পুঁজিবাজারে চামড়া খাতের যেসব কোম্পানি তালিকাভুক্ত রয়েছে, সেসব কোম্পানি সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কম। কারণ, এসব কোম্পানি আর্থিকভাবে লাভবান নয়। এক বছর লোকসান দেয়; আরেক বছর লাভ করে। এতে করে বিনিয়োগকারীদের নিয়মিত লভ্যাংশ দিতে পারে না।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ট্যানারি খাতের দুটি কোম্পানি— এ্যাপেক্স ট্যানারি লিমিটেড ও সমতা লেদার কমপ্লেক্স বছরের পর বছর লোকসানে থাকায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা হারাতে বসেছে। দীর্ঘদিন ধরে উল্লেখযোগ্য মুনাফা করতে না পারলেও নামমাত্র লভ্যাংশ দিয়ে তালিকাভুক্ত অবস্থান বজায় রাখছে প্রতিষ্ঠান দুটি।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, খাতটির সার্বিক দুরবস্থার পেছনে রয়েছে কাঁচামালের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিক্রির পর অর্থ আদায়ে জটিলতা। এসব কারণে কোম্পানিগুলোর ব্যবসা সম্প্রসারণ তো দূরের কথা, টিকে থাকাই হয়ে উঠেছে চ্যালেঞ্জ।
১৯৮৫ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে এ্যাপেক্স ট্যানারি আর ১৯৯৮ সালে তালিকাভুক্ত হয়েছে সমতা লেদার।
কোম্পানি দুটির সর্বশেষ হিসাব বলছে, এ্যাপেক্স ট্যানারি বিদায়ী ২০২৪-২৫ হিসাব বছরের নয় মাসে শেয়ারপ্রতি নিট লোকসান করেছে ১২ টাকা ৪৬ পয়সা। অপরদিকে সমতা লেদার ২০২৪ সালের লভ্যাংশ ঘোষণার পর এখন ২০২৫ সালের একটি প্রান্তিকও প্রকাশ করতে পারেনি।
ট্যানারি সেক্টরের কোম্পানিগুলোর বেহাল অবস্থার কারণ জানতে ব্র্যাক ইপিএল ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের সাবেক প্রধান গবেষণা কর্মকর্তা দেবব্রত কুমার সরকার খবরের কাগজকে বলেন, বিনিয়োগকারীরা এখানে বিনিয়োগ করে মুনাফার জন্য। আবার অনেকে বিনিয়োগ করে বছর শেষে ভালো লভ্যাংশ পাবে এমন প্রত্যাশায়। কিন্তু এ্যাপেক্স ট্যানারি আর সমতা লেদার দুটির কোনোটিই বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের জায়গা তৈরি করতে পারেনি। ফলে এখানে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগও কম।
তিনি বলেন, আর দেশের চামড়াশিল্পের যে বেহাল অবস্থা, তাতে ট্যানারিগুলো থেকে ভালো কিছু প্রত্যাশা করা যায় কঠিন। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর কোনোটিই বছর শেষে মুনাফা করতে পারছে না। যা লভ্যাংশ দিয়েছে চার পয়সা, পাঁচ পয়সা- সেটিতেও আকৃষ্ট হওয়ার কিছু নেই। সরকারের সুষ্ঠু নীতিমালার অভাবে ফলে সম্ভাবনাময় একটি সেক্টর থেকে ভালো রিটার্ন পাওয়া যাচ্ছে না।
বিনিয়োগকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ পুঁজিবাজার সম্মিলিত জাতীয় ঐক্যের সভাপতি আ ন ম আতাউল্লাহ নাঈম বলেন, যে কোম্পানি থেকে বছর শেষে ভালো লভ্যাংশ পাওয়া যায় না, সে কোম্পানিতে কেউ বিনিয়োগ করবে না- এটাই স্বাভাবিক। চামড়া খাতের কোম্পানিগুলোর সিংহভাগ খারাপ। এমনও কোম্পানি আছে যেসব কোম্পানি নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে না।
তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তৈরি করতে হলে ভালো লভ্যাংশ দিতে হবে। নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে এবং সময় সময় নতুন বিনিয়োগের খবর জানাতে হবে। কিন্তু ট্যানারি খাতের কোম্পানিগুলো এর কোনোটিই করে না।
এ্যাপেক্স ট্যানারি: এ্যাপেক্স ট্যানারি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রপ্তানিমুখী ফিনিশড চামড়া প্রস্তুতকারক একটি প্রতিষ্ঠান। এ্যাপেক্স ট্যানারি চীন, জাপান এবং ইউরোপীয় দেশগুলোতে পণ্য রপ্তানি করে। প্রতিষ্ঠানটি ২৭ এপ্রিল, ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে স্থানান্তরিত হয়ে সাভারে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে। সাভার কারখানার উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৩২ মিলিয়ন বর্গফুট, যা হাজারীবাগ কারখানায় ছিল ২৬ মিলিয়ন বর্গফুট।
এ্যাপেক্স ট্যানারি গত ৩১ মার্চ, ২০২৫ তারিখে সমাপ্ত তৃতীয় প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী শেয়ারপ্রতি ৪ টাকা ৪৮ পয়সা লোকসান হয়েছে। গত বছর একই সময়ে শেয়ারপ্রতি ১ টাকা ২৪ পয়সা আয় হয়েছিল।
অন্যদিকে তিন প্রান্তিক মিলিয়ে বছরের নয় মাসে কোম্পানিটি শেয়ারপ্রতি ১২ টাকা ২৬ পয়সা লোকসান করেছে। গত বছর একই সময়ে ২ টাকা ৪৭ পয়সা লোকসান হয়েছিল।
প্রথম তিন প্রান্তিকে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নগদ টাকার প্রবাহ ছিল ৩ টাকা ৯৬ পয়সা, যা গত বছর একই সময়ে লোকসান ছিল ৯৫ পয়সা। গত ৩১ মার্চ, ২০২৫ পর্যন্ত কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) ছিল ৩২ টাকা ৩৮ পয়সা।
কোম্পানির আগের হিসাব বছর পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে মাত্র দুবার মুনাফা করতে পেরেছে কোম্পানিটি। এর মধ্যে ২০২১ সালে মুনাফা করেছিল ৫২ লাখ টাকা এবং ২০২২ সালে মুনাফা করেছিল ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
এর পর আর মুনাফা করতে পারেনি। দেখা গেছে, ২০২৩ সালে কোম্পানিটির নিট লোকসান করেছে ১২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা, আর ২০২৪ সালে নিট লোকসান করেছে ১২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
এ্যাপেক্স ট্যানারির কোম্পানি সচিব সুশান্ত কুমার পাল বলেন, বর্তমান সময়ে কোম্পানির নিট লোকসান এবং নেতিবাচক ইপিএস আগের বছরের তুলনায় অনেকটাই কমেছে। মূলত আমাদের পণ্য বিক্রির পরিমাণ কমেছে। এ ছাড়াও কোম্পানি পরিচালনায় ব্যয় বেড়েছে। বিদ্যুতের দাম বেড়েছে, গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া আর্থিক খাতের ঋণের সুদ বেড়ে যাওয়ায় যে পরিমাণ আয় হচ্ছে, তার সিংহভাগ ব্যয় হয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, পণ্য বিক্রি করার পর এ সময়ে আগের বছরের তুলনায় ২৬ দশমিক ১৫ শতাংশ নগদ টাকা আদায় কমেছে। ফলে যে পরিমাণ পণ্য বিক্রি হচ্ছে তার বিপরীতে সম্পূর্ণ টাকা আদায় হচ্ছে না।
কোম্পানিটি ২০২৪ সালের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ৫ শতাংশ বা শেয়ারপ্রতি ৫০ পয়সা নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছিল। এর আগের বছরও কোম্পানিটি একই হারে নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল শেয়ারহোল্ডারদের।
ডিএসইর ওয়েবসাইট সূত্রে জানা গেছে, এ্যাপেক্স ট্যানারি ১৩ নভেম্বর, ২০১৮ সালে ঘোষণা করেছে যে তারা ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য ঢাকার সাভারে ৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৩ শতাংশ জমি কিনবে। সিইটিপি স্থাপনের পর যদি এ্যাপেক্স ট্যানারি আরও অর্ডার পায়, তা হলে বর্তমান উৎপাদন ক্ষমতা পূরণ হলে তারা এই সম্পদ ব্যবহার করে উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারবে। যদিও এ বিষয়ে পরবর্তী সময়ে কোম্পানিটি কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। এমনকি কোম্পানি সচিবও এ বিষয়ে কোনো জবাব দেননি।
সমতা লেদার: পুঁজিবাজারে নিয়মিত লভ্যাংশ ঘোষণা করে না সমতা লেদার কমপ্লেক্স লিমিটেড। ২০২৪ সালের লভ্যাংশ ঘোষণার পর এখন কোনো আর্থিক অগ্রগতির তথ্য প্রকাশ করেনি কোম্পানিটি।
ফলে জুন ক্লোজিংয়ের এই কোম্পানিটি এ সময়ে ২০২৫ সালের লভ্যাংশ ঘোষণা করার কথা থাকলেও এখনো একটি প্রান্তিকেরও জানান দিতে পারেনি।
সমতা লেদার কমপ্লেক্স গত ৩০ জুন, ২০২৪ হিসাব বছরের জন্য দশমিক ৪০ শতাংশ বা শেয়ারপ্রতি ৪ পয়সা নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছিল।
এ সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ৫ পয়সা এবং আগের বছর শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছিল ৪ পয়সা। কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) ছিল ১৪ টাকা ৩৭ পয়সা।
২০২৪ সালের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর একাধিকবার নিরীক্ষকের আপত্তির মুখে পড়েছে কোম্পানিটি।
নিরীক্ষিত এই আর্থিক প্রতিবেদন প্রসঙ্গে নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান বলছে, প্রতিষ্ঠানটি যে পরিমাণ কাঁচামাল, প্রক্রিয়াধীন ও সমাপ্ত পণ্যের মজুত দেখিয়েছে, তার বিপরীতে কেবল ইনভেন্টরি সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত নথি কোম্পানির কাছে নেই।
কোম্পানি প্রতিবছরই বাকিতে বিক্রি বা পণ্য বিক্রির পর নগদ আদায় না হওয়া সংক্রান্ত যে তথ্য দিচ্ছে, তা সন্দেহজনক। এ জন্য এখন কোম্পানিটির উচিত হবে ‘লাইফটাইম এক্সপেক্টেড ক্রেডিট লস’ সংক্রান্ত প্রভিশন সংরক্ষণ করা।
এ ছাড়া কোম্পানিটি আর্থিক প্রতিবেদনে যে স্থায়ী সম্পদ দেখিয়েছে তা সঠিক নয়। কারণ এ সম্পদের যথাযথ সময় ব্যবধানে ও নিয়মিতভাবে পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে না।
‘বি’ ক্যাটাগরির এই কোম্পানিটির মোট শেয়ারের ৩৩ দশমিক ৮৭ শতাংশ শেয়ার আছে উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে। ৫ দশমিক ১১ শতাংশ শেয়ার আছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে আর ৬১ দশমিক ০২ শতাংশ শেয়ার আছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে। কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধনের পরিমাণ ৫০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ১০ কোটি ৩০ লাখ টাকা।