পৃথিবীতে যেকোনো প্রাসাদ বা সুউচ্চ ভবনে রাজকীয় প্রবেশদ্বার নির্মাণ করা হয়, যাতে করে বাইরে থেকেই এর আভিজাত্য ফুটে ওঠে যথার্থভাবে। পৃথিবীর সঙ্গে জান্নাত কোনোভাবেই তুলনীয় নয়। শুধু বোঝার সুবিধার্থে উদাহরণ দেওয়া। সুউচ্চ, সুবিশাল, সুবিস্তৃত জান্নাতের দরজা কতটা রাজকীয় হবে, কারুকার্যময় হবে তা কল্পনা করাও কোনো হৃদয়ের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে, জান্নাতের প্রবেশদ্বার একটি নয়; এর রয়েছে কয়েকটি দরজা। আল্লাহর প্রিয় বান্দা ও ফেরেশতারা এ সকল দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করবেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর মুত্তাকিদের জন্য রয়েছে উত্তম আবাস—চিরস্থায়ী জান্নাত। এর দরজাগুলো তাদের জন্য খোলা থাকবে। তারা সেখানে বসবে হেলান দিয়ে। সেখানে তারা নানারকম ফলমূল ও পানীয় চাইবে।’ (সুরা সাদ, আয়াত: ৪৯-৫১)
মুমিনরা জান্নাতের নিকটবর্তী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দরজাগুলো খুলে দেওয়া হবে। ফেরেশতারা তাদের সাদর সম্ভাষণ জানাতে থাকবে—“যখন তারা জান্নাতের কাছে পৌঁছাবে, তাদের জন্য জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হবে এবং জান্নাতের রক্ষীগণ তাদের বলবে, ‘তোমাদের প্রতি সালাম। তোমরা সুখী হও এবং জান্নাতে প্রবেশ করো স্থায়ীভাবে সেখানে বসবাসের জন্য।” (সুরা জুমার, আয়াত: ৭২)
জান্নাতের মোট আটটি দরজা রয়েছে। দরজাগুলোর নাম—
এক. বাবুস সালাত (নামাজের দরজা): যারা নিজেদের নামাজের ব্যাপারে সচেতন, আন্তরিক একনিষ্ঠতার সঙ্গে নামাজ আদায় করে, তাদের সম্মানে জান্নাতের এ দরজার নামকরণ করা হয়েছে।
দুই. বাবুল জিহাদ (জিহাদের দরজা): যারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর পথে তাদের জীবন ও সম্পদ দিয়ে লড়াই ও সংগ্রাম করে, তাদের সম্মানে জান্নাতের এই দরজার নামকরণ করা হয়েছে।
তিন. বাবুর রাইয়ান (পরিতৃপ্তি লাভের দরজা): এই দরজা দিয়ে শুধু রোজাপালনকারীরা প্রবেশ করবে। সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে আল্লাহর রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জান্নাতে আটটি দরজা রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে একটি দরজার নাম ‘রাইয়ান’। কিয়ামতের দিন এ দরজা দিয়ে শুধু রোজাপালনকারীরা প্রবেশ করবে। তারা ছাড়া অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। ঘোষণা করা হবে, রোজাপালনকারীরা কোথায়? তখন তারা উঠে দাঁড়াবে। তারা ছাড়া আর কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। তারা প্রবেশ করলে, দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে। আর কারও প্রবেশ করার সুযোগ থাকবে না।’ (বুখারি, হাদিস: ১৮৯৬)
চার. বাবুস সাদাকা (দানের দরজা): মানুষের প্রয়োজনে যারা নিজেদের অর্থ-সম্পদ দিয়ে মানুষকে সাহায্য করেছে, তাদের সম্মানে জান্নাতের এই দরজার নামকরণ করা হয়েছে।
পাঁচ. বাবুল ঈমান (ঈমানের দরজা): এই দরজার নামকরণ করা হয়েছে তাদের সম্মানে, যারা বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
ছয়. বাবুল-কাজিমিন আল-গায়িজ ওয়াল আফিনা আনিন্নাস (রাগদমন ও মানুষের ভুল ক্ষমা করা লোকদের দরজা): এই দরজার নামকরণ করা হয়েছে তাদের সম্মানে, যারা অন্যের ভুলকে ক্ষমা করে এবং নিজেদের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করে।
সাত. বাবুর-রাজিয়িন (সন্তুষ্টদের দরজা): যারা সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপরে সন্তুষ্ট এবং আল্লাহও যাদের ওপরে সন্তুষ্ট, আর-রাজিয়িন তাদের সম্মানে নির্মিত দরজা।
আট. বাবুত তাওবা (ক্ষমাপ্রার্থনার দরজা): নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুপ্রাণিত হয়ে যারা আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করেছে, তাদের সম্মানার্থে জান্নাতের এই দরজার নামকরণ করা হয়েছে।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে নবিজি (সা.) জান্নাতের উপরিউক্ত নামগুলো নির্দেশ করে বলেছেন, ‘‘যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে একই জাতীয় দুটি বস্তু ব্যয় করবে, তাকে জান্নাতের বিশেষ দরজা থেকে ডেকে বলা হবে, হে আল্লাহর বান্দা এটাই তোমার জন্য কল্যাণকর। যে নিয়মিত নামাজ আদায় করে, তাকে বাবুস সালাত থেকে ডাকা হবে। যে জিহাদ করে, তাকে বাবুল জিহাদ থেকে ডাকা হবে। যে সদকা করে, তাকে বাবুস সদকা থেকে ডাকা হবে। যে রোজা পালন করে, তাকে বাবুর রাইয়ান থেকে ডাকা হবে। এতটুকু শুনে আবু বকর (রা.) বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর কসম! যাকে জান্নাতের দরজাগুলোর মধ্যে থেকে একটি দরজা দিয়ে ডাকা হবে তার তো কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু এমন কেউ কি থাকবে, যাকে সবগুলো দরজা থেকে একসঙ্গে ডাকা হবে?’ আল্লাহর রাসুল বলেন, ‘অবশ্যই। আর আমি আশা করি, তুমি হবে তাদেরই একজন!’’ (বুখারি, হাদিস: ১৮৯৭)
লেখক: আলেম ও গবেষক