চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিএ) ফার্ম বা নিরীক্ষা ফার্ম সততা, আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বছরের পর বছর ধরে এসব ফার্ম নিজেরাই অসততার আশ্রয় নিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করেছে। এতে করে ঠকেছে সরকার। দেশ বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
সম্প্রতি ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) এসব ফার্ম বা নিরীক্ষা দপ্তরের গুরুতর অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে। খবরের কাগজ পত্রিকার তথ্যে এসব অনিয়ম উঠে এসেছে। অন্তত ৩৫টি সিএ বা নিরীক্ষা (অডিট) ফার্মের ব্যাপারে অনুসন্ধান চালিয়েছে এফআরসি। সিএ ফার্ম বা নিরীক্ষা ফার্মগুলোর বিরুদ্ধে কর ফাঁকিসহ সাজানো বা ভুয়া নিরীক্ষা রিপোর্ট তৈরি ও পেছনের তারিখ (ব্যাক ডেট) দিয়ে অডিট স্বাক্ষর করার মতো গুরুতর অনিয়ম পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে এফআরসি জানতে পারে, এসব ফার্মের কোনো কোনোটির টিআইএন (ট্যাক্সপেয়ার আইডেন্টিফিকেশন নম্বর) থাকলেও অবশ্য করণীয় বিআইএন (বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর) নেই। কারণ, তারা সরকারকে কর ও মূসক পরিশোধ করে না।
এসব ফার্ম জাল অডিট করা থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সংস্থার চাহিদা অনুযায়ী নিরীক্ষা প্রতিবেদন করে দেয়।
ফেমস অ্যান্ড আর নামে একটি নিরীক্ষা ফার্ম গত তিন বছরে অডিট করেছে ১ হাজার ৪৭৫টি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে প্রতি অডিটের বিপরীতে গড়ে ৫১ হাজার টাকা আয় বা রেভিনিউ এসেছে। এতে করে মোট আয় দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এ আয়ের বিপরীতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট বা মূসক হিসাব করলে তার পরিমাণ হয় ১ কোটি ১০ লাখ টাকার বেশি। কিন্তু ওই ফার্ম সরকারকে কোনো মূসক পরিশোধ করেনি। এর বাইরে ১০ শতাংশ কর দেওয়ার বিধানও রয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানের কোনোটিই সরকারকে কর দেয়নি।
এই নিরীক্ষা ফার্মটি বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির ব্যক্তিগত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরীক্ষা করছে দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু মন্ত্রী নিজেও জানতেন না যে ফার্মটি সরকারকে মূসক ফাঁকি দিয়ে আসছে। সব তথ্যই গোপন ছিল। কিন্তু থলের বিড়াল বের হয়ে আসে সম্প্রতি ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের অনুসন্ধানে।
আইনগত বাধ্যবাধকতার কারণে এফআরসিতে নিবন্ধিত হতে হয়। আর এ নিবন্ধন পেতেই আবেদন করে প্রতিষ্ঠানটি। এরপর কাগজপত্রে ঘাপলা পেয়ে অনুসন্ধান চালান এফআরসির কর্মকর্তারা। সরকারের রাজস্ব ফাঁকি ও অসততার দায়ে তারা নিরীক্ষা ফার্মটিকে বাদ দেন নিবন্ধনের জন্য করা তালিকা থেকে।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, এরপর ফার্মটির বর্তমান স্বত্বাধিকারী ফাওজিয়া হক এফআরসির বিরুদ্ধে নালিশ করেন বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে। এ ব্যাপারে মন্ত্রী তলব করেন এফআরসির চেয়ারম্যান ও শীর্ষ কর্তাদের। বিস্তারিত জানার পর মন্ত্রী নিজেও বিস্ময় প্রকাশ করেন।
সূত্রমতে, দেশে নিরীক্ষার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য ২০১৫ সালে ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং আইন প্রণয়ন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল গঠন করা হয়। এফআরসি এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে এর কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিতের মূল দায়িত্ব ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্স অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) কাছেই রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনও নিরীক্ষা ফার্মের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে।
সরকারকে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তাদের কার্যক্রমের জন্য আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে। নিরীক্ষা ফার্মগুলোকে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে কাজ করতে হবে। আর্থিক স্থিতিশীলতা বা শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নিরীক্ষকদের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে।