বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, ‘একাত্তরে আমরা কোনো অপরাধ করিনি, তাহলে ক্ষমা চাইব কেন? বরং যাদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিষয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।’
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর কর্মসূচি ঘোষণা উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে হামিদুর রহমান আযাদ মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে এমন দাবি করেন। সংবাদ সম্মেলনে দলটির পক্ষ থেকে আগামী ২ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত মাসব্যাপী বিস্তারিত কর্মসূচি ও ৩ দফা প্রধান দাবি পেশ করা হয়। অন্যদিকে গত রবিবার জাতীয় সংসদে বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জামায়াতকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। বিএনপি মহাসচিবের সেই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল জামায়াতের শীর্ষ নেতারাও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানান।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘জাতীয় সংসদে এবং সংসদের বাইরে বিএনপির নেতারা বারবার মুক্তিযুদ্ধের পুরোনো বিতর্ক সামনে এনে জাতিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন। কিছুদিন পরপরই বিএনপির মহাসচিবসহ তাদের মন্ত্রী-এমপিরা ৫০-৬০ বছর আগের মীমাংসিত ৭১-এর ইস্যু পার্লামেন্টে নিয়ে এসে নতুন বিতর্ক তৈরি করছেন। তারা প্রশ্ন তোলেন, একাত্তরে কার কী ভূমিকা ছিল? আমরাও পাল্টা প্রশ্ন করতে চাই, বিএনপি যখন ক্ষমতায় এসেছিল, তখন স্বাধীন বাংলাদেশে অন্তত ১৪-১৫ জন অখণ্ড পাকিস্তানের সমর্থককে কেন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রী বানিয়েছিল? তার জবাব দিন।’
সাবেক জোট রাজনীতির প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ‘বিএনপিই দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় জামায়াতের সঙ্গে জোটগত রাজনীতি করেছে। যদি ১৯৭১ সালের প্রশ্নই মূল বিষয় হয়, তাহলে এত বছর জোট করার সময় সেই প্রশ্ন কোথায় ছিল? রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য গোলাম আযমের মগবাজারের বাসায় বিএনপি নেতারা ধরনা দিয়েছিলেন। তখন কি একাত্তরের কথা মনে ছিল না? আমি তো মাঝে মাঝে বলে থাকি—সঙ্গে থাকলে সঙ্গী, না থাকলে জঙ্গি!’
সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমের একটি অংশের ভূমিকা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘কয়েকটি করপোরেট মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যম নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পরিবর্তে একটি রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য প্রতিবেদন করছে। ফ্যাসিবাদের রেজিম চেঞ্জ হওয়ার আগে এই পত্রিকাগুলো নির্লজ্জভাবে ফ্যাসিবাদের দালালি করেছে, অর্থ খেয়েছে এবং জনতার রোষে পড়ে অনেকে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। হঠাৎ করে আপনারা রূপ পরিবর্তন করে ফেললেন। ইয়েলো জার্নালিজম বা হলুদ সাংবাদিকতা কোনো বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা নয়। এটি দেশ ও সভ্যতাকে ধ্বংস করে।’
সংবাদ সম্মেলনে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘বিভাজনের রাজনীতির কারণেই জাতীয় ঐক্য গড়ে ওঠেনি। দুঃখজনকভাবে বর্তমান সরকারও নেপথ্যে থেকে বিভিন্নভাবে বিভাজনের রাজনীতি উসকে দিচ্ছে। পত্রিকায় দেখেছি, বিএনপির মহাসচিব বলেছেন—স্বাধীনতাবিরোধিতার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, ফ্যাসিবাদ যেভাবে কথা বলত, আজ একই সুরে কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে সেই রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। ‘তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের মূল বার্তাই ছিল—‘তুমি কে, আমি কে? আমরা সবাই বাংলাদেশি।’ তাই পুরোনো বিভাজনের রাজনীতি এখন ইতিহাসের অংশ। এসব পুরোনো কৌশলে আর কোনো লাভ হবে না। আগে আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখুন। আমরা কোনো অপরাধ করিনি, তাহলে ক্ষমা চাইব কেন? বরং যাদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিষয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই এ ধরনের বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও দায়িত্বশীল ও সতর্ক হওয়া উচিত।’
সংবাদ সম্মেলনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করতে এবং শহিদদের স্মরণে মাসব্যাপী বিস্তারিত কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ২ থেকে ৯ জুলাই রাজধানীতে জুলাইয়ের শহিদ, আহত ও পঙ্গু পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময়, স্মৃতিচারণা, আলোচনা সভা ও দোয়া। ১৬ জুলাই ‘জুলাই শহিদ দিবস’ উপলক্ষে ঢাকার দুই মহানগরীর উদ্যোগে হবে আলোচনা সভা। ১৮ থেকে ৩১ জুলাই সারা দেশে শহিদ, আহত ও পঙ্গু পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং আলোচনা সভা। ১ আগস্ট দেশের সব মহানগরী, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ‘গণমিছিল’। ২ থেকে ৪ আগস্ট শ্রমিক সংগঠনের উদ্যোগে বিভিন্ন বিশেষ কর্মসূচি। ৫ আগস্ট ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে ১১ দলের যৌথ উদ্যোগে রাজধানীসহ দেশব্যাপী সমাবেশ ও মিছিলে জামায়াতে ইসলামীর অংশগ্রহণ। এ ছাড়া নারী বিভাগ, ছাত্র সংগঠন এবং জুলাই যোদ্ধাদের ফোরামগুলোর পক্ষ থেকে পৃথক কর্মসূচি পালন করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল হালিম, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মো. সেলিম উদ্দিন এবং কেন্দ্রীয় সহকারী প্রমুখ।