে যেতে পারছেন না।’ তিনি শিক্ষার্থী আরো বলেন, ‘যোগ্যতা থাকলে চাকরিতে প্রমোশন পাওয়ার অধিকার সবার আছে। তাদের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের আপত্তি নেই। তারা কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আন্দোলন করছেন।’
কারিগরি শিক্ষার এ অচলাবস্থা নিয়ে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর মহাপরিচালক শোয়াইব আহমাদ খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য খুবই বিব্রত কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর। কারিগরিতে নতুন করে চাকরি বিধি প্রণয়ন করতে হবে। যদিও এটি সময়ের ব্যাপার। ক্রাফট ইন্সট্রাক্টরদের দাবির বিষয়ে একটি মামলা চলমান আছে।’ এখানে শিক্ষার্থীদের জড়িত হওয়ার কারণ কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের বুঝাবে কে? এখানে শিক্ষার্থীদের কোনো সংশ্লিষ্টতা থাকার কথা নয়। কিন্তু অপর শিক্ষকদের প্ররোচনায় শিক্ষার্থীরা মাঠে নামছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘দেশে চাকরি করার অধিকার সবার আছে। প্রমোশন চাওয়ার অধিকারও সবার আছে। সবাইকে নিয়ে এক টেবিলে বসে সমস্যা সমাধান করা হবে, সেই পরিস্থিতিও এখন নেই। এ বিষয়ে সরকারকেই পদক্ষেপ নিতে হবে।’