নতুন বছরে পূর্ণাঙ্গ বিনোদনকেন্দ্রে রূপ নিতে যাচ্ছে পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার। নাজিমুদ্দিন রোডের কারাগারটি দেশের প্রাচীনতম কারাগার। এই ‘কারাগারের ইতিহাস, ঐতিহাসিক ভবন সংরক্ষণ ও পারিপার্শ্বিক উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে সংরক্ষণ ও রূপান্তরের কাজ চলছে। যেখানে আড়াই শ বছরের পুরোনো ইতিহাস সংরক্ষণ করা হবে।
জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, মোগল সুবেদার ইব্রাহিম খান ঢাকার চকবাজারে (নাজিমুদ্দিন রোড) একটি দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। ১৭৮৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে ওই দুর্গের ভেতরে অপরাধী রাখার জন্য একটি ক্রিমিনাল ওয়ার্ড নির্মাণ করা হয়। এই দুর্গকেই একপর্যায়ে কেন্দ্রীয় কারাগারে রূপান্তর করা হয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রাচীন কারাগারটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়লে সরকার এটি স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। তাই দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের রাজেন্দ্রপুরে নতুন আরেকটি কারাগার নির্মাণ করে সরকার। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে নাজিমুদ্দিন রোড থেকে এই কারাগারে বন্দিদের স্থানান্তর করা হয়। পরে ২০১৭ সালের অক্টোবরে পুরোনো কারাগারের ইতিহাস ও ঐতিহাসিক ভবন সংরক্ষণ, ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইন, পারিপার্শ্বিক উন্নয়নের জন্য প্রকল্পটি গ্রহণ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সে সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ ও কারা অধিদপ্তর পুরোনো এই কারাগারের জন্য ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইন ও পারিপার্শ্বিক উন্নয়নের জন্য একটি উন্মুক্ত নকশা প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। এই প্রতিযোগিতায় ৩৪টি প্রতিষ্ঠান নকশা ও মডেল জমা দেয়। স্থাপনাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘ফর্ম থ্রি আর্কিটেক্টসের’ নকশা সেরা হিসেবে নির্বাচিত হয়। প্রতিযোগিতার আয়োজনে ছিল বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স।
২০১৮ সালের নভেম্বরে এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৯ সালের ২৮ জুন প্রকল্প বাস্তবায়নকাজের উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০৭ কোটি ৩৫ লাখ ৮৫ হাজার টাকা।
কারা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, প্রায় ৩৮ একর জায়গা নিয়ে এই পুরোনো কারাগারটি। এর মধ্যে প্রায় ২৫ একর জায়গার ওপর গড়ে উঠছে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে মিল রেখেই সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে কারাগারটিকে।
কারা সূত্র আরও জানায়, পুরোনো এই কারাগারে বাংলাভাষা ও স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস জড়িত রয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে সেলে কারাবন্দি ছিলেন এবং জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে যে কক্ষে হত্যা করা হয়েছিল, সেগুলোকে জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষণ করা হবে। থাকছে ফাঁসির মঞ্চও।
কারাগারের জায়গাটিকে তিনটি জোনে ভাগ করা হয়েছে। এ, বি, সি। এর মধ্যে কারাগারের উত্তর অংশে এ জোনে একটি মাল্টিপারপাস কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হবে। এখানে কনভেনশন হল, সুইমিংপুল, সিনেপ্লেক্স ও চার শতাধিক গাড়ির পার্কিং সুবিধা থাকবে। কারাগারের দক্ষিণ অংশটি বি জোন। এখানে চক কমপ্লেক্স নামের একটি দোতলা ভবন নির্মাণ করা হবে। এতে বইয়ের দোকান ও ফুডকোর্ট থাকবে। পাশে শিশুদের খেলার জায়গা, মসজিদ, পুকুর ও গাড়ির পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও রাখা হবে। এ ছাড়া কারাগারের মাঝের অংশ সি জোনে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর ও জাতীয় চার নেতার স্মৃতি জাদুঘরসহ পুরোনো কারাগার ও এর ইতিহাস সংরক্ষণ করা হবে। পাশেই থাকবে কারা-উদ্যান, লেক, গ্রন্থাগার, হাঁটাচলার পথ। নির্মাণ করা হবে পৃথক দুটি মসজিদ। সব মিলিয়ে মোট আয়তনের প্রায় অর্ধেক জায়গা উন্মুক্ত রাখা হবে।
এই প্রকল্পের দায়িত্বে আছেন কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) মো. শামীম ইকবাল। তিনি জানান, এটি একটি রিসোর্টের মতো হবে। এর কাজ শেষ হলে পুরান ঢাকার মানুষ সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন।
তিনি বলেন, এই রিসোর্টের ভেতরে থাকবে মাল্টিপারপাস ভবন, সিনেপ্লেক্স, সুইমিংপুলসহ বিনোদনের নানা উপকরণ। আশা করা হচ্ছে, পুরান ঢাকার মানুষের জন্য পুরোনো এই কারাগার হবে বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।
এ বিষয়ে কারা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল শেখ সুজাউর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, নতুন এই বিনোদনকেন্দ্রে কেন্দ্রীয় কারাগারের গত ২৩৫ বছরের পুরোনো ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা হবে, যা আগামী প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানতে সাহায্য করবে। এটি দেশের জন্যও একটি বড় অর্জন।