‘সর্বজনীন পেনশন’ স্কিমের বিষয়টি যখন প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত কোনো এক বাজেট বক্তৃতায় আনেন, এ বিষয়ে সংসদে বা বিরোধী দলে কোনো আলোচনাই হয়নি। কথা প্রসঙ্গে বলি, তার আনীত আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও এভাবে দলের কাছ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি। বিষয় দুটি ছিল যুগান্তকারী। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ়তায় পেনশনের বিষয়টি জাতীয় নীতিতে স্থান পায়। দ্বিতীয় বিষয় ‘জেলা পরিকল্পনা’ ও ‘জেলায় জেলায় সরকার’- এ বিষয়টি এখনো দল ভেবে দেখল না। কোনো দলীয় ফোরামে আলোচিতও হলো না। আশা করি, এসব বিষয় নিয়ে দলে ও সরকারে ভবিষ্যতে আলোচনা হবে।
এখন চালুকৃত সর্বজনীন পেনশন স্কিমের সর্বজনীনতা বা সামগ্রিক বিষয় নিয়ে আলোচনা তুমুল পর্যায়ে। তোলপাড় আলোচনা ‘প্রত্যয়’ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের হ্রাস পাওয়া সুযোগ-সুবিধা নিয়ে। তাই বলি, আলোচনাটি পুরো বিষয়ের সামগ্রিক আলোচনা না হয়ে আংশিক বা খণ্ডিত ‘প্রত্যয়’ভিত্তিক আলোচনা হয়ে পড়েছে। মনে হয় সম্মানিত শিক্ষকমণ্ডলী তাদের সুযোগটা পুনর্বহাল হলে তারা আন্দোলন থেকে সটকে পড়বেন।
এখানে এই সর্বজনীন পেনশন স্কিমটা সর্বজনীন কি না। নানা স্বাধীন পেশার মানুষ যেমন- বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী, বিপুল এনজিও সেক্টর, ক্ষুদ্র স্ব-কর্মনিয়োজিত ব্যক্তি, সাংবাদিক, ফ্রিল্যান্স লেখক, কনসালট্যান্ট- এ রকম বহু মানুষ আছেন তাদের জন্য এ পেনশন স্কিমে কী আছে তা পরিষ্কার নয়। মানুষ সরকারকে যে কর দিয়ে থাকে তার পেছনে কোনো না কোনো প্রণোদনা থাকতে হয়। বাংলাদেশে করদাতাদের প্রণোদনার কাঠামোটা কী?
এখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যানবাহন কোথাও কি করদাতার সাধারণ বা পৃথক কোনো প্রণোদনা আছে? তাহলে মানুষ কেন কর দিতে উদ্বুদ্ধ হবে। কর কর্মকর্তাদের ভয়! হ্যাঁ, নানা ভয় দেখিয়ে কর কর্তাদের একটি বড় অংশ ঘুষসহ রাজস্ব আদায় করেন। কর ফাইল থাকলেই এ ভোগান্তির শিকার আপনি জীবনের কোনো কোনো সময় হবেন। সার্ভ করে দেখে সত্যতা যাচাই করুন।
চালুকৃত সর্বজনীন পেনশন নীতির বড় সীমাবদ্ধতা হলো ট্যাক্স নীতির সঙ্গে পেনশন নীতি সম্পূর্ণ যোগাযোগবিহীন। পশ্চিমা উন্নত দেশগুলোর টেকসই পেনশন নীতির মূল কাঠামো হলো ট্যাক্স ও করের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। যিনি যত কর দেবেন তিনি তত বেশি পেনশন পাবেন। ট্যাক্স দেওয়ার সমান যোগ্যতা সবাই অর্জন করতে পারেননি। তারা সবাই কমবেশি ভ্যাট দেন। একদিন সবাই হয়তো ট্যাক্স নেটের অন্তর্ভুক্ত হবেন।
নানাভাবে আমাদের সে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। পেনশন কোনো হুটহাট করে নেওয়ার মতো পপুলিস্ট সিদ্ধান্ত হতে পারে না। এটি একটি কঠিন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত। এর জন্য অন্তত ১০ বছরের অগ্রিম পরিকল্পনা প্রয়োজন। যেমন- সরকার পেনশন ভিশনকে সামনে রেখে তার তহবিল সৃষ্টির একটি টেকসই উদ্যোগ নেবে। প্রথমত, প্রতিবছর জাতীয় বাজেট থেকে অন্তত ৫ শতাংশ অর্থ পেনশনের সংরক্ষিত তহবিলে জমা করবে।
অন্তত তিন বছর জমা হওয়ার পর পেনশন আইন ও কর্তৃপক্ষ গঠন করবে এবং আইন অনুসারে পঞ্চম বর্ষ থেকে পেনশন দিতে পারে। এখন যে স্কিমগুলো করা হয়েছে তা মূলত সহজ ‘ডিপোজিট পেনশন স্কিম’। এ স্কিমের কাঠামো সর্বজনীন পেনশন স্কিমের কাঠামো নয়। স্বেচ্ছাধীন এ স্কিমে সবার অন্তর্ভুক্তি কোনো দিন হবে না।
বিরাজিত সরকারি পেনশনে সরকারের ক্যাডার ও নন-ক্যাডারের সব সরকারি কর্মকর্তার অবসর সুবিধা তথা পেনশন, ছুটি নগদায়ন, উৎসব ভাতা, বৈশাখী ভাতা, আজীবন নমিনি পেনশন, প্রতিবছর ৫ শতাংশ হারে বর্ধন- সবই সরকারের রাজস্ব বাজেট থেকে হচ্ছে এবং হবে; তাও আবার কায়দা করে সেপটি নেটের খাত থেকে দেওয়া হবে। যার জন্য চাকরিজীবনে তারা কোনো চাঁদা বা কনট্রিবিউশন করবেন না।
আর বাকি ৪০৩টি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্বাধীন পেশাজীবী সাংবদিক, বেসরকারি চাকরিজীবী, কৃষক-শ্রমিক সবাইকে অনেক কম পেনশন সুবিধা নিয়েও নানা ডিপোজিট স্কিমে চাঁদা বা কিস্তি দিতে হবে। এ ব্যবস্থাটি ন্যায্যতা ও সর্বজনীনতার পরিপন্থী। এখানে সর্বজনীনতা ও ন্যায্যতা কোথায় এবং কীভাবে রক্ষিত হলো?
এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষক সমাজের কাছে প্রশ্ন, তারা কি সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য পূর্ণ পেনশন পেলে আন্দোলনে রণেভঙ্গ দেবেন? নাকি সবার জন্য ন্যায্য ও বৈষম্যহীন পেনশনের জন্য লড়বেন এবং সে পেনশন কীভাবে কার্যকর করা যায়, সরকারকে সে পরামর্শ দিয়ে যাবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো শিক্ষক পাওয়া প্রত্যয়ের কারণে ব্যাহত হলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনাদের সহকর্মীদের কথাও ভাবুন।
সরকারের জন্য পরামর্শ প্রথমত, জাতীয় সর্বজনীন পেনশনকে আন্তর্জাতিক মান ও নিয়ম অনুযায়ী সরকারের কর আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করুন। পেনশনের নিশ্চয়তা দিলে আমাদের বিশ্বাস, করের আওতা বাড়বে। বেশি মানুষ কর দেবে। কর ফাঁকি কমবে। প্রত্যেক নাগরিকের জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে একটি ‘সামাজিক নিরাপত্তা’ নিবন্ধন নম্বর দিন। তিনি করদাতা হলে কর পরিশোধের সঙ্গে সঙ্গে তার সামাজিক নিরাপত্তা হিসেবে নিয়ম অনুযায়ী তার প্রাপ্য পেনশন অর্থ জমা হয়ে যাবে।
তিনি করদাতা না হলে আপাতত সরকারের ভ্যাট তহবিলের অর্থ থেকে ন্যূনতম একটি সংরক্ষিত তহবিল সে অর্থ জোগান দেবে। তবে ভবিষ্যতে একটি সময় বেঁধে দেওয়ার দরকার হবে। একটি সময়ের পর পেনশনব্যবস্থা ফেইজ আউট হবে। কর যারা দেন না তাদের জন্য ন্যূনতম একটি পেনশন চাঁদা ধার্য করা হবে। এটি না দিলে তিনি পেনশনের যোগ্যতা হারাবেন। সম্পূর্ণ সহায়-সম্বলহীনদের জন্য রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা থাকবে। এখন যারা বিনা চাঁদায় সরকারি পেনভোগী তাদের সে ব্যবস্থা অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে আপাতত বহাল থাকলেও এটি পাঁচ বছরের মধ্যে ফেইজ আউট করতে হবে।
বর্তমান সরকারি চাকুরেসহ সবাই নিজের চাঁদা ও সরকার বা নিয়োগকর্তার টাকায় আনুতোষিক পেতে পারেন। কিন্তু পেনশন পাঁচ বছর পর সম্পূর্ণভাবে কর অনুপাতে হতে হবে। সে জন্য সরকারের ট্যাক্স নীতিতে অনেক পরিবর্তন প্রয়োজন হবে। সরকারের নীতি যদি হয় সবাইকে ট্যাক্স নেটে আনা, তাহলে ট্যাক্স হারের স্লাব কমিয়ে তা সবার সক্ষমতার পর্যায়ে আনতে হবে। আয়ের ১২ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত এ স্লাব বিস্তৃত হতে পারে। দেখা যাবে, দেশের শতভাগ মানুষ ট্যাক্স নেটের আওতায় এসেছে।
ট্যাক্স প্রদানকারীরা পেনশন পাচ্ছেন, সে বিশ্বাসযোগ্যতা সৃষ্টির জন্য গত ১০ বছর যারা ট্যাক্স দিয়েছেন কিন্তু সরকারি-বেসরকারি কোনো পূর্ণাঙ্গ পেনশন সুবিধা পাননি, এমন ব্যক্তি যাদের বয়স ৬১ বছর অতিক্রম করেছে তাদের আগামী বছর থেকে প্রতীকী পেনশন শুরু করুন। সরকার এভাবে দীর্ঘমেয়াদি একটি ভিশন দাঁড় করালে এবং সর্বস্তরে আলাপ-আলোচনা করলে এ আন্দোলনের প্রয়োজন হবে না। পেনশনব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়িত হলে একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে অনেক উঁচুতে স্থান পাবে এবং আমরা অন্তত এটি দাবি করতে পারি।
লেখক: অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞানী ও শাসন বিশেষজ্ঞ
Webpage:tofailahmed.info
.jpg)
