নিত্যপণ্যের চড়া দামে দিশেহারা সাধারণ মানুষ। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছে তারা। এবারের রমজানে প্রায় সব ধরনের খাবারের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। খরচের বোঝা সামলাতে না পেরে অনেকে খাবারের তালিকা স্বল্প করতে বাধ্য হয়েছে। বিশেষ করে ডিম, দুধ, ফল, মাছ, মাংসসহ অনেক খাবার খাওয়া কমিয়ে দিয়েছে। দাম বাড়ায় খেজুরের মতো ফল অনেকের পক্ষে এবার কেনা সম্ভব হয়নি। এতে সাধারণ মানুষের পুষ্টির ঘাটতির আশঙ্কা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশে আয়বৈষম্য বেড়েছে। গত পাঁচ বছরে এটি প্রকট আকার ধারণ করেছে। এ সময় ধনী আরও ধনী হয়েছে, গরিব আরও গরিব হয়েছে।
সানেমের গবেষণায় গিনি সহগ ব্যবহার করে বলা হয়েছে, জাতীয় পর্যায়ে বৈষম্যের হার ২০১৮ সালে ছিল শূন্য দশমিক ৩১। ২০২৩ সালে এটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ৩২-এ। করোনা মহামারি ও পরবর্তী প্রতিবন্ধকতা কীভাবে বাংলাদেশের দারিদ্র্য আয়বৈষম্য, শিক্ষা এবং খাদ্য সুরক্ষার ওপর প্রভাব ফেলছে, তা এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এবং যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের যৌথভাবে করা গবেষণা প্রতিবেদনটি সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মাসের পর মাস উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে শহরাঞ্চলে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে অধিকাংশ পরিবার তাদের খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছে। অনেক পরিবার খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে রয়েছে। গ্রামের তুলনায় শহরের দরিদ্র মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে বেশি। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি মানুষের গড় মাথাপিছু আয় বাড়ার বিপরীতে আয়বৈষম্যও বাড়ছে। অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে চলে যাচ্ছে সম্পদ। এটি উদ্বেগের বিষয়। সাধারণ আয়ের অনেকে বলেছেন, বছর দুয়েক ধরে আয় না বাড়লেও খাবারের দামে অতীতের রেকর্ড ভেঙেছে। সঞ্চয় ভেঙে বা ধারদেনা করেও চলতে কষ্ট হচ্ছে অনেকের।
২০২২ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধির সঙ্গে আয়বৈষম্য বাড়ছে। আইএমএফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত আড়াই দশকে দক্ষিণ এশিয়ার যে তিনটি দেশে আয়বৈষম্য ব্যাপক হারে বেড়েছে, সেই তিনটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হালনাগাদ খানা আয় জরিপে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমলেও আয়বৈষম্য উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।
সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের সাবেক ঊর্ধ্বতন পরিচালক ড. জায়েদ বখত খবরের কাগজকে বলেন, আয়বৈষম্য বাড়ার অন্যতম কারণ দুর্নীতি। ঘুষ, দুর্নীতিসহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে যে আয় হয়, এগুলো বন্ধ করতে না পারলে সমাজে আয়বৈষম্য বাড়তেই থাকবে। এ ছাড়া পুঁজি ও শিল্পায়নের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বৈষম্য সৃষ্টি হয়। সরকার যদি বিত্তবান বা বেশি আয়ের লোকদের কাছ থেকে বেশি কর আহরণ করে, তাহলে সমাজে সমতা আনা সম্ভব। এ জন্য সমতা নিশ্চিত করতেও আয়বৈষম্য কমানোর জন্য দরকার ন্যায়সঙ্গত করকাঠামো।
মূল্যস্ফীতি নীরব ঘাতক, মূল্যস্ফীতির ঘোড়া ছুটছে। সাধারণ মানুষ খাবারের দাম নিয়ে দিশেহারা। তারা এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ চায়। তাই সরকারকে আয়বৈষম্য ও মন্দাভাব কমিয়ে আনতে ন্যায়সঙ্গত করকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। মানুষের খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা কমিয়ে আনতে আরও উদ্যোগী হতে হবে।