দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এর বড় প্রভাব পড়েছে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের আইনশৃঙ্খলায়। ছিনতাই, খুন, চুরি, ডাকাতির ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে। এতে আতঙ্কের নগরীতে পরিণত হয়েছে রাজধানী ঢাকা। নগরবাসী একধরনের আতঙ্ক নিয়ে চলাফেরা করছে। ছিনতাইকারী-ডাকাত চক্র তাদের অনুকূল পরিবেশ পেলেই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। আগে যেসব পেশাদার অপরাধী কারাবন্দি ছিল, তাদের অনেকেই জামিনে বেরিয়ে গেছে। তারা বের হয়ে বিভিন্ন ধরনের অপরাধে যুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে অসংখ্য থানায় অস্ত্রলুট হয়েছে, সেগুলোও পুরোপুরি উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এখনো অনেক অস্ত্র অপরাধীদের হাতে রয়ে গেছে। তারাও বেপরোয়া হয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে যুক্ত হয়েছে।
পেশাদার অপরাধীদের এমন বেপরোয়া তৎপরতার নেপথ্যের কারণ ও প্রতিকার নিয়েও নড়াচড়া শুরু করেছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। অপরাধীদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ার নেপথ্যে বেশ কিছু কারণ তারা চিহ্নিত করেছেন। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় শীর্ষ সন্ত্রাসীরা চাপের মুখে পড়েছে। জানা গেছে, গ্রেপ্তার আতঙ্কে কেউ কেউ পালানোর পথ খুঁজছে এবং অন্যরা আত্মগোপনে চলে গেছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা কারাগারের বাইরে থাকায় এবং সাম্প্রতিক সময়ে চাঁদাবাজিসহ খুনখারাবির ঘটনার প্রেক্ষাপটে আতঙ্ক বিরাজ করছে জনমনে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্যমতে, গত তিন মাসে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) রাজধানী ঢাকায় বিভিন্নভাবে ১৫৮ জন খুন হয়েছেন। ওই তিন মাসে ডাকাতির মামলা হয়েছে ১৭টি এবং ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১২২টি মামলা হয়েছে। এ সময়ে ৮০৩ জন ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছে ডিএমপি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, বর্তমানে ছিনতাই-ডাকাতিসহ পেশাদার অপরাধীদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ার নেপথ্যে মূলত চারটি কারণ উল্লেখযোগ্য। সেগুলোর মধ্যে প্রথমত, পেশাদার অপরাধীদের মনে পুলিশভীতি প্রায় নেই বললেই চলে। এতে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। দ্বিতীয়ত, বর্তমানে সাধারণ অভিযান বা ডিউটির সময় যেসব অস্ত্র পুলিশ সঙ্গে রাখছে, সেগুলোর অধিকাংশেই রাবার বুলেট ব্যবহার করা হচ্ছে। পুলিশ আর মারণাস্ত্র ব্যবহার করছে না। এর ফলে অপরাধীদের মনে ভয় থাকছে না। এতে তারা অপরাধ করতে দ্বিধা করছে না। তৃতীয়ত, অপরাধীরা চক্রভিত্তিক বা সংঘবদ্ধভাবে বেশি তৎপরতা চালাচ্ছে। কেউ গ্রেপ্তার হলে দ্রুত তাকে ছাড়ানোর ক্ষেত্রেও যৌথ সহযোগিতা পাচ্ছে অপরাধীরা। চতুর্থ বিষয় হচ্ছে, আইনের মারপ্যাঁচে আদালত থেকে খুব সহজেই জামিন পেয়ে যাচ্ছে পেশাদার অপরাধীরা।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, কারাগারে অপরাধীদের শাস্তির পাশাপাশি চারিত্রিক সংশোধনের জন্য কাউন্সেলিং করা হয়। আমাদের দেশের কারাগারে এসব ব্যবস্থা অপ্রতুল, আবার যা আছে তাও তেমন কার্যকর নয়। খাতা-কলমে থাকলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের সংশোধনে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, অপরাধের ধরন ও অপরাধীদের বৈশিষ্ট্যে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে, সে অনুযায়ী পুলিশের পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও পুলিশ নিজেই নিরাপত্তাঝুঁকিতে আছে। ৫ আগস্টের পর পুলিশে যে বিপর্যয় ঘটেছে, সেখান থেকে তারা এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এর মধ্যে আবার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মধ্যে এখনো সমন্বয়হীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
অন্যদিকে গ্যাংভিত্তিক বড় বড় সন্ত্রাসী-অপরাধী জামিনে বেরিয়ে গিয়ে তারাও নিজের গ্রুপ বা দল বড় করছে। প্রভাব বাড়াচ্ছে। এসব গ্যাং লিডারের গ্রুপে উঠতি সন্ত্রাসী বা ছিনতাইকারী ও ডাকাতরাও যুক্ত হচ্ছে। এ বিষয়গুলোয় ঊর্ধ্বতনদের বা সরকারকে বাড়তি নজর দিতে হবে।
রাজধানীতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অপরাধীরা সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে অনেকটাই বেপরোয়া। যে কারণে রাজধানীসহ সারা দেশে অপরাধ কর্মকাণ্ড বেড়েই যাচ্ছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও আন্তরিক ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।