করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কা সামলে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বেশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। গত সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানি ইতিবাচক ধারায় ফিরতে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুই সপ্তাহের মাথায় কানাডা, মেক্সিকো ও চীন থেকে পণ্য আমদানিতে বাড়তি শুল্ক আরোপ করায় তৈরি পোশাক খাত নিয়ে নতুন করে সম্ভাবনা দেখছেন বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা। তারা বলছেন, চীনা পণ্যে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়েছে।
এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো চীন থেকে ক্রয়াদেশ সরাবে। ফলে বাংলাদেশের সামনে বাড়তি ক্রয়াদেশ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এমনকি বিনিয়োগকারীরা চীন থেকে কারখানা সরিয়ে এখন অন্য দেশে নিতে আগ্রহী হতে পারেন। সেই বিনিয়োগ বাংলাদেশও নিতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়। এরপর চীন থেকে ক্রয়াদেশ সরতে থাকে। এ সময় চীনের ক্রয়াদেশের একটি অংশ বাংলাদেশে আসে। ওই বছর যুক্তরাষ্ট্রে ৫৯৩ কোটি ডলার পোশাক রপ্তানি হয়, যা সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকরা বলছেন, চীন থেকে বাড়তি ক্রয়াদেশ নেওয়ার মতো সক্ষমতা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর রয়েছে। তবে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কারণে সে সক্ষমতার ব্যবহার কিছুটা কম হতে পারে। চীন থেকে কম ও মাঝারি মূল্যের পোশাকের ক্রয়াদেশ বাংলাদেশে আসার সম্ভাবনা বেশি। দামি পোশাকের ক্রয়াদেশ আনতে হলে চীন থেকে স্থানান্তরিত হওয়া বিনিয়োগ বাংলাদেশে আনতে হবে। এ জন্য দরকার সরকারি পর্যায় থেকে উদ্যোগ গ্রহণ। পোশাক রপ্তানিকারকরা বলেন, শুল্ক আরোপের আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি ক্রয়াদেশ দেওয়া শুরু করেছে। নতুন ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও আলোচনা করছেন কিংবা বাংলাদেশে আসছেন। এমনকি চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে, এমন প্রতিষ্ঠানও বাংলাদেশের বায়িং হাউস ও পোশাক কারখানাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
গত মঙ্গলবার ঢাকায় সাসটেইনেবল অ্যাপারেল ফোরামের ষষ্ঠ সংস্করণ অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে দেশের পোশাকশিল্পকে আরও টেকসই করতে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাসহ আমদানি-রপ্তানিকারকদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন। বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভোক্তারা বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা উচ্চ গুণগত ও মানসম্মত পণ্য থেকে উপকৃত হয়েছেন। আমরা এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইইউ ও বাংলাদেশের মধ্যে অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী এবং বিকশিত হওয়া প্রয়োজন। ইইউ বাংলাদেশের সঙ্গে একযোগে কাজ করার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, যাতে বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টির সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। সে হিসাবে বাংলাদেশকে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় টেকসই পোশাক উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারকে প্রভাবিত করতে হলে সরকারিভাবে সম্মিলিত উদ্যোগ দরকার। পোশাকশিল্পকে টেকসই করতে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট নিরসনে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে যুগোপযোগী, আধুনিক ও টেকসই করতে দরকার কার্যকরী উদ্যোগ। সরকার তার সফল উদ্যোগের মাধ্যমে এ শিল্পকে আরও গতিশীল ও আধুনিকায়ন করতে সক্ষমতার পরিচয় দেবে, এটাই প্রত্যাশা।