ভালো প্রশাসনের অন্যতম একটি সংক্ষিপ্ততম সংজ্ঞা- ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা’। এমনকি জীবনের সর্বক্ষেত্রে এটি সমানভাবে সত্য। রাজনীতি ও প্রশাসনে এটি একটি নির্মম সত্য। তাই সঠিক ও সময়োচিত সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হলে রাজনীতিতে মারাত্মক বিরূপ অবস্থার শিকার হতে হয়। কথায় বলা হয়, একজন চিকিৎসকের বিলম্ব বা ভুল সিদ্ধান্তে একজন রোগীর জীবনশঙ্কা হয়, কিন্তু রাজনীতিবিদের ভুল ও বিলম্বিত সিদ্ধান্তে দেশ, জাতি, সমাজ অনেকে অনেকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক দল সে রকম একটি পরিস্থিতির শিকার হতে যাচ্ছে। বয়সের কারণে স্বাস্থ্যগত কম সক্ষমতার পরিষ্কার সংকেত পাওয়া সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থিতা অব্যাহত রাখার জেদ ধরে তার নিজের, দল, দেশ এবং বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রমনা মানুষের মধ্যে ব্যাপক হতাশার জন্ম দিয়েছিলেন। তিনি একসময় বললেন একমাত্র বিধাতা তাকে নিবৃত্ত করতে পারে। শেষ পর্যন্ত তাই-ই হলো। করোনা তাকে গৃহবন্দি করল এবং তিনি পিছু হটলেন।
কিন্তু শেষ ট্রেনটি ধরার জন্য যথেষ্ট সময় তিনি হাতে রাখেননি। তাও আবার সাপ মেরে লেজে প্রাণ রেখে যাচ্ছেন। পুরো বিষয়টা দলের ওপর ছেড়ে না দিয়ে তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসকে মনোনীত করে পেছেন। এ মুহূর্ত ডেমোক্র্যাটিক দলের পক্ষে এটি গেলা ও ফেলা দুটোই সমান বিপদের। গিলতে গেলে প্রশ্ন আসছে- ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিপরীতে তিনি কি পাল্টা স্রোত তৈরিতে সমর্থ? ফেলতে গেলে প্রশ্ন দেখা দেবে- তিন মাস সময়ের মধ্যে নতুন একজন প্রার্থী খোঁজা এবং তার পক্ষে সংগঠিত হওয়া কতটুকু সম্ভব।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে বিতর্ক ও জনমতে বাইডেনকে টেক্কা দিয়েছেন। সারা দেশে বাইডেনের যে পরিচিতি ও ভাবমূর্তি, কমলার তা নেই। এক হিসাবে কমলাকে আরও সহজে পরাজিত করা সম্ভব বলে ট্রাম্প শিবির প্রত্যয়ের সঙ্গে ঘোষণা দিচ্ছে। কারণ বাইডেন যেসব নীতির কারণে সমালোচিত, কমলা তারই উত্তরাধিকার বহন করেন। কমলার পক্ষে নিজের একটি স্বতন্ত্র পথ বের করে আমেরিকান জাতি ও বিশ্বকে আশ্বস্ত করার সময় অত্যন্ত সংকীর্ণ।
জ্যামাইকান পিতা ও ভারতীয় মাতার অত্যন্ত যোগ্য আইনজ্ঞ সন্তান এবং বাইডেন সময়ের নিষ্প্রভ ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কমলা হ্যারিসের অনেক ইতিবাচক দিক হয়তো আছে। ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের দুবারের নির্বাচিত অ্যাটর্নি জেনারেল এবং ইউএস সিনেটর হিসেবে তার দক্ষতা প্রশংসিত। ট্রাম্পের সঙ্গে আগামীতে কোনো বিতর্ক হলে সেখানে তিনি খারাপ করবেন না। কিন্তু এ মুহূর্তে বিভক্ত মার্কিন জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে ভোট বাক্সে তার প্রতিফলন কতটুকু সম্ভব, তা সন্দেহের উদ্রেক করে। তিনি এশিয়ান, আফ্রিকান, হিস্পানিক, সাধারণ নারী ও যুব ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পারবেন বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু তা ভারসাম্যহীন রাজ্যগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের জেতার জন্য যথেষ্ট কি না।
ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উদারমনা গণতান্ত্রিক আমেরিকান জনসমাজ ‘বিপজ্জনক ব্যক্তি’ হিসেবে দেখে। ন্যাটো জোট ও ইউরোপিয়ানরা ট্রাম্প-ভীতিতে আছেন এবং প্রকাশ্যে না বললেও তা পুরোমাত্রায় বিদ্যমান। পুতিন ট্রাম্পের জন্য হাত বাড়িয়ে রেখেছেন, যা আমেরিকানরা পছন্দ করেন না। তার একরোখা, দাম্ভিক ও স্বৈরাচারী স্বভাব সহজাত। তাতে কোনো রাখঢাক নেই। তার বর্ণবাদী ও অভিবাসী বিদ্বেষ, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধানে দুই রাষ্ট্রতত্ত্বের বিরোধিতা এবং চরম ও কট্টর ডানপন্থাও সর্বজনবিদিত।
এমতাবস্থায় কমলা কিছুটা সক্ষমতা ও দৃঢ়তা দেখাতে পারলে নৈতিক কারণে ভোটবিমুখ অনেকে বুথে ফেরত আসতে পারেন। বিশেষত আরব বংশীয় জনগোষ্ঠী, তরুণ ছাত্রসমাজ- যারা আমেরিকার ইসরায়েল নীতি সমর্থন করেন না, তারা আকৃষ্ট হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে তার নীতি বাইডেন থেকে কতখানি দৃশ্যমানভাবে পৃথক হবে তা দেখার বিষয় হবে। যদিও ডেমোক্র্যাটদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক নীতি স্বাভাবিকভাবে রিপাবলিকানদের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর ও মধ্যবিত্তের সহায়ক। একটি প্রশ্নে ডেমোক্র্যাটরা বারবার নাজেহাল হবেন, তারা অভিবাসন প্রশ্নে ব্যর্থ।
আর একটি ক্ষত তাদের তাড়া করবে, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রার্থিতা নিয়ে নিশ্চিত হতে যদি বেগ পেতে হয়। এটি দলে সংশয় সৃষ্টি করবে এবং রিপাবলিকানদের অনেক বেশি মারমুখী প্রচারে উদ্বুদ্ধ করবে। ব্রিটেনে কনজারভেটিভরা গত একটি টার্মব্যাপী এ সমস্যা কাটাতে পারেনি। গত নির্বাচনে তাদের তার চরম মাশুল দিতে হয়েছে। যদি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা ঘুরে দাঁড়াতে না পারেন, তা হলে তারা শুধু প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নয়, কংগ্রেসের দুই কক্ষ যথা সিনেট এবং প্রতিনিধি পরিষদেও তার দায় চুকাবেন। সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে তাদের আসন কমতে পারে।
বয়স এবং স্বাস্থ্য- এই দুইয়ের স্বাভাবিক বাস্তবতা অনেক সময় অনেকে ক্ষমতার মাদকতায় বুঝতে চান না। আমেরিকার সংবিধান তাই একটি মোক্ষম বিধান রেখেছে- দুবারের বেশি কেউ প্রেসিডেন্ট পদের যোগ্য নন। সংবিধানের কোনো বিধান না থাকলেও ব্রিটেনে কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকে সাধারণত দুবারের বেশি স্বপদে দেখা যায় না। মার্গারেট থেচারের মতো লৌহমানবীকে তৃতীয় টার্ম অসম্মানজনকভাবে ছাড়তে হয়। ব্রিটেনে একটি গণতান্ত্রিক প্রথা অনুসরণ করে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দুই টার্মের পর দলে নতুন নেতা নির্বাচন করে বা পুরোনোরা স্বেচ্ছায় অবসরে যান। জো বাইডেন আমেরিকার রাজনীতির একজন অত্যন্ত সফল ব্যক্তিত্ব। ৫০ বছরের অধিক সময় ধরে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয়। সজ্জন হিসেবেও তিনি সর্বজন শ্রদ্ধেয়।
আমেরিকার রাজনৈতিক পদের সবই তিনি অধিকার করেছেন এবং সফলতার সঙ্গে নির্বাহও করেছেন। সে হিসেবে তার উদাহরণ তিনি নিজে। যে সিদ্ধান্তটি ২১ জুলাই ২০২৪-এ নিলেন, সে সিদ্ধান্তটি অন্তত তিন মাস আগে নিলে আমেরিকার ইতিহাসে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে তার প্রস্থান হতো মহান ও গৌরবময়। দল-মতনির্বিশেষে কোটি মানুষ চোখের জলে তাকে বিদায় সম্ভাষণ জানাতেন। সময়ের সিদ্ধান্ত তিনি অসময়ে নিলেন। যার খেসারত তিনি, তার দল এবং হয়তো আমেরিকা ও আমেরিকার বাইরে অনেককে দিতে হতে পারে।
যদি কমলা হ্যারিস স্রোতের গতিপথ ঘোরাতে পারেন, তা হলে আমেরিকার ইতিহাসে এশিয়ানদের প্রথম কেউ প্রেসিডেন্ট হবেন এবং গণতন্ত্র নিয়ে বিশ্বব্যাপী যে শঙ্কা তা দূর হবে। সত্যিকারভাবে হবে কি না জানি না, আপাতত মনস্তাত্ত্বিকভাবে আমেরিকার গণতন্ত্রের পথ শঙ্কামুক্ত হবে। তবে আমার বিশ্বাস, ওভাল অফিস থেকে নির্বাচনি দায়িত্ব থেকে নির্ভার বাইডেন বিদায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দু-একটি অত্যন্ত আবেগঘন ভাষণ দেবেন, যা সাধারণ আমেরিকানদের কিছুটা প্রভাবিত করতে পারে। বারাক ওবামা ও ন্যান্সি পেলোসির ভূমিকাও এখনো দেখার অপেক্ষায় রয়েছে। এসব দেখার জন্য শিকাগোর ডেমোক্র্যাটদের কনভেনশন পর্যন্ত সবাইকে অপেক্ষা করতে হবে।
লেখক: অধ্যাপক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শাসন ও রাজনীতি বিশ্লেষক
webpage:tofailahmed.info
.jpg)
