অন্যের দোষচর্চা বা পরনিন্দাকে আরবিতে গিবত বলা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) গিবতের পরিচয় দিয়ে বলেছেন, ‘গিবত হলো তোমার ভাইয়ের এমন আচরণ বর্ণনা করা, যা সে খারাপ জানে।’ যদি ওই ব্যক্তির মাঝে সত্যিই এমন আচরণ থাকে তাহলে এটা হবে গিবত, অন্যথায় অপবাদ।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা কি জান গিবত কি? তখন সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ভালো জানেন। এরপর তিনি বললেন, তোমার ভাই সম্পর্কে এমন আলোচনা করা, যা শুনলে সে দুঃখিত হবে। একজন সাহাবি বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি কি মনে করেন যে, আমি যা বলছি, তা যদি তার মধ্যে থাকে? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তুমি যা বলছো, তা যদি তার মধ্যে থাকে, তাহলে তা গিবত আর যদি না থাকে, তা হলে তা অপবাদ।’ (মুসলিম, ২/৩২২)
আমাদের সমাজে অন্যের দোষচর্চা একেবারেই সহজ বিষয়। কেউ ইচ্ছায়, আবার কেউ অনিচ্ছায় অন্যের দোষচর্চা করে বেড়ায়। এতে পারস্পরিক ও সামাজিক শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্ট হয়। ঝগড়া, মামলা-মোকাদ্দমা, খুন-খারাবিসহ বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হয়। অন্যের দোষচর্চা কবিরা গুনাহ। আল্লাহ পরনিন্দাকে খুব ঘৃণিত কাজ বলে উল্লেখ করেছেন। পবিত্র কোরআনে পরনিন্দাকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা একে অপরের গিবত করো না। তোমাদের কেউ কি স্বীয় মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করাকে পছন্দ করো? অনন্তর তোমরা তা অপছন্দই করো।’ (সুরা হুজুরাত, ১২)
এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মিরাজকালে আমি এমন কিছু লোকের কাছ দিয়ে অতিক্রম করলাম, যাদের নখগুলো পিতলের তৈরি, তারা তা দিয়ে তাদের মুখমণ্ডল ও বক্ষস্থল ছিঁড়ছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে জিবরাইল, এরা কারা? তিনি বললেন, এরা তারাই যারা মানুষের গোশত ভক্ষণ (পরনিন্দা) করত এবং তাদের ইজ্জত-সম্মান বিনষ্ট করত।’ (মিশকাতুল মাসাবিহ, ৪৮৭৪)
যে ব্যক্তি মানুষের দোষ-ত্রুটি অনুসন্ধান করে আল্লাহ তার দোষ-ত্রুটি অনুসন্ধান করেন। আবু বরয়া আল আসলামি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হে লোকসকল! যারা মুখে ঈমান এনেছ অথচ অন্তরে ঈমান প্রবেশ করেনি, তোমরা গিবত করো না এবং অন্যের দোষ-ত্রুটি অন্বেষণ করো না। কারণ, যে তাদের দোষ-ত্রুটি অন্বেষণ করবে, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার দোষ-ত্রুটি অন্বেষণ করবেন। আর আল্লাহ যার দোষ-ত্রুটি অন্বেষণ করবেন, তাকে অপদস্থ করে ছাড়বেন।’ (আবু দাউদ, ৩২৯)
উপরের আয়াত ও হাদিসের আলোকে বোঝা যায়, গিবত কতটা ন্যক্কারজনক ব্যাপার। আল্লাহতায়ালা গিবত করাকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। এখানে মৃত মানে অনুপস্থিত এবং গোশত খাওয়া মানে দোষচর্চা করা। মৃত মানুষের গোশত খাওয়া যেমন ঘৃণিত কাজ, তেমনি গিবত করাও ঘৃণিত কাজ। একজন মৃত মানুষের শরীর থেকে গোশত খুলে নিলেও মৃত ব্যক্তি যেমন কোনো প্রতিবাদ করতে বা বাধা দিতে পারে না, তেমনি একজন অনুপস্থিত ব্যক্তির নামে হাজারটা সত্য-মিথ্যার কথা বর্ণনা করা হলেও অনুপস্থিত থাকার কারণে সে ওইসব কথার কোনো প্রতিবাদ করতে পারে না কিংবা নিজের সপক্ষে বক্তব্য দিতে পারে না।
লেখক: আলেম ও মাদরাসা শিক্ষক