শুধু শীতকালীন পেঁয়াজ চাষের কারণে আগে দেশের মোট চাহিদার বড় একটি অংশ ঘাটতি থাকত। তখন আমদানি করা পেঁয়াজের ওপর নির্ভর করতে হতো। এতে প্রতিবছর সরকারকে আমদানি বাবদ ৫০০ কোটি থেকে হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হতো। এই খরচ কমাতে ২০০৮ সালে কৃষিবিজ্ঞানীরা গ্রীষ্মকালীন ‘বারি পেঁয়াজ-৫’ জাত উদ্ভাবন করেন। কিন্তু চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে দাঁড়ায়, কীভাবে হবে চারা উৎপাদন? শীতকালীন পেঁয়াজের মতো সহজেই এ জাতটি আবাদ করা যেত না।
২০১৯ সালে মসলা গবেষণা কেন্দ্র থেকে এ সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পাইলট প্রকল্প হিসেবে দেশের ৯ জেলায় কোকোপিটে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের আবাদ শুরু হয়। বিজ্ঞানীরা সফল হন। এখন এই পেঁয়াজকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পদ্ধতিতে আবাদ করলে দেশের পেঁয়াজের ঘাটতি পূরণ হবে। রপ্তানি করে আয় করা যাবে বৈদেশিক মুদ্রা। শুধু তা-ই নয়, এই পেঁয়াজ তুলনামূলক বেশি লাল হওয়ায় এতে অ্যান্থোসায়ানিনের পরিমাণ বেশি; যা ক্যানসার প্রতিরোধে ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মসলা গবেষণা কেন্দ্রের তথ্যে বলা হয়েছে, দেশে বছরে ৪০ লাখ টন পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে। ফলন ভালো হলে সর্বোচ্চ ৩৬ লাখ টন পর্যন্ত পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। কোনো কারণে ফলন কম হলে সে বছর গড়ে ১০ লাখ টন পর্যন্ত পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়। খরচ হয় ৫০০ কোটি থেকে ১ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত। ২০১৯ সালে গবেষণা কেন্দ্রটির সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার ড. নুর আলম চৌধুরী তার দুই সহযোগী সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার ড. আব্দুল ওয়াদুদ ও সায়েন্টিফিক অফিসার ড. মোছা. শামছুন্নাহারকে নিয়ে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের চারা উৎপাদনের প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কাজ শুরু করেন। ‘গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের বছরব্যাপী কন্দ উৎপাদন, সংগ্রহোত্তর ক্ষতি হ্রাস ও সংরক্ষণ প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং বিস্তার কর্মসূচি’ প্রকল্পের আওতায় এ কাজ শুরু হয়। ২০২৪ সালে তারা সফল হন। এখন এ জাতের পেঁয়াজ দেশের সব এলাকাতেই চাষ করা সম্ভব। তবে সবচেয়ে বেশি ফলন পাওয়া যাবে বগুড়া, নাটোর, রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহ জেলায়।
এলাকাভেদে এ পেঁয়াজের ফলন হয় বিঘায় ৮০ থেকে ১০০ মণ পর্যন্ত। ভালো ফলন পেতে ‘বারি পেঁয়াজ-৫’ জাতটি মাঠে কমপক্ষে ১০০ দিন রাখতে হয়। তবে ৮০ দিনের মধ্যেই ঘরে তোলা যায়। সে ক্ষেত্রে এলাকাভেদে ফলন কিছুটা কম হয়।
পাইলট প্রকল্পেই বাজিমাত
ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার চৌকিরহাট গ্রামের বাসিন্দা শাহ আলম। বহু বছর ধরে তিনি শীতকালীন পেঁয়াজের চাষ করছেন। ২০১৯ সাল থেকে শীতকালীনের পাশাপাশি গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ আবাদ করছেন।
তিনি বলেন, ‘প্রতি শতাংশ জমিতে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ পাওয়া যায় গড়ে তিন মণ। একই পরিমাণ জমিতে শীতকালীন পেঁয়াজ পাওয়া যায় প্রায় দুই মণ। গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজে লাভ বেশি, কারণ জমি থেকে তুলেই বিক্রি করা যায়। এ ছাড়া অল্প দিনে ফলন হওয়ায় নিড়ানি খরচও কম।’
বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার ঘাগুরদুয়ার গ্রামের কুতুব উদ্দিন আগে শুধুই শীতকালীন পেঁয়াজ চাষ করতেন। তিন বছর আগে বাড়ির পাশের মসলা গবেষণা কেন্দ্র থেকে চারা নিয়ে তিনি প্রথম গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষ করেন।
তিনি বলেন, ‘শীতকালীন পেঁয়াজে বিঘায় গড়ে ফলন পাওয়া যায় ৬০ মণ, কিন্তু গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজে মেলে ১০০ মণ। প্রায় ১০ বছর ধরে চাষ করছি। সবচেয়ে বেশি লাভ হয়েছে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজে।’
মসলা গবেষণা কেন্দ্রের হিসাবে বলা হয়েছে, প্রতিবছর গড়ে ১৫ লাখ বিঘা জমিতে শীতকালীন পেঁয়াজ চাষ হয়, ফলন খুব ভালো হলে পাওয়া যায় ৩৫ লাখ টন পর্যন্ত। কিন্তু সারা দেশে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষ সম্ভব হলে দেশের চাহিদা পূরণ করে রপ্তানি করা যাবে।
মসলা গবেষণা কেন্দ্রের সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার ড. নুর আলম চৌধুরী জানান, সারা দেশে একই পরিমাণ জমিতে পুরোপরি গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষ সম্ভব হলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে কমপক্ষে ১০ লাখ টন রপ্তানি করা যাবে। শীত ও গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষের ব্যয়ের পার্থক্য কেমন- এমন প্রশ্নের উত্তরে এই বিজ্ঞানী বলেন, ‘প্রতি বিঘায় শীতকালীন পেঁয়াজে খরচ হয় ৪০ হাজার টাকা। গ্রীষ্মকালীন বারি পেঁয়াজ-৫ ক্ষেত্রে ৫০ হাজার। কিন্তু খরচ বেশি হলেও উৎপাদন বেশি হওয়ায় কৃষকরা বেশি লাভবান হন।
জনপ্রিয় করতে প্রচারের উদ্যোগ
মসলা গবেষণা কেন্দ্রের তথ্যে বলা হয়েছে, লাভজনক হওয়ার পরও শুধু প্রচারের অভাবে ‘বারি পেঁয়াজ-৫’ এখন স্বল্প পরিসরে দেশের শুধু ৯ জেলায় বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে। এই জাতটি পাহাড়িসহ দেশের সব এলাকায় চাষ করা সম্ভব। তবে এলাকাভেদে এর ফলন ও চাষের খরচে কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে। তবে বাজার স্থিতিশীল থাকলে কোনো চাষিকেই লোকসান গুনতে হবে না।
দেশের সব এলাকায় বারি পেঁয়াজ-৫ চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করতে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে- এমন প্রশ্নে মসলা গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. জুলফিকার হায়দার বলেন, ‘লাভজনক এ মসলার চাষ জনপ্রিয় করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও কৃষি বিভাগের অন্যান্য অধিদপ্তরকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাতটিকে চাষিদের মাঝে জনপ্রিয় করতে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।’