সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল অন্যতম। দক্ষিণ এশিয়ায় নদীর তলদেশ দিয়ে যানবাহন চলাচলকারী এটিই প্রথম টানেল। গত ২৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু টানেল উদ্বোধন করেন। পরদিন ভোর ৬টা থেকে যানবাহন চলাচল শুরু হয়। টানেলের সার্বিক বিষয় পর্যবেক্ষণে লাগানো হয়েছে ১১০টি সিসি ক্যামেরা। সেতু কর্তৃপক্ষের মতে, চট্টগ্রাম শহরে নিরবচ্ছিন্ন ও যুগোপযোগী সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং বিদ্যমান সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার ‘আধুনিকায়ন’ করতে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করবে এই টানেল। চট্টগ্রাম শহরকে চীনের সাংহাই শহরের আদলে ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ বা ‘এক নগর দুই শহর’-এর মডেলে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এত সুন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনার ছোঁয়ায় নির্মিত যে টানেল, সেখানে ঘটছে একের পর এক দুর্ঘটনা। সম্প্রতি টানেলে পরপর দুবার দুর্ঘটনায় সে আলোচনা আবারও চাঙা হয়েছে।
দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গভীর রাতে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে। গাড়ির বেপরোয়া গতি, চালকের গাফিলতি ও চোখে ঘুম এবং অসচেতনতার কারণে বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে বলে মনে করছেন নগরবিদ ও টানেল কর্তৃপক্ষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে টানেলের ফায়ার বক্স। নিয়ন্ত্রণ হারানো মাইক্রোবাসের ধাক্কায় আহত হয়েছেন নৌবাহিনীর সদস্যও। এর আগে টানেলের ভেতর টিকটক, কার রেসিংয়ের মতো ঘটনা নিয়ে হয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। কর্তৃপক্ষ দুর্ঘটনা এড়ানোর লক্ষ্যে টানেলের ভেতর স্পিড ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। এটা শুরুতেই করা দরকার ছিল। কারণ, এ দেশের চালকরা অসচেতন। গতি নিয়ন্ত্রণে না রাখা এবং অতিরিক্ত অসচেতনতায় দুর্ঘটনা অনেক বেশি হচ্ছে।
বঙ্গবন্ধু টানেলে প্রথম দুর্ঘটনাটি ঘটে গত বছরের ৩০ অক্টোবর। যান চলাচলের জন্য বঙ্গবন্ধু টানেল খুলে দেওয়ার ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই টানেলের ভেতর কার রেসিংয়ে মেতে ওঠে উঠতি বয়সী তরুণরা। গত ৩০ অক্টোবর খান দশেক গাড়ির রেসিংয়ের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে চারদিকে নানা সমালোচনা শুরু হয়। এতে টনক নড়ে টানেল কর্তৃপক্ষের। এরপরও থেমে নেই দুর্ঘটনা। সবশেষ দুর্ঘটনাটি ঘটে গত ১৮ জানুয়ারি ভোর ৪টার দিকে। এতে টানেলের ফায়ার বক্সটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
টানেল কর্তৃপক্ষ বলছে, এটি চালুর পর থেকে চালকদের সচেতন করার জন্য নির্দেশনাসংবলিত লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। তবু চালকরা অনেক ক্ষেত্রেই এসব নিয়ম মানছেন না। ওভার স্পিডে গাড়ি চালানো, চোখে ঘুম থাকা অথবা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার কারণে টানেলের ভেতর বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে। তাই আমরা যত দ্রুত সম্ভব টানেলে দুর্ঘটনা এড়াতে স্পিড ক্যামেরা বসানোর চিন্তাভাবনা করছি। কয়টি ক্যামেরা বসানো হবে, শাস্তি বা জরিমানার পরিমাণ কেমন হবে, সে বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এই মুহূর্তে স্পষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) অধ্যাপক ড. মাহমুদ ওমর ইমাম খবরের কাগজকে বলেন, টানেলের ভেতর গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে কিছু নিয়মনীতি মেনে চলতে হয়। অধিকাংশ চালক সেটা উপেক্ষা করেন। চালকদের সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি দুর্ঘটনা কিংবা অন্য কোনো কারণে গাড়ি নষ্ট হয়ে গেলে তা রাখার জন্য টানেলের ভেতরেই আলাদা জায়গা রাখতে হবে। সে ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এতে দুর্ঘটনার কারণে যানবাহন চলাচলে অসুবিধা হবে।
টানেলে দুর্ঘটনা এড়াতে চালকদের সবচেয়ে বেশি সচেতন হওয়া প্রয়োজন। এর ভেতর চাকা ফেটে গেলে ওসব গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করা মুশকিল হয়ে পড়ে। কাজেই চালকদের গাড়ি বের করার আগে চাকার অবস্থা, প্রেসার, জ্বালানি, ব্রেক ইত্যাদি পরীক্ষা করে নিতে হবে। চোখে ঘুম নিয়ে গাড়ি না চালানোর ব্যাপারে চালকদের সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি টানেল কর্তৃপক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। স্পিড ক্যামেরা বসিয়েও গাড়ি শনাক্ত ও আটক করা যাবে। দ্রুত এ উদ্যোগ কর্তৃপক্ষকে কার্যকর করতে হবে।