ফরিদপুরে কৃষকরা পেঁয়াজ সংরক্ষণে এয়ার ফ্লো মেশিন ব্যবহার শুরু করেছেন। এতে উৎপাদিত পেঁয়াজ পচে যাচ্ছে না। কৃষকরা পাচ্ছেন ন্যায্যমূল্য। অমৌসুমে বাজারে ঘাটতিও কমছে। এক একটি মেশিনে ৩০০ মণ পর্যন্ত পেঁয়াজ রাখা যায়। পাঁচ থেকে ছয় মাস ভালো থাকে। এ উদ্যোগে কোটি টাকার অপচয় রোধ হচ্ছে। কৃষকরা বলছেন, এভাবে সংরক্ষণে দেশে পেঁয়াজ আমদানির প্রয়োজন পড়বে না। কৃষি বিভাগ জানায়, ফরিদপুরে ৭০০ মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। এ বছর আরও দেওয়া হবে।
পেঁয়াজ চাষের সবচেয়ে বড় সমস্যা সংরক্ষণ। সঠিকভাবে সংরক্ষণের অভাবে দেশে প্রতিবছর উৎপাদিত পেঁয়াজের প্রায় ৩০ ভাগ নষ্ট হয়ে যায়। এতে মৌসুম শেষে বাজারে ঘাটতি তৈরি হয়। দাম হঠাৎ বেড়ে যায়। বিদেশ থেকে আমদানির চাপ বাড়ে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, এয়ার ফ্লো মেশিনের মাধ্যমে এখন সহজে পেঁয়াজ মজুত রাখা সম্ভব হচ্ছে। মেশিনটি তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বাতাসের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে। এতে পেঁয়াজ শুকিয়ে যায় না, আবার পচেও না। কৃষকরা একে বলছেন ‘পেঁয়াজের এসি’। কেউ কেউ বলছেন ‘পেঁয়াজের হিমাগার’।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, অনেক কৃষক তাদের ঘরে এয়ার ফ্লো মেশিন বসিয়ে ৩০০ মণ পর্যন্ত পেঁয়াজ সংরক্ষণ করছেন। কেউ কেউ আবার একাধিক মেশিনও ব্যবহার করছেন।
পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য ১২ বর্গফুট আকারের একটি ঘর বানাতে হয়। ভেতরে ১০ ইঞ্চি উঁচু করে বাঁশের মাচা তৈরি করতে হয়। এরপর ঘরের মাঝখানে বসানো হয় এয়ার ফ্লো মেশিন। মেশিনের সাহায্যে বাতাস নিচ থেকে ওপরে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ঘরে রাখা পেঁয়াজের তাপমাত্রা সঠিক থাকে।
একটি মেশিন বসাতে খরচ পড়ে প্রায় ১৬ থেকে ১৭ হাজার টাকা। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই খরচ খুবই সাশ্রয়ী। কারণ পেঁয়াজ ৫ থেকে ৬ মাস পর্যন্ত ভালো থাকে।
কিষানি শাহিদা বেগম প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে একটি মেশিন বসান। তিনি বলেন, ‘আমি প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো খরচ বাড়বে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, একটি পেঁয়াজও পচেনি। খরচ অনেক কম হয়েছে। মৌসুম শেষে যখন দাম বাড়ে তখন বাজারে ছেড়ে দিতে পারি। কৃষক যেমন লাভবান, তেমনি ক্রেতারাও। বাজারে ভারসাম্য থাকে।’
আরেকজন কৃষক বক্তার খান বলেন, ‘এখন আমাদের বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আনতে হবে না যদি এই মেশিন সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। পেঁয়াজের মান ঠিক রাখে ও দামও নিয়ন্ত্রণে থাকে। সরকারের উচিত এটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা।’
ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান জানান, ফরিদপুর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলা। তবে এতদিন বড় সমস্যা ছিল সংরক্ষণ। তিনি বলেন, ‘আমরা এ বছর সাতশত কৃষকের মাঝে মেশিন দিতে পেরেছি। এর মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৫০ টন পেঁয়াজ নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা পাবে। যার বাজারমূল্য সাড়ে ৬০০ কোটি টাকা। এটি নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী পদক্ষেপ।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকার থেকে কৃষকদের জন্য ২৭ হাজার টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে কৃষকরা আরও উৎসাহ নিয়ে এ উদ্যোগে অংশ নিচ্ছেন। এখন আমরা চাই, এটি সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে।’
এয়ার ফ্লো মেশিন এখন জেলার গণ্ডি পেরিয়ে অন্যান্য এলাকায়ও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। স্থানীয় মেশিনারিজ দোকানগুলো ইতোমধ্যে এ মেশিন তৈরি করছে। কৃষকদের দাবি, সারা দেশে এই প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিলে দেশে পেঁয়াজ আমদানির প্রয়োজন থাকবে না।
ফরিদপুরের কৃষকরা মনে করছেন, পেঁয়াজ সংরক্ষণে এয়ার ফ্লো মেশিন তাদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এটি ফসল বাঁচাচ্ছে ও দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।