ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে রাশিয়ার আগ্রাসন আরও উৎসাহিত হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে কিয়েভ। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ চতুর্থ বছরে প্রবেশ করার পর এই সতর্কবার্তা এসেছে ইউক্রেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (১ জুলাই) হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের কিছু অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ রেখেছে।
হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, প্রতিরক্ষা বিভাগের একটি পর্যালোচনার ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ‘জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার’ দিয়ে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই পর্যালোচনায় অন্যান্য দেশের সামরিক সহায়তা ও সহযোগিতা মূল্যায়ন করা হয়।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, ইউক্রেনের প্রতিরক্ষার জন্য সহায়তায় যে কোনো বিলম্ব বা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কেবল আগ্রাসীকে যুদ্ধ ও সন্ত্রাস চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করবে, শান্তি খোঁজতে নয়। বিশেষ করে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার কথা জোর দিয়ে বলা হয়, কারণ রাশিয়া প্রতিদিনই ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে।
বুধবার (২ জুলাই) কিয়েভে অবস্থানরত একজন মার্কিন কূটনীতিককে আলোচনার জন্য ইউক্রেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়।
তবে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ‘সহায়তা স্থগিত বা পর্যালোচনা’ সংক্রান্ত নোটিশ পায়নি এবং জনগণকে অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে জল্পনা না করার অনুরোধ জানিয়েছে।
তবে একই বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় বলেছে, এই যুদ্ধ শেষ করার পথ হলো আগ্রাসনকারী রাষ্ট্রের ওপর ধারাবাহিক ও সম্মিলিত চাপ বজায় রাখা।
গত সপ্তাহান্তে ইউক্রেন রাশিয়ার পূর্ণ মাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে সবচেয়ে বড় আকাশ হামলার শিকার হয়, যেখানে দেশজুড়ে ৫০০-র বেশি ড্রোন, ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিকভাবে কোন কোন অস্ত্র সরবরাহ স্থগিত করা হচ্ছে তা জানায়নি। তবে এনবিসি’র খবরে বলা হয়েছে, এসব সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, হাউইটজার গোলাবারুদ, ক্ষেপণাস্ত্র ও গ্রেনেড লঞ্চার।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া পূর্ণমাত্রায় ইউক্রেনে আগ্রাসন শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে কয়েক দশমিক বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়েছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু অংশ থেকে উদ্বেগ জানানো হয়েছে যে, এত সহায়তার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অস্ত্র মজুত উদ্বেগজনকভাবে কমে যাচ্ছে।
এদিকে ক্রেমলিন এই অস্ত্র সহায়তা হ্রাসের খবরে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। ক্রেমলিন মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইউক্রেনে যত কম অস্ত্র পাঠানো হবে, বিশেষ সামরিক অভিযান তত দ্রুত শেষ হবে।’
ইউক্রেনের ক্ষমতাসীন দলের এমপি ফেদির ভেনিস্লাভস্কি এ সিদ্ধান্তকে ‘বেদনাদায়ক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘রাশিয়ার সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষাপটে এমন পরিস্থিতি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।’
ফ্রান্সভিত্তিক বার্তা সংস্থা এএফপিকে উদ্ধৃত করে ইউক্রেনের এক সামরিক সূত্র জানায়, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সহায়তার ওপর মারাত্মকভাবে নির্ভরশীল। যদিও ইউরোপ আমাদের সর্বোচ্চ সহায়তা দিচ্ছে, কিন্তু আমেরিকান গোলাবারুদ ছাড়া আমাদের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন হবে।’
গত তিন বছর ধরে ইউরোপীয় মিত্ররাও ইউক্রেনকে বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়েছে। তবে ইউরোপের রাজনৈতিক মহলে এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
চেক প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট এবং ন্যাটোর সামরিক কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান পেতর পাভেল বিবিসি রুশ বিভাগকে বলেন, তিনি ইউক্রেনের পক্ষে থাকলেও আগাম নির্বাচনের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে গোলাবারুদের সহায়তা অব্যাহত থাকবে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ‘আমি জানি না নতুন সরকারের অগ্রাধিকার কী হবে,’ বলেন তিনি।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী উপ-সচিব এলব্রিজ কলবি বলেন, ‘আমরা প্রেসিডেন্টকে ইউক্রেনে সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য বিকল্প পদক্ষেপের সুযোগ দিচ্ছি।’ তবে তিনি এটাও যোগ করেন যে, ‘আমরা এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে কৌশলগতভাবে পন্থা পর্যালোচনা করছি যাতে দেশের প্রতিরক্ষা অগ্রাধিকারে কোনো প্রভাব না পড়ে।’
গত মাসে সেন্ট পিটার্সবার্গে আয়োজিত একটি ফোরামে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, রুশ এবং ইউক্রেনীয়রা একই জাতি এবং ‘এই দৃষ্টিকোণ থেকে ইউক্রেন সম্পূর্ণভাবে আমাদের’।
বর্তমানে রাশিয়া ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে, যার মধ্যে রয়েছে ২০১৪ সালে দখল করা ক্রিমিয়া উপদ্বীপ।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়া ইউক্রেনের ভেতরে ধীর গতির হলেও স্থায়ী অগ্রগতি করছে। চলতি সপ্তাহে মস্কো পূর্ব ইউক্রেনের লুহানস্ক অঞ্চলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দাবি করেছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় দিনিপ্রোপেট্রোভস্ক অঞ্চলের কিছু অংশও দখলে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে রুশ বাহিনী।
এদিকে, মঙ্গলবার ইউক্রেন একটি রুশ অস্ত্র কারখানায় হামলা চালায়, যেখানে ড্রোন ও রাডার উৎপাদন হতো। ইউক্রেনের এই হামলায় অন্তত তিনজন নিহত হয়। কারখানাটি ইউক্রেন সীমান্ত থেকে ১ হাজারের কিলোমিটারেরও বেশি দূরে, রাশিয়ার ইঝেভস্ক শহরে অবস্থিত। সূত্র: বিবিসি
মাহফুজ/