মানুষের জীবনে পরীক্ষা বহু রকমের হয়। তবে সব পরীক্ষার মধ্যে সবচেয়ে কঠিন ও ভীতিকর হলো অভাব, অক্ষমতা এবং লাঞ্ছনা। এই তিনটি বিষয় শুধু মানুষের বাহ্যিক জীবনকেই বিপর্যস্ত করে না, বরং ধীরে ধীরে তার আত্মবিশ্বাস ও মনের গভীরে এক গভীর অন্ধকার নামিয়ে আনে। এই অন্ধকার থেকে বাঁচতে এবং আত্মমর্যাদার সঙ্গে পৃথিবীতে টিকে থাকতে আমাদের প্রিয় নবি হযরত মুহাম্মদ (সা.) মহান আল্লাহর কাছে একটি বিশেষ দোয়া বারবার পড়তেন। তিনি প্রার্থনা করতেন: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিনাল ফাকরি, ওয়াল কিল্লাতি, ওয়ায যিল্লাতি’।
দোয়ার উচ্চারণ ও অর্থ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিনাল ফাকরি, ওয়াল কিল্লাতি, ওয়ায যিল্লাতি; ওয়া আউযুবিকা মিন আন আযলিমা আও উযলামা।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাইছি দারিদ্র্য থেকে, স্বল্পতা (অভাব) থেকে এবং লাঞ্ছনা-অপমান থেকে। আমি আপনার কাছে আরও আশ্রয় চাইছি কাউকে জুলুম করা থেকে অথবা নিজে মজলুম হওয়া (কারও জুলুমের শিকার হওয়া) থেকে। (সুনানে আবু দাউদ, নাসাঈ)
শক্তিশালী দোয়ায় তিনটি প্রধান সংকট থেকে মুক্তি চাওয়া হয়েছে:
১. দারিদ্র্য (আল-ফাকর): অভাব মানুষকে অনেক সময় সত্য পথ থেকে বিচ্যুত করে। দারিদ্র্যের কশাঘাতে পিষ্ট হয়ে মানুষ যেন তার ঈমান ও আমল হারিয়ে না ফেলে, সেজন্যই এই প্রার্থনা।
২. স্বল্পতা বা অপ্রতুলতা (আল-কিল্লাত): এটি শুধু অর্থের স্বল্পতা নয়; বরং সামর্থ্য, ধৈর্য কিংবা নেক আমলের স্বল্পতাও হতে পারে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যেন আমাদের প্রয়োজনীয় সামর্থ্য ও উপায়-উপকরণ থাকে, রাসুল (সা.) সেই শিক্ষাই দিয়েছেন।
৩. লাঞ্ছনা বা অপমান (আয-যিল্লাত): মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার সম্মান বা আত্মমর্যাদা। সমাজে অবজ্ঞার পাত্র হওয়া কিংবা অপদস্থ হওয়া থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর সাহায্য চাওয়া মুমিনের অনন্য বৈশিষ্ট্য।
আত্মমর্যাদা ও প্রাচুর্যের শিক্ষা
এই দোয়াটি কেবল কিছু শব্দের সমষ্টি নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন। এটি আমাদের শেখায় যে— মুমিন কখনো হীনম্মন্যতায় ভুগবে না। সে আল্লাহর কাছে যেমন নিজের প্রয়োজন মেটানোর জন্য ‘প্রাচুর্য’ চাইবে, তেমনি সমাজের বুকে মাথা উঁচু করে বাঁচার জন্য ‘সম্মান’ও প্রার্থনা করবে। একই সঙ্গে অন্যের ওপর অন্যায় করা এবং অন্যের অন্যায়ের শিকার হওয়া— উভয়টিই ইসলামের দৃষ্টিতে অনাকাঙ্ক্ষিত।
জীবনকে আলোকিত করার পাথেয়
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো এই দোয়াটি সাহাবায়ে কেরাম অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সংরক্ষণ করেছেন। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনেও এই দোয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে বর্তমানের অস্থির সময়ে, যখন মানুষ অভাব আর অপমানের ভয়ে তটস্থ, তখন এই ঐশী প্রার্থনা আমাদের হৃদয়ে প্রশান্তি ও ভরসা জোগাতে পারে।
আসুন, আমরা আমাদের প্রতিটি মোনাজাতে এই দোয়াটিকে স্থান দেই। মহান আল্লাহর কাছে অভাবমুক্ত জীবন এবং অপমানহীন মর্যাদাপূর্ণ অস্তিত্বের আকুতি জানাই। আল্লাহ আমাদের জীবনকে প্রাচুর্য, সম্মান এবং নূরের আলোয় আলোকিত করুন। আমিন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক