হাসপাতালগুলোতে মানুষ নিরুপায় হয়ে চিকিৎসা নিতে যান সুস্থ হওয়ার আশায়। কিন্তু সুস্থ না হয়ে উল্টো রোগাক্রান্ত হচ্ছেন মানুষ। হাসপাতালের বিছানা, রোগীর ফাইল, টয়লেট, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি, ভিজিটর ও সেবা প্রদানকারীদের মাধ্যমে একজন থেকে আরেকজনে রোগের জীবাণু ছড়ায়। হাসপাতালে ৪৮ ঘণ্টার বেশি ভর্তি থাকা প্রতি তিন রোগীর একজন নতুন করে কোনো না কোনো জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছেন।
হাসপাতাল থেকে সংক্রমণ ছড়ানো এবং স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে আইসিডিডিআরবি ঢাকায় ১১টি বড় হাসপাতালের ওপর দুটি গবেষণা পরিচালনা করে। তাতে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, রোগীর স্বজন থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীরা হাতের স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করেন না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শুধু হ্যান্ড হাইজিন মানলেই হাসপাতালে ৫০ শতাংশ ইনফেকশন কমানো সম্ভব। হাইজিন না মেনে স্পর্শ করায় তা থেকে মৃত্যু হচ্ছে অসংখ্য রোগীর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বড় একটি অংশ দেশের বাইরে চিকিৎসার জন্য যাচ্ছেন। এর নেপথ্যেও একটি বড় কারণ হাসপাতালের সংক্রমণ। জ্বর নিয়ে ভর্তি হয়ে মৃত্যু হলে মানুষের আস্থার জায়গা নষ্ট হয়ে যায়। তখনই রোগীদের বিদেশমুখী প্রবণতা চলে আসে।
ক্লিনিং স্টাফদের জীবাণু কন্ট্রোলের বিষয়ে কোনো ওরিয়েন্টেশন ট্রেনিং দেওয়া হয় না। স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের হ্যান্ড হাইজিন না করার পেছনে অপর্যাপ্ত সরবরাহ, ত্বকের প্রতিক্রিয়া, কাজের চাপ এবং সুবিধার অভাবের বিষয় উঠে এসেছে গবেষণায়। গবেষকরা সেবা প্রদানকারীদের সংখ্যা বাড়ানোর সুপারিশও করেছেন। কেউ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে দেখতে যাওয়া সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইসিডিডিআরবির গবেষণায় দেখা গেছে, রোগীর সঙ্গে গড়ে দুই থেকে তিনজন ফুল টাইম হাসপাতালে থাকেন। এটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ স্বাস্থ্যের জন্য। এক গবেষণায় উঠে এসেছে, বয়স্ক মানুষের প্রতি পাঁচজনের চারজনই একাধিক রোগে আক্রান্ত। গবেষকরা মনে করেন, ইনফেকশন রোধ করতে পারলে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমবে। এতে খরচ কমবে, জীবন বাঁচবে।
সেই সঙ্গে হাসপাতালে ভালো পরিবেশ পাবে। এ জন্য সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা দরকার। ইনফেকশন রোধ করতে কমিটি গঠনের জন্য দেশের সব হাসপাতালে চিঠি দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এই কমিটি তিন মাস পর পর এক ঘণ্টার জন্য তিনটি গ্রুপকে প্রশিক্ষণ দেবে। এই প্রশিক্ষণ না নিয়ে কেউ হাসপাতালে প্রবেশ করতে পারবেন না।
বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, যত রোগব্যাধি তার বেশির ভাগই হাতে থাকা জীবাণুর মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে। তাই হাত জীবাণুমুক্ত রাখা খুবই জরুরি। তিনি সব সময় হাতের কাছে হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।
হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসা দেওয়া হয় রোগীদের। কিন্তু হরহামেশাই রোগীর সঙ্গে আরও কিছু মানুষ যখন প্রবেশ করেন তখন প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হন। এ নিয়ে রোগী ও দেখতে আসা স্বজনদের সচেতনতা নেই বললেই চলে। হাসপাতালে সুস্থ হতে এসে জীবাণুতে আক্রান্ত হওয়ার খবর প্রায়ই উঠে আসে। এ জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অপ্রয়োজনে প্রবেশ বন্ধ করতে হবে। ভিড় কমাতে সরকারকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। স্বাস্থ্যসম্মত হ্যান্ড স্যানিটাইজেশন শতভাগ নিশ্চিত করতে পারলে হাসপাতালে জীবাণু অনেকাংশে কমে আসবে।