মুন্সীগঞ্জের ষষ্ঠ বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুর (মুক্তারপুর সেতু) টোল কমিয়ে ‘যৌক্তিক পর্যায়ে’ আনার দাবি জানানো হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বেশ কয়েক দিন ধরে শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালিয়ে আসছেন। তারা বলছেন, ১৬ বছর আগে বানানো সেতুটির নির্মাণ ব্যয় এরই মধ্যে উঠে গেছে। কিন্তু অযৌক্তিক কারণে এই সেতুর টোল আদায় বন্ধ না করে আরও বাড়ানো হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে। তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে টোল কমানোর দাবি জানান। সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি নিয়ে সেতু কর্তৃপক্ষের কাছে সরাসরি আবেদনের পরামর্শ দিয়ে বলছেন, নির্দেশনা এলে বাস্তবায়ন করা হবে।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুক্তারপুর সেতুতে পণ্যবাহী ট্রাকের তুলনায় যাত্রীবাহী পরিবহন, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, বিভিন্ন থ্রি-হুইলারসহ অন্যান্য যানবাহন বেশি চলাচল করে। টোল বৃদ্ধির অজুহাতে এসব যানের চালক-মালিকরা যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া আদায় করছেন। যাত্রীবাহী যানবাহনগুলোর টোল কমিয়ে আনলে সাধারণ যাত্রী ও শিক্ষার্থীরা এর সুবিধা পাবেন।
‘ডেসপারেটলি সিকিং মুন্সীগঞ্জ’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে শরিফুল হোসেন নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘২০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০৮ সালে মুক্তারপুর সেতু বানানো হয়। কিন্তু ১৬ বছর ধরে এই সেতু থেকে উচ্চহারে টোল আদায় করা হচ্ছে। মুন্সীগঞ্জবাসীর জন্য এটি বড় দুর্ভোগ। জেলাবাসীর দাবি, অবিলম্বে এই সেতুর টোল আদায় বন্ধ করে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হোক।’
এ ছাড়া ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন-মুন্সীগঞ্জ অফিশিয়াল’ নামে আরেক গ্রুপে শিক্ষার্থী জিদান বিন সায়েদ লিখেছেন, ‘প্রতিদিন এই সেতু থেকে গড়ে ৬ লাখ টাকার টোল আদায় হয়। ক্ষেত্রবিশেষ এই টাকার পরিমাণ আরও বাড়ে। ২০০৮ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ১০ আগস্ট পর্যন্ত ৬০১৮ দিন। সে হিসেবে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৬০ কোটি টাকা তোলা হয়েছে। প্রশ্ন হলো এতদিনেও যদি সেতুর টাকা না উঠে থাকে তা হলে ওই টাকাগুলো গেল কোথায়?’ সিফাত রহমান নামে আরেক শিক্ষার্থী ‘মুন্সীগঞ্জ শহর’ গ্রুপে আরেকটি পোস্ট করেন। ওই গ্রুপের সদস্য সংখ্যা ২৪ হাজারের বেশি। তিনি ওই পোস্টে সবাইকে মুক্তারপুর সেতুতে টোল দিতে নিষেধ করেন।
জানা গেছে, ৩৭টি স্প্যানের ওপর দাঁড়ানো ১৫২১ মিটার দৈর্ঘ্যের ও ১০ মিটার প্রস্থের সেতুটি দুই লেনে নির্মিত। মুন্সীগঞ্জ জেলা সদরের সঙ্গে মুক্তারপুর হয়ে নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার যোগাযোগ এই সেতুটি সহজ করেছে। ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হয়। সে হিসেবে এই সেতু থেকে টানা ১৬ বছর ধরে টোল আদায় করা হচ্ছে। সর্বশেষ সেতুর টোল বৃদ্ধি করা হয় গত ২০২১ সালের নভেম্বরে। সূত্র অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১ জুলাই থেকে চলতি বছরের ৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রতিদিন সর্বনিম্ন পাঁচ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ৯ লাখ টাকা ও বছরে গড়ে ১৮ কোটি টাকার (সর্বনিম্ন হিসেবে) টোল আদায় হয়েছে।
তবে এর আগের ১৪ বছরের টোল আদায়ের হিসাব সেতু কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়নি। ধারণা করা যায়, বিগত বছরগুলোতেও সমপরিমাণ টোল আদায় হয়েছে। সব মিলিয়ে ১৬ বছরে গড়ে ১৮ কোটি করে হিসাব করলে টোল আদায় হয়েছে ২৮৮ কোটি টাকার বেশি।
সেতু বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ষষ্ঠ বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুটি ২০৮.৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে মুন্সীগঞ্জ শহরের উপকণ্ঠে মুক্তারপুর এলাকায় ধলেশ্বরী নদীর ওপর চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি) ২০০৫ সালের জুলাইতে নির্মাণকাজ শুরু করে। শেষ হয় ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে। উদ্বোধন হয় একই বছর ফেব্রুয়ারিতে। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের ব্যয় ছিল ৭৯.১৫ কোটি টাকা। বাকি ১২৯.২০ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে সাহায্য করে চীন।
বর্তমানে সেতুটিতে ভ্যান বা মোটরসাইকেলের জন্য টোল নেওয়া হয় ১৫ টাকা, সিএনজিচালিত অটোরিকশার জন্য ৩০ টাকা। বিগত সময়ে ছিল যথাক্রমে ১০ ও ২০ টাকা। প্রাইভেটকার, টেম্পো, জিপ-মাইক্রোবাস, পিকআপের জন্য টোল নেওয়া হচ্ছে ৫০ টাকা। ২০২১ সালের নভেম্বর মাসের আগে নেওয়া হতো ৪০ টাকা। ছোট ও বড় বাসের টোল ৫০ টাকা করে বাড়িয়ে যথাক্রমে ১৫০ ও ২৫০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। ট্রাকের টোল বাড়ানো হয়েছে আগের চেয়ে ৫০ টাকা। আগে বড় ট্রাক বা ট্রেইলরের জন্য আলাদা টোল হার না থাকলেও নতুন করে তা যুক্ত হয়েছে। এগুলোর শ্রেণি ভেদে টোলের হার ৬০০ থেকে ১০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের সহকারী প্রকৌশলী মো. মাহবুবুর রহমান এ বিষয়ে খবরের কাগজকে বলেন, ‘সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী বরাবর শিক্ষার্থীদের আবেদন করতে হবে। সেতু কর্তৃপক্ষ যে নির্দেশনা দেবে, তা বাস্তবায়ন করব।’