পৃথিবীর বিপজ্জনক পর্বতশৃঙ্গের মধ্যে অন্যতম নেপালের ‘আমা দাবালাম’। সম্প্রতি সেখানে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছেন কিশোরগঞ্জের তরুণ তানভীর আহমেদ শাওন। ‘আমা দাবালাম’ জয় ও পর্বতারোহী হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতার গল্প শুনিয়েছেন শাওন। লিখেছেন তাসনিম তাজিন
শুরুর গল্প
২০১৪ সালে প্রথম বান্দরবান পাহাড়ে ঘুরতে যান পর্বতারোহী তানভীর আহমেদ শাওন। এরপর ব্যক্তিগত উদ্যোগে অথবা বন্ধুদের সঙ্গে ট্রেকিংয়ে যেতেন নিয়মিত। ট্রেকিং ছিল তার কাছে নিজের যোগ্যতা পরীক্ষার রাস্তা। পাহাড়ে ঘুরতে গিয়ে বিভিন্ন সময় পরিচয় হতো নতুন বন্ধু, মানুষ ও পর্বতারোহীদের সঙ্গে। এভাবেই ২০১৭ সালে পরিচয় হয় পর্বতারোহণ ক্লাব ভার্টিকাল ড্রিমার্সের সঙ্গে। সেই থেকে বড় পর্বতারোহণের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন শাওন। ২০১৮ সালে ভারতে প্রথম ‘দেও তিব্বা’ পর্বতারোহণ করেন শাওন। দেও তিব্বার উচ্চতা ছিল ৬ হাজার ১ মিটার। আমা দাবালামের আগে নেপালের রামজাক ও চুল্লু ফারইস্ট পর্বতারোহণ করেন শাওন।
প্রথম সামিটে ‘আমা দাবালাম’
শাওন বলেন, বেশ কয়েকটি পর্বতে গেলেও আক্ষেপ ছিল এখন পর্যন্ত কোনো পর্বতের চূড়ায় সামিটে পৌঁছানোর সৌভাগ্য হয়নি তার। ২০২৩ সালে সামিটের উদ্দেশ্যে চুল্লু ফারইস্টে গেলেও প্রকৃতি সহায় না হওয়ায় আশা অপূর্ণ রেখেই ফিরে আসতে হয়েছিল সেবার। এরপরই সিদ্ধান্ত নেন, দুর্গম কোনো পর্বতকেই বেছে নেবেন সামিটের জন্য। অবশেষে ২০২৪ সালের ২ নভেম্বর ৬ হাজার ৮১২ মিটার উচ্চতার আমা দাবালাম পর্বতশৃঙ্গের চূড়ায় পা রাখেন শাওন। তিনি বলেন, আমা দাবালাম পর্বতকে বাংলায় বলা হয় ‘মায়ের গলার হাড়।’ এই পর্বতের এক জায়গায় গলার হাড়ের মতোই দুই পাশে ছড়ানো রিজের মাঝখান দিয়ে গেছে গিরিশিরা। এ জায়গাটি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। এ পর্যন্ত প্রায় ৩৬ জন পর্বতারোহী মারা গেছেন আমা দাবালামে। এরকম পর্বত আরোহণের মধ্য দিয়ে জীবনের প্রথম সামিট শুরুর ব্যাপারটাই রোমাঞ্চকর। এরপর হেসে বলেন, চূড়ায় প্রথম পা রেখে অনুভূতি ছিল শূন্য। আমি আর শেরপা শুধু খাবার পানি খুঁজছিলাম। চূড়ায় উঠার পথে বোতলের পানি ফুরিয়ে যাওয়ায় অনেক বরফও খেয়েছি।
উঁচুতে উঠে নত হওয়ার শিক্ষা
শাওনকে পর্বত কেন এত টানে? এই প্রশ্নের উত্তরে বলেন, এর দুটি কারণ। প্রতিবারই আমি আগের চেয়ে বেশি দুর্গম পর্বত আরোহণের জন্য বেছে নিই। আমি নিজেকে চ্যালেঞ্জ করতে ভালোবাসি। নিজের যোগ্যতা যাচাই করতে ভালোবাসি। তবে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে অহংকার বোধ হয় না। দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে যত উঁচুতে উঠি তত প্রকৃতির কাছে নত হতে শিখি। প্রকৃতির সান্নিধ্যে গেলে সাদাসিধে জীবনযাপনের ইচ্ছা জাগে। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, চূড়ায় উঠার ইচ্ছা থাকলেও কতবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ফিরে আসতে হয়েছে। পর্বতারোহণ এভাবেই প্রতিকূলতা মেনে নিতে, পারস্পরিক সহিষ্ণুতা শিখায়।
পর্বতারোহণ নিয়ে ভাবনা
শাওন বলেন, তরুণদের মধ্যে পর্বতারোহণ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এখন অনেক পর্বতারোহণ ক্লাব রয়েছে। এসব ক্লাবে প্রশিক্ষণ নিয়ে পর্বতারোহণের সুযোগ আছে। সরকারিভাবেও পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। ক্রিকেট, ফুটবল অন্যান্য খেলায় যেমন খেলোয়াড়রা দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। তেমনি পর্বতের চূড়ায় যখন কোনো বাংলাদেশি দেশের পতাকা হাতে পা রাখেন তখন এ দেশের মানুষও যে দৃঢ়, সাহসী সেটাই প্রমাণ হয়। তাছাড়া আমাদের দেশ এখনো প্রকৃতিবান্ধব না। পর্বতারোহণে চর্চা বাড়লে প্রকৃতিবান্ধব পরিবেশ তৈরি হবে। আমা দাবালাম-পরবর্তী পরিকল্পনা কী জানতে চাইলে এই তরুণ বলেন, পৃথিবীতে ১৪টি ৮ হাজার মিটার উচ্চতার পর্বত আছে। সামনে এর ভেতর কোনো পর্বতে বাংলাদেশের পতাকা হাতে পা রাখতে চাই।
হাসান