কোরবানি কেবল পশু জবাইয়ের নাম নয়, এটি মূলত মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় বস্তু উৎসর্গ করার এক প্রাচীন ইবাদত। ইসলামি শরিয়তে কোরবানির গুরুত্ব অপরিসীম। তবে এই বিধান কেবল নবি মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতের জন্যই নয়, বরং আদম (আ.) থেকে শুরু করে প্রত্যেক জাতির জন্যই এটি নির্ধারিত ছিল।
পৃথিবীর ইতিহাসের সর্বপ্রথম কোরবানি অনুষ্ঠিত হয় আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের মাধ্যমে। তৎকালীন শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী, একই গর্ভে জন্ম নেওয়া যমজ ভাই-বোনের মধ্যে বিবাহ হারাম ছিল, তবে অন্য গর্ভে জন্ম নেওয়া ভাই-বোনের সঙ্গে বিবাহ বৈধ ছিল। কাবিলের সহোদরা বোন আকলিমা অত্যন্ত সুন্দরী হওয়ায় কাবিল তাকেই বিয়ে করতে চাইল, যা ছিল শরিয়তবিরোধী। এই বিরোধ মেটাতে আদম (আ.) তাদের উভয়কে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোরবানি পেশ করার নির্দেশ দেন। যার কোরবানি কবুল হবে, সেই আকলিমাকে বিয়ে করার সুযোগ পাবে–এটিই ছিল শর্ত।
আরও পড়ুন : কোরবানির ছুরি তোলার আগে যা জানতে হবে
ইব্রাহিম (আ.)-এর যুগের আগে কোরবানি কবুলের পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। তখন আকাশ থেকে একটি অগ্নিশিখা এসে কবুল হওয়া কোরবানিটি পুড়িয়ে ফেলত। হাবিল ছিলেন পশুপালক, তিনি তাঁর পালের সবচেয়ে সুস্থ ও সুন্দর দুম্বাটি আল্লাহর নামে উৎসর্গ করেন। অন্যদিকে কাবিল ছিলেন কৃষক, তিনি অবজ্ঞাভরে কিছু নিম্নমানের শস্যদানা কোরবানির জন্য পেশ করেন। ফলে আকাশ থেকে আগুন এসে হাবিলের দুম্বাটি গ্রহণ করে নেয়, আর কাবিলের কোরবানিটি পড়ে থাকে।
পবিত্র কোরআনের সুরা মায়েদায় এই ঘটনার বর্ণনায় আল্লাহ বলেন, আল্লাহ কেবল মুত্তাকি বা সংযমীদের কোরবানি কবুল করেন। হাবিলের মনে ছিল আল্লাহর প্রতি অগাধ ভালোবাসা ও নিষ্ঠা। তাই তিনি তার শ্রেষ্ঠ সম্পদটি দিয়েছিলেন। পক্ষান্তরে কাবিলের মনে ছিল অহংকার ও অবাধ্যতা। এ ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, কোরবানির পশুর আকার বা মাংসের চেয়ে দাতার মনের ‘তাকওয়া’ বা একনিষ্ঠতাই আল্লাহর কাছে মুখ্য।
আরও পড়ুন : রাসুল (সা.) মদিনায় ১০ বছর কীভাবে কোরবানি করেছেন?
আদম (আ.) থেকে শুরু করে আজ অবধি কোরবানির মূল দর্শন একই রয়ে গেছে–আর তা হলো আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। লোক দেখানো আয়োজন বাদ দিয়ে যদি আমরা হাবিলের মতো শুদ্ধ মনে এবং পবিত্র উপার্জনে কোরবানি করতে পারি, তবেই আমাদের এই ত্যাগ সার্থক হবে।
লেখক : আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক