জাতিসংঘে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধানে সাত দফা প্রস্তাব দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে রাখাইন রাজ্যে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ প্রণয়ন। নিঃসন্দেহে বলা যায়, রোহিঙ্গাদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মায়ানমারে এবং সমাধানও সেখানেই নিহিত। কিন্তু এতদিনেও এ সংকটের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আন্তর্জাতিক অর্থায়নও মারাত্মক ঘাটতিতে পড়েছে। তাই একমাত্র শান্তিপূর্ণ পথ হচ্ছে তাদের প্রত্যাবাসন শুরু করা। রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন বন্ধ এবং দ্রুত প্রত্যাবাসন শুরু করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মায়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির ওপর কার্যকর চাপ প্রয়োগ করতে হবে। এটাই সংকটের একমাত্র সমাধান। আন্তর্জাতিক সুরক্ষা অব্যাহত রাখার তুলনায় প্রত্যাবাসনে অনেক কম সম্পদের প্রয়োজন হবে।
রোহিঙ্গারা বরাবরই নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে চেয়েছে। সাম্প্রতিক সংঘাত থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের অবিলম্বে প্রত্যাবাসনের সুযোগ দিতে হবে। বাংলাদেশ সংকটের শিকার। আমাদের সামাজিক, পরিবেশগত এবং আর্থিকভাবে বিপুল চাপ সহ্য করতে হচ্ছে। রোহিঙ্গারা মাদক পাচারসহ নানা অপরাধমূলক কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে।
এতে বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো হুমকির মুখে পড়েছে। বাংলাদেশের বেকারত্ব ও দারিদ্র্য বিবেচনায় রোহিঙ্গাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া সম্ভব নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন। সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তাদের পূর্ণ সহযোগিতা চেয়েছেন। জাতিসংঘের মহাসচিব গুতেরেস রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে বৈশ্বিক পর্যায়ে জাতিসংঘের ধারাবাহিক ভূমিকার প্রতিশ্রুতি দেন। রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান খুঁজে বের করতে বাংলাদেশের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেন।
জাতিসংঘ আয়োজিত সম্মেলনের মূল লক্ষ্য রোহিঙ্গা সংকটের প্রতি রাজনৈতিক সমর্থন জোরদার করা। আন্তর্জাতিক মনোযোগ ধরে রাখা। সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা, মানবাধিকারসহ সংকটের মূল কারণগুলো মোকাবিলায় উদ্যোগ গ্রহণ। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান ও আর্থিক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির মহাসচিব ড. কবির এম আশরাফ আলম।
আশার কথা হচ্ছে, ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য নতুন সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। এতে ১ লাখ ৭৫ হাজার নারী পাবেন প্রজনন স্বাস্থ্য পরিষেবা। নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ৬ কোটি ডলার এবং যুক্তরাজ্য ২ কোটি ৭০ লাখ পাউন্ড দেবে। গত মঙ্গলবার জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আয়োজিত মায়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘুর পরিস্থিতি নিয়ে প্রথম উচ্চপর্যায়ের সম্মেলেনে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইউএনএইচসিআরের প্রধান ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি বলেন, মায়ানমারের সাহসী পদক্ষেপ ছাড়া রোহিঙ্গাদের দুর্দশার অবসান হবে না। এ সংকটের উৎপত্তি মায়ানমারে, সমাধানও সেখানেই।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সরকারের উচিত রোহিঙ্গাদের বিষয়ে চীনের সঙ্গে আলোচনা করা। চীন সহযোগিতা না করলে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর আগে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীন সহযোগিতার আশ্বাস দিলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। চীন মায়ানমারের বর্তমান সামরিক সরকার ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সঙ্গে সমান্তরাল সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছে। এ ক্ষেত্রে চীনের উদ্যোগ বেশি কার্যকর হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
আমরাও মনে করি, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশ সরকার চীন ও মায়ানমার সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে আলোচনা করতে পারে।