গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়েছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও খুব একটা ভালো নেই। পুলিশ নিজেরাও হামলা বা মবের শিকার হচ্ছে। বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা রয়েছে। এ সুযোগে রাজধানী ঢাকায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে খুন-ছিনতাই এবং ডাকাতিসহ ভয়ানক সব অপরাধ কার্যক্রম। রাজধানীর এলাকাভেদে রাত হলে বিরাজ করছে ভীতিকর থমথমে পরিবেশ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতার কারণে পেশাদার অপরাধীরা রাতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নগরবাসীর নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করছেন নৈশপ্রহরী বা নাইটগার্ডরা। অনেক এলাকায় রাতে টহলের জন্য ‘নাইটগার্ড’ বা নৈশপ্রহরীরা দায়িত্ব পালন করেন।
তারাও এখন ভুগছেন চরম নিরাপত্তাহীনতায়। খুন, চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় জীবনের ঝুঁকিও বাড়ছে। রাত যত গভীর হয়, ভয়ও তত বাড়ে। বিপদে পড়লে কেউ সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে না। অস্ত্রসহ সন্ত্রাসীদের দেখলে লুকিয়ে থাকেন প্রহরীরা। কারণ বাস্তবসম্মত প্রশিক্ষণ না থাকায় প্রতিরোধে অক্ষম নাইটগার্ডরা। নাইটগার্ডের হাতে থাকে লাঠি, বাঁশি। এসব দুর্বল সুরক্ষাসামগ্রীর কাছে অপরাধীরা যখন অস্ত্র নিয়ে আসে, তখন প্রতিরোধ করা তো দূরের কথা, নিজেকেই পালিয়ে বাঁচতে হয়। অর্থাৎ একদিকে অস্ত্রসজ্জিত অপরাধী চক্র, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রীর অভাব, সব মিলিয়ে নৈশপ্রহরীরা কার্যত অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছেন।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) ৫৪টি ওয়ার্ড এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) রয়েছে ৭৫টি ওয়ার্ড। প্রতি ওয়ার্ডে গড়ে ১০ জন করে নৈশপ্রহরী রাতে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন। সেই হিসেবে রাজধানীতে উত্তর ও দক্ষিণ সিটির মোট ১২৯টি ওয়ার্ডের প্রায় দেড় হাজার নাইটগার্ড কর্মরত রয়েছেন।
খবরের কাগজের প্রতিবেদকের তথ্যমতে, বেশ কিছু প্রহরীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সমস্যা হলে বাঁশির শব্দে অন্য গার্ডদের ডেকে সাহায্য চাওয়া যায়। কিন্তু বাস্তবে এই সামান্য প্রস্তুতিতে সশস্ত্র অপরাধীদের মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। কোনো প্রতিষ্ঠান বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নাইটগার্ডদের জন্য নেই আনুষ্ঠানিক কোনো প্রশিক্ষণ। তাদের বেতন যতটা কম, ঝুঁকি ততটাই বেশি।
তাদের হাতে নেই কোনো কার্যকর প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বা আইনি সুরক্ষা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ক্ষেত্রে প্রশাসন তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করার প্রয়োজনীয়তা আছে। কিন্তু পুলিশ অনেক ক্ষেত্রেই তাদের অর্পিত দায়িত্ব পালন করছে না। তাদের নিজেদের ভেতরেই একধরনের ভীতি কাজ করছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশ কাজে যেতে ভয় পায়, বিশেষ করে রাতে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ না হলে নৈপ্রহরীরাও নিরাপদে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান শাহরিয়ার আফরিন খবরের কাগজকে বলেন, আগে অপরাধীরা অপরাধ করে চলে যেত। এখন অপরাধ শেষে সবার সামনে খুনও করছে। ৫ আগস্টের পর থেকে পুলিশের উপস্থিতি কম। অপরাধীরা যদি বার্তা পেত যে, অপরাধ করে পার পাওয়া যাবে না, শাস্তি পেতে হবে, তাহলে অপরাধের প্রবণতা কমত।
নৈশপ্রহরীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কম বেতনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পাহারা দিয়ে থাকেন। এ ক্ষেত্রে তাদের নেই আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থা। তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার। পুলিশি টহল বাড়ানোর পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক কমিউনিটি সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। নাগরিকদের নিরাপত্তায় যারা কাজ করেন, তাদের সুরক্ষাদানের দায়িত্বও সবার।