প্রতিশ্রুতি মিলেছে বহুবার। কিন্তু মেলেনি একটি পাকা সেতু। ফলে নীলফামারীর দেওনাই নদীর ওপর নড়বড়ে একটি বাঁশের সাঁকোই এখন ভরসা ১০ গ্রামের মানুষের। প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার মানুষ এই সাঁকো দিয়েই ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন।
নীলফামারী সদর উপজেলার লক্ষ্মীচাপ ইউনিয়নের বসুনিয়ারডাঙ্গা এলাকায় দেওনাই নদীর ওপর স্থানীয়রা নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন গ্রাম থেকে বাঁশ সংগ্রহ করে একটি অস্থায়ী সাঁকো নির্মাণ করেন। সেই থেকে প্রতিবছর পুরোনো বাঁশ বদলে ও সংস্কার করে স্থানীয়দের সহযোগিতায় সাঁকোটি টিকিয়ে রাখা হচ্ছে।
প্রায় ১১০ মিটার দীর্ঘ এই সাঁকোই এখন সদর উপজেলার লক্ষ্মীচাপ ইউনিয়ন ও জলঢাকা উপজেলার শিমুলবাড়ী ইউনিয়নের মানুষের একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম। এই সাঁকো না থাকলে নীলফামারী শহরে যেতে প্রায় ২০ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরতে হয়। অথচ এখানে একটি পাকা সেতু নির্মাণ হলে মাত্র ৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েই শহরে পৌঁছানো সম্ভব।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বসুনিয়ারডাঙ্গা গ্রামের এই বাঁশের সাঁকো দিয়ে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে সাইকেল, মোটরসাইকেল ঠেলে এবং হেঁটে পারাপার করছেন সাধারণ মানুষ। কৃষিপণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীদের চলাচলে তৈরি হচ্ছে চরম ভোগান্তি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েক যুগ ধরে জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে শুধু আশ্বাস মিলেছে। কিন্তু আজও নির্মাণ হয়নি একটি পাকা সেতু। বর্ষা এলেই বাড়ে দুর্ভোগ ও দুর্ঘটনার শঙ্কা। এই সাঁকো দিয়ে পারাপারের সময় মাঝেই দুর্ঘটনা ঘটে। অনেকেই নদীতে পড়ে আহত হন। অনেক সময় মোটরসাইকেল ও কৃষিপণ্যও নদীতে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এলাকাবাসী জানান, নীলফামারী সদর উপজেলার লক্ষ্মীচাপ, কাচারী, শিশাতলী, জংলীপাড়া, দুবাছুরি, বল্লমপাঠ, কচুয়া, দাঁড়িহারা ও রামগঞ্জ এবং জলঢাকা উপজেলার ডিয়াবাড়ী, শিমুলবাড়ীসহ অন্তত ১০ গ্রামের মানুষ প্রতিদিন এই সাঁকো ব্যবহার করে নীলফামারী জেলা শহর, ডোমার ও জলঢাকা উপজেলায় যাতায়াত করেন। শিক্ষার্থীদের কাছেও এটি একমাত্র ভরসা।
সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েন রোগীরা। জরুরি মুহূর্তে অ্যাম্বুলেন্স বা অন্য কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারে না। রোগীদের কাঁধে বা পিঠে করে সাঁকো পার করিয়ে অপর পাশ থেকে গাড়িতে তুলতে হয়। উৎপাদিত ধান, পাট, ভুট্টা, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য বিক্রির জন্য নদীর এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে কাঁধে করে বহন করতে হয়।
জংলীপাড়ার বাসিন্দা বিমল চন্দ্র রায় বলেন, ‘শুকনা মৌসুমে কোনোভাবে পারাপার করা গেলেও বর্ষায় নদীতে স্রোত বাড়লে বাঁশের সাঁকো দিয়ে চলাচল করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে সেতুর দাবিতে বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করেও কোনো সুফল পাইনি।’
বসুনিয়ারডাঙ্গা গ্রামের ধীরেন্দ্রনাথ রায় বলেন, ‘স্বাধীনতার পর থেকেই এই এলাকায় সেতুর দাবি শুনে আসছেন। কিন্তু ভোটের সময় প্রতিশ্রুতি এলেও পরে আর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না।’
ষাটোর্ধ্ব ধীরেন্দ্রনাথ রায় বলেন, ‘যোগাযোগব্যবস্থা না থাকায় পুরো এলাকা উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে পড়ছে। দ্রুত সেতু নির্মাণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’ মোটরসাইকেল আরোহী বিপ্লব রায় বলেন, ‘আমার বাসা নদীর ওই পাড়ে তাই প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়। অনেক সময় মোটরসাইকেল নিয়ে পার হওয়া যায় না।’
লক্ষ্মীচাপ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমিনুর রহমান বলেন, ‘প্রতিদিন এই সাঁকোর ওপর দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে হাজার হাজার লোক যাতায়াত করেন। ব্রিজটি হলে হাজার মানুষের যাতায়াতের সুবিধার পাশাপাশি এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়বে। ব্রিজ নির্মাণের বিষয়ে আমি এলজিইডি অফিসে অনেকবার যোগাযোগ করেছি।’
নীলফামারী স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী ফিরোজ কবির হোসেন বলেন, ‘একটি প্রকল্প তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। ওই স্থানে একটি সেতু করার জন্য আমরা চেষ্টা করছি। আশা করি খুব দ্রুত হয়ে যাবে।’
এ বিষয়ে নীলফামারী-২ সংসদ সদস্য আল ফারুক আব্দুল লতিফ বলেন, ‘নীলফামারী সদর আসনের সব কটি ব্রিজ তালিকা করে পাঠানো হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আগামী ৫ বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে ইনশাআল্লাহ।’