গত সোমবার এক রায়ে ঢাকার সিএমএম আদালত বিএনপির প্রয়াত নেতা আবু তাহের দাইয়াকে কারাদণ্ড দেন। বছর চারেক আগে মারা যাওয়া এই নেতাকে আড়াই বছরের সাজা দিয়েছেন নিম্ন আদালত।
জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে মৃত বা আগে থেকেই কারাগারে আছেন অথবা বিদেশে অবস্থানরত সরকারবিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের আসামি করে মামলা করার অভিযোগ আছে বছরখানেক ধরেই। এর মধ্যে জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর মৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধে কারাদণ্ডের রায় ঘোষণায় বিষয়টি আরও জোরালোভাবে আলোচনায় আসল।
বিষয়টিকে গায়েবি মামলার গায়েবি রায় বলে পরিবার ও দল থেকে মন্তব্য করা হলেও সংশ্লিষ্ট আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) জানিয়েছেন, তাহেরের মৃত্যুর তথ্য আদালতে ছিল না। তার পরিবারের পক্ষে তা আদালতকে জানানো উচিত ছিল।
প্রয়াত দাইয়াকে কারাদণ্ড দেওয়া একই আদালত পৃথক মামলায় দলটির আরও দুজন নেতাকে কারাদণ্ড দিয়েছেন, যারা নিখোঁজ আছেন বলে তাদের পরিবার থেকে দাবি করা হয়েছে। পরিবার জানিয়েছে, দশ বছর আগে নিখোঁজ হয়েছেন বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমন, আর আট বছর আগে নিখোঁজ হয়েছেন আমিনুল ইসলাম জাকির। সোমবার ঘোষিত রায়ে বিএনপির এই দুই নেতাকে আড়াই বছর করে কারদণ্ড দিয়েছেন বিচারিক আদালত।
জানা গেছে, দণ্ডিত আবু তাহের দাইয়া ২০২০ সালের ১৯ জানুয়ারি মারা গেছেন। তিনি রাজধানীর নিউমার্কেট থানার ১৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। ঢাকা মহানগর ৩৮ (বর্তমান ২৫) নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমন ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর নিখোঁজ হন জানিয়ে তার বোন সানজিদা ইসলাম তুলি নিখোঁজ নেতা-কর্মীর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ‘মায়ের ডাক’ নামে একটি সংগঠন করেছেন। সংগঠনটি নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস সুমনের বাড়িতে গিয়ে গত ডিসেম্বরে ‘মায়ের কান্না’ নামে আরেকটি সংগঠনের প্রতিবাদের মুখে পড়েন।
রাজধানীর নিউমার্কেট থানার মামলায় আবু তাহের পুলিশের দেওয়া চার্জশিটে ৫ নম্বর আসামি ছিলেন। ২০১৫ সালে দায়ের করা এই মামলার এজাহারে তিনি ছিলেন ৭ নম্বর আসামি। প্রয়াতকে মৃত্যুর চার বছর পর সাজা দেওয়ার উদাহরণ দিয়ে বিএনপি নেতারা বলছেন, গায়েবি মামলার গায়েবি রায় হয়েছে। এতেই প্রমাণিত, বিএনপি নেতা-কর্মীকে সাজা দিয়ে যেসব রায় হচ্ছে, তা সাজানো।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার একেএম এহসানুর রহমান দৈনিক খবরের কাগজকে বলেন, ‘সাজেদুল ইসলাম সুমনের গুম হওয়ার বিষয়ে অভিযোগের তির ছিল র্যাব- ১ এর দিকে। এ কারণে তার গুমের বিষয়ে কোনো থানাই মামলা নিতে চায়নি। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাছেও সাজেদুল ইসলাম সুমনের গুমের বিষয়ে তার পরিবারের সদস্যরা দ্বারস্থ হয়েছিলেন। কমিশন এই বিষয়ে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার কাছে চিঠি পাঠিয়েছিল কিন্তু কোনো সদুত্তর পায়নি। পরবর্তী সময়ে তার পরিবারের সদস্যরা ২০১৬ হেবিয়ার্স কপার্স (অবরুদ্ধ ব্যক্তিকে বিচারালয়ে উপস্থিত করার পরোয়ানা) রিট ফাইল করেন। আমি ওই মামলার ফাইলিং লইয়ার। হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ রুল জারি করেন এবং এখনো সেই রুল পেন্ডিং আছে। সরকারের সদিচ্ছার অভাবে গুমের মতো অমানবিক কাজ যারা করেছে, আজ পর্যন্ত তাদেরকে জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।’
সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন আফরোজা ইসলাম আঁখি দৈনিক খবরের কাগজকে বলেন, গত জাতীয় নির্বাচনের আগে র্যাব আমার ভাইকে ধরে নিয়ে গেছে। এক কথায় বলব, এটা গায়েবি মামলার গায়েবি রায়। আইনি কী পদক্ষেপ নেব, সে বিষয়ে আমরা রায়ের কপি দেখে পরে সিদ্ধান্ত নেব।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) শহিদ উদ্দিন বলেন, এ মামলার আসামি আবু তাহের সূচনা থেকে পলাতক। তার অনুপস্থিতিতে এ মামলার বিচার শুরু হয়। তিনি মারা গেছেন কি না এ বিষয়ে আদালতের কাছে কোনো তথ্য ছিল না। কোনো আইনজীবী বা তাহেরের পরিবারের সদস্যরা মৃত্যুর বিষয়ে আদালতকে অবগত করেনি। আদালতকে এ বিষয়ে জানানো উচিত ছিল। মামলার নথি অনুযায়ী, আদালত বিচার করে থাকেন। আইনানুযায়ী কেউ মারা গেলে সাজার দায় থেকে স্বাভাবিকভাবেই অব্যাহতি লাভ করবে।