নমুনা সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর-২
নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর লেখ।
প্রেক্ষাপট-১: নাসির উদ্দিন তার দুই সন্তান সাজিদ ও সাবিহাকে নিয়ে বিকেলে ১০ তলা বিল্ডিংয়ের ছাদে উঠলেন। নীল আকাশের রঙিন আভা দেখে সাজিদ বলল, আহা কী সুন্দর রঙিন আকাশ! আল্লাহ নিজ হাতে কত সুন্দরভাবে সাজিয়েছেন। এই কথা শুনে সাবিহা বলল, এটা তো প্রকৃতির সৃষ্টি মনে হয়। প্রকৃতি তাকে এভাবে সাজিয়েছে। তখন সাজিদ বলল, এ ব্যাপারে তোমার এখনো ধারণা হয়নি। এটা কোনো মুমিনের বিশ্বাস হতে পারে না। মুমিন হতে হলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে হবে যে, সবকিছুই মহান আল্লাহর সৃষ্টি।
প্রেক্ষাপট-২: রফিক সাহেব তার ব্যক্তিগত ড্রাইভারকে নিয়ে চট্টগ্রামে বেড়াতে গেলে হঠাৎ রাস্তায় দুর্ঘটনার শিকার হয়ে কোনোরকম প্রাণে বেঁচে গেলেন। তখন তিনি ড্রাইভারকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘আজকে তুমি না থাকলে আমি মনে হয় বাঁচতে পারতাম না।’
ক. তাওহিদের বিপরীত শব্দ কী?
খ. তাওহিদে বিশ্বাস বলতে কী বোঝায়?
গ. প্রেক্ষাপট-১-এ বর্ণিত সাবিহার মধ্যে কোন বিশ্বাসের অভাব রয়েছে? পাঠ্যবইয়ের আলোকে মানবজীবনে এর প্রভাব ব্যাখ্যা করো।
ঘ. প্রেক্ষাপট-২-এ বর্ণিত রফিক সাহেবের আচরণে কী প্রকাশ পেয়েছে? বর্ণিত বিষয়টি কত ধরনের হতে পারে? এর কুফল ও প্রতিকার ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ক. তাওহিদের বিপরীত শব্দ শিরক।
খ. তাওহিদ শব্দের অর্থ একত্ববাদ।
ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় আল্লাহতায়ালাকে এক ও অদ্বিতীয় হিসেবে স্বীকার করে নেওয়াকে তাওহিদ বলা হয়।
তাওহিদের মূল কথা হলো আল্লাহতায়ালা এক ও অদ্বিতীয়, তিনি তার সত্তা ও গুণাবলিতেও অদ্বিতীয়। তিনিই প্রশংসা ও ইবাদতের একমাত্র মালিক। তার তুলনা কেউ নেই। বস্তুত আল্লাহতায়ালাকে সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রিজিকদাতা ও ইবাদতের যোগ্য এক ও অদ্বিতীয় সত্তা হিসেবে বিশ্বাসের নামই তাওহিদ।
গ. প্রেক্ষাপট-১-এ বর্ণিত সাবিহার মধ্যে তাওহিদে বিশ্বাসের অভাব রয়েছে।
ঈমানের সর্বপ্রথম ও প্রধান বিষয় হলো তাওহিদ। অর্থাৎ মুমিন বা মুসলিম হতে হলে একজন মানুষকে সর্বপ্রথম আল্লাহতায়ালার একত্ববাদে বিশ্বাস করতে হবে। তাওহিদে বিশ্বাস ছাড়া কোনো ব্যক্তির ঈমান ঠিক থাকে না। অর্থাৎ সে সত্যিকারের মুসলমান হতে পারে না। ইসলামের সব শিক্ষা ও আদর্শ তাওহিদের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাওহিদ হলো আল্লাহতায়ালার একত্ববাদে বিশ্বাস। মানবজীবনে এই বিশ্বাসের প্রভাব অত্যন্ত ব্যাপক। তাওহিদে বিশ্বাস মানুষকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ করে দেয়। কেননা আল্লাহতায়ালা আমাদের একমাত্র সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা।
তাওহিদে বিশ্বাসের মাধ্যমে মানুষ এই সত্যকে স্বীকার করে নেয়। মানুষ এর দ্বারা আল্লাহতায়ালার কৃতজ্ঞতা আদায় করে। তাওহিদে বিশ্বাস মানুষকে আত্মসচেতন ও আত্মমর্যাদাবান করে মানুষ আল্লাহতায়ালা ছাড়া অন্য কারও কাছে মাথা নত করে না। ফলে জগতের সব সৃষ্টির ওপর মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় চরিত্রবান হওয়ার ক্ষেত্রেও মানবজীবনে তাওহিদের প্রভাব অপরিসীম। মানুষ আল্লাহতায়ালার গুণাবলি ও পরিচয় লাভ করে এবং সেসব গুণে গুণান্বিত হওয়ার পথ অনুসরণ করে, ফলে মানব সমাজে ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় তাওহিদের ভূমিকা অপরিসীম।
তাওহিদে বিশ্বাস মানুষকে ইবাদত ও সৎ কর্ম উৎসাহিত করে। আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি লাভের জন্য মানুষ সৎকর্মে ব্রতী হয়ে অসৎ অশ্লীল কাজ থেকে বিরত থাকে, ফলে মানব সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়।
ঘ. প্রেক্ষাপট-২-এ বর্ণিত রফিক সাহেবের আচরণে শিরক প্রকাশ পেয়েছে।
কারণ রফিক সাহেব ড্রাইভারকে বলেছেন, ‘তুমি না থাকলে আমি আজ হয়তো বেঁচে থাকতে পারতাম না।’ এ কথাতে আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা হয়েছে।
বেঁচে থাকা বা মৃত্যুবরণ করা একমাত্র আল্লাহতায়ালার হাতেই রয়েছে। তিনি আমাদের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা এবং জন্ম ও মৃত্যুর মালিক।
আল্লাহতায়ালার সঙ্গে শিরক চার ধরনের হতে পারে-
১. আল্লাহতায়ালা সত্তা ও অস্তিত্বে শিরক করা। যেমন- হজরত ঈসা (আ.)-কে আল্লাহর পুত্র মনে করা।
২. আল্লাহতায়ালার গুণাবলিতে শিরক করা। যেমন-
আল্লাহতায়ালার পাশাপাশি অন্য কাউকে সৃষ্টিকর্তা, রিজিকদাতা মনে করা।
৩. সৃষ্টি জগতের পরিচালনায় কাউকে আল্লাহর অংশীদার বানানো। যেমন- ফেরেশতাদের জগৎ পরিচালনাকারী হিসেবে মনে করা।
৪. ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহতায়ালার সঙ্গে কাউকে শরিক করা। যেমন- আল্লাহ ছাড়া কাউকে সিজদা করা, কারও নামে পশু জবাই করা ইত্যাদি।
শিরকের কুফল ও প্রতিকার: শিরক অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ। পৃথিবীর সব ধরনের জুলুমের মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো শিরক। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই শিরক চরম জুলুম।’ আল্লাহতায়ালা দুটি গুনাহকে কখনো ক্ষমা করেন না। একটি হলো শিরক অপরটি হলো অন্যের হক বা অধিকার নষ্ট করা।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা সুরা আন-নিসায় বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সঙ্গে শিরক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না, এতদ্ব্যতীত যেকোনো পাপ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।’
উপরোক্ত আলোচনায় আমরা বুঝতে পারলাম শিরক সম্পর্কে আমাদের সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে। ভুলক্রমে আল্লাহতায়ালার সঙ্গে শিরক করে ফেললে সঙ্গে সঙ্গে পুনরায় ঈমান আনতে হবে। অতঃপর বিশুদ্ধ অন্তরে তওবা করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। ভবিষ্যতে এরূপ পাপ কাজ না করার শপথ করতে হবে। তাহলে আশা করা যায়, আল্লাহতাআলা আমাদের ক্ষমা করে দিতে পারেন।
মো. আজিজুর রহমান, সিনিয়র শিক্ষক
বিএএফ শাহীন কলেজ, কুর্মিটোলা, ঢাকা/আবরার জাহিন