কিশোর গ্যাং অপরাধ একটি সামাজিক ব্যাধি। রাজধানী ঢাকাসহ জেলায় জেলায় দিন দিন বাড়ছে এসব গ্যাংয়ের সংখ্যা ও দৌরাত্ম্য। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান চালানো সত্ত্বেও এই চক্রের লাগাম টানা যাচ্ছে না। গত চার বছরের তথ্য-উপাত্তে দেখা গেছে, মধ্যবিত্ত পরিবারের কিশোররা এই অপকর্মে বেশি জড়িত। ইদানীং উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরাও এতে যুক্ত হচ্ছে। ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ায় খুব অল্প বয়সেই বখে যাচ্ছে তারা। রাজধানীসহ সারা দেশে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে অভিযান পরিচালনা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়াদের মধ্যে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য হিসেবে প্রাপ্তবয়স্কদেরও দেখা গেছে। কিশোরদের সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদেরও। এদের বয়স ১৮ বছরের বেশি। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রেপ্তার করা কিশোর গ্যাংয়ের ১৮ বছরের বেশি বয়সী সদস্যদের পরিচয় খুঁজে বের করতে হবে।
কিশোর গ্যাংয়ের বৈশিষ্ট্যে নানা রকম পরিবর্তন ঘটেছে। বর্তমানে এই চক্রটি নানামুখী বিপজ্জনক অপরাধে জড়াচ্ছে। এলাকাভিত্তিক ডিশ ব্যবসা, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, এমনকি ছিনতাইয়ের মতো অপকর্মে তারা অবলীলায় জড়িয়ে যাচ্ছে। এতে ঘটছে আইনশৃঙ্খলার অবনতি। বিষয়টি বেশ ভাবিয়ে তুলেছে অভিভাবক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। এই গ্রুপগুলো সাম্প্রতিক সময়ে বড় ভাইদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। তারা এই গ্রুপগুলোকে নিজেদের স্বার্থে অর্থ জোগান দিচ্ছে এবং গ্রেপ্তার হলে আইনি সহযোগিতা করছে। ফলে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণকারী বড় অপরাধীদের অনেকেই আছেন জেলখানায়। তারা জেলখানার ভেতরে থেকে নির্দেশনা দিয়ে এসব গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করছেন। প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় এদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। কারণ প্রভাবশালী ও নিয়ন্ত্রণকারীরা জানে, কিশোর অপরাধের শাস্তি খুবই কম এবং তাদের সহজে ব্যবহার করা যায়। আইনে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন সাজা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিশোররা উত্তেজনাবশত বা মাদকাসক্ত হয়ে আবার কখনো টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তারা আইনকানুন ও শাস্তি সম্পর্কে তেমন কিছুই জানে না। প্রভাবশালীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে তারা বেপরোয়া হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মশিউর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের কিশোররা যথেষ্ট সৃজনশীল ও কর্মঠ। কিন্তু এই বিষয়টি আলোচনায় কম আসে। নেতিবাচক আলোচনা বেশি হয়। এটা সামনে এনে বেশি মানুষকে জানার সুযোগ করে দেওয়ার চেয়ে সামাজিকভাবে এর নিরোধ জরুরি। পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কহীনতার কারণে যথাযথভাবে সামাজিকীকরণ হচ্ছে না। তাকে পরিশোধনের জন্য নানা পথে যেতে হবে।’
কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি বন্ধ করতে হলে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে অবশ্যই রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে। প্রত্যেক অভিভাবককে তৎপর হতে হবে। বাচ্চারা কোথায় যাচ্ছে, কী করছে, কোথায় সময় কাটাচ্ছে ও কার সঙ্গে মেলামেশা করছে, তার খোঁজখবর রাখতে হবে। প্রতিটি পরিবারের সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করতে হবে। দেশে সংস্কৃতি চর্চা বাড়াতে হবে। খেলাধুলার আয়োজনসহ সামাজিক যেসব অনুষ্ঠান আছে, সেগুলোতে কিশোরদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। যেসব কিশোরকে আইনের আওতায় আনা হবে, তাদের মোটিভেশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নজরদারি বাড়াতে হবে। নতুন প্রজন্মকে সঠিক পথের দিকনির্দেশনা দিয়ে তৈরি করতে পারলে সমাজকে কিশোর গ্যাং অপরাধ থেকে মুক্ত রাখা সম্ভব হবে।