নারীর তুলনায় পুরুষের ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। তবে মৃত্যুর ক্ষেত্রে এই চিত্র উল্টো। ডেঙ্গুতে নারীর মৃত্যু পুরুষের প্রায় দ্বিগুণ। এটা শুধু চলতি বছরের হিসাব নয়, গত বছরও পরিসংখ্যান প্রায় এ রকমই ছিল।
নারীর মৃত্যু বেশি কেন, সে বিষয়ে কোনো গবেষণা হয়নি। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এর পেছনে চার-পাঁচটি কারণ থাকতে পারে। যেমন- একাধিকবার আক্রান্ত হওয়া, দেরিতে ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়া, মাসিক ও গর্ভকালীন আক্রান্ত হওয়া এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা পুরুষের তুলনায় নারীর কম থাকা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে, চলতি বছরের ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৪ হাজার ২২৫ জন। মৃত্যু হয়েছে ২৬৮ জনের। ভর্তি রোগীদের মধ্যে পুরুষ ৩৪ হাজার ৩১৬ জন এবং ১৯ হাজার ৯০৯ জন নারী। ভর্তি হওয়া পুরুষদের মধ্যে ১২৫ জন এবং নারীদের মধ্যে ১৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তদের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২৭৪ জনে একজন পুরুষ এবং ১৩৯ জনে একজন নারীর মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ সেই হিসাবে নারীর মৃত্যু পুরুষের প্রায় দ্বিগুণ।
২০২৩ সালে দেশে সবচেয়ে বেশি মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয় ও মৃত্যু ঘটে। ওই বছর ডেঙ্গু নিয়ে ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। এর মধ্যে নারী ১ লাখ ২৮ হাজার ৫৬৯ জন এবং পুরুষ ১ লাখ ৯২ হাজার ৬১০ জন। এ বছর মৃত্যু হয় ১ হাজার ৭০৫ জনের। এর মধ্যে নারী ৯৭০ জন এবং পুরুষ ৭৩৫ জন। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৩২ জনে একজন নারী এবং ২৬২ জনে একজন পুরুষের মৃত্যু হয়েছে।
আইসিডিডিআরবির জনসংযোগ কর্মকর্তা এ কে এম তারিফুল ইসলাম খান বলেন, ‘এ বিষয়ে আইসিডিডিআরবির কোনো স্টাডি নেই। তবে গত বছর এটা নিয়ে বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা হয়েছে। তখন শুনেছি নারীদের দেরি করে চিকিৎসকের কাছে আসার কারণে তাদের ঝুঁকি বেশি।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু আইসিডিডিআরবি নয়; সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটেরও (আইইডিসিআর) এই বিষয়ে নেই কোনো গবেষণা।
নারীর মৃত্যু বেশি কেন- এটা নিয়ে কোনো গবেষণা নেই বলে জানিয়েছেন ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘তবে কিছু কারণ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়। যেমন- মেয়েরা নিজেদের দিকে একটু খেয়াল কম করেন। তারা স্বামী-সন্তানসহ পরিবারের প্রতি বেশি যত্নশীল। ব্যস্ত থাকেন সংসারের বিভিন্ন কাজে। তাদের শারীরিক কোনো সমস্যা হলে তারা সেগুলোর দিকে খুব একটা গুরুত্ব দেন না। বিছানায় পড়ার মতো অসুস্থ না হলে খুব সহজে তারা চিকিৎসকের কাছে আসেন না।’
পরিবারের অন্যরাও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারীদের বিষয়ে উদাসীন থাকেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তাদের খুব বেশি সমস্যা না হলে একেবারেই বিছানায় পড়ে যাওয়ার মতো অসুস্থ না হলে আমাদের চোখে পড়ে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারীও সামান্য শারীরিক অসুস্থতায় কারও দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টাও করেন না। সে জন্য তাদের সমস্যার বিষয়টা আমাদের নজরে আসে না। ডেঙ্গুর বিষয়ে যেটা হচ্ছে- দেরিতে ডাক্তারের কাছে আসা।’
এ ছাড়া আরও কিছু কারণ থাকতে পারে জানিয়ে এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, ‘নারীদের অনেকেরই রোগ প্রতিরোধক্ষমতা পুরুষের চেয়ে তুলনামূলক কম। সন্তান প্রসবের পরও নারীদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা হ্রাস পায়। রোগ প্রতিরোধমূলক ক্ষমতা কম থাকায় ডেঙ্গু ভাইরাস খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের দুর্বল করে ফেলে।’
আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘নারীদের শনাক্ত থেকে শুরু করে চিকিৎসা পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই দেরি করা হয়। প্রধান কারণ এই দেরিই। নারীদের ক্ষেত্রে সব সময়ই আমরা উদাসীন থাকি। অসুস্থ হলেও আমরা সহসা তাদের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে চাই না। কমে নাকি, কমে নাকি- এই করে আজ-না-কাল করে করে দেরি করে ফেলি। আর নারীরাও অনেক ক্ষেত্রে তাদের রোগের কথা চেপে রাখেন। খুব বেশি অসুস্থ না হলে তারা বলতে চান না, চিকিৎসকের কাছে যেতে চান না। সে কারণে তারা বেশি ঝুঁকিতে পড়েন।’
নারীর জন্য বাড়তি ঝুঁকি রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে গর্ভবতী নারী এবং পিরিয়ডের সময় যদি কেউ ডেঙ্গু আক্রান্ত হন, তার জন্য মৃত্যুর ঝুঁকিটা অনেক বেশি থাকে।’
নারীর মৃত্যুর হার কমাতে বেশ কয়েকটি পরামর্শ দিয়ে ড. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘জ্বর ও শরীর ব্যথা হলে বা দুর্বল বোধ করলে অবশ্যই উসাদীন না থেকে ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে হবে।’
সেবা সহজ না হওয়াও একটা কারণ উল্লেখ করে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘পরীক্ষা সহজ না হওয়ায় সহজেই তারা পরীক্ষা করাতে যান না। এটা যদি প্রত্যেক ওয়ার্ডে বা বাসার ধারেকাছে কোথাও হতো, তাহলেও তারা হয়তো উদাসীন না হয়ে বা অনীহা না করে পরীক্ষা করাতে যেতেন। কিন্তু এখন সেই ব্যবস্থা শহরে নেই, গ্রামেও যে খুব একটা ভালো ব্যবস্থা আছে তাও না। পরীক্ষা করার জন্য দূরে হাসপাতালে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জন্য কষ্টকর। তাই শুরুতেই ডেঙ্গু শনাক্তকরণ পরীক্ষা সহজ করতে হবে।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘যারা মারা যাচ্ছেন, তাদের অনেকেই এর আগে এক বা একাধিকবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ডেঙ্গুতে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থবার আক্রান্ত হলে মৃত্যুঝুঁকি বেশি থাকে। সে জন্য যাতে ডেঙ্গু আক্রান্ত না হন, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। মশা যাতে কামড়াতে না পরে সে জন্য দিনে ও রাতে ঘুমানোর আগে মশারি টাঙিয়ে ঘুমানোর পরামর্শ দেন এই বিশেষজ্ঞ।