কক্সবাজারের পেকুয়ায় সমতলের বন্যা ও জোয়ারের পানি নিয়ে যখন চারদিকে ত্রাণ তৎপরতা ও আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই গহীন পাহাড়ি জনপদে নীরবে ঘটে গেছে এক বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়।
টানা কয়েক দিনের মুষলধারে বর্ষণে পাহাড় ধসে সম্পূর্ণ মাটির নিচে চাপা পড়েছে শত শত কৃষকের শেষ সম্বল পানের বরজ। জীবিকা হারিয়ে মুহূর্তেই নিঃস্ব হওয়া এসব কৃষকের মাথার ওপর এখন ঝুলছে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) লাখ লাখ টাকার ঋণের বোঝা। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে সমতলের দুর্গতদের কাছে ত্রাণবাহী নৌকা পৌঁছালেও, পাহাড়ি বিল ও কাদাপথ মাড়িয়ে প্রান্তিক চাষিদের কান্না শোনার যেন কেউ নেই।
সরেজমিনে পেকুয়া উপজেলার শিলখালী, বারবাকিয়া ও টৈটং ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকা ঘুরে দেখা যায় এক বুকফাটা হাহাকারের দৃশ্য। এসব ইউনিয়নের মধ্যে জারুল বুনিয়ার সাপের গাড়ার ডালার মুখসহ বিভিন্ন দুর্গম অঞ্চলের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষই পান চাষের ওপর নির্ভরশীল।
স্থানীয় জারুল বুনিয়ায় প্রতি মঙ্গলবার ভোরে বসে এক বিশাল পানের বাজার, যেখানে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৩০ লাখ টাকার পান কেনাবেচা হয়। পাহাড়ধসের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন সেই পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিই ধসে পড়েছে।

শিলখালীর জারুল বুনিয়া এলাকার বাসিন্দা বদিউল আলম ২০ বছর সৌদি আরবে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেও তেমন একটা ভাগ্য ফেরাতে পারেননি। প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফিরে বিয়ে করেন, বর্তমানে তার ঘরে দুটি ছোট সন্তান রয়েছে। শেষ সম্বল আর এনজিও থেকে নেওয়া দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়ে জীবনের প্রথম ২০ শতক জমিতে দুটি পানের বরজ করেছিলেন তিনি।
পাহাড়ধসে তার বরজ দুটি এখন মাটির নিচে সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। চোখের পানি মুছতে মুছতে বদিউল আলম বলেন, আল্লাহ কি একবারও আমার দিকে চোখ তুলে তাকাল না? আমি বারবার নিয়তির কাছে কেন হেরে যাই? সবাই বন্যার পানি নিয়ে নিউজ করে, কিন্তু আমাদের এই দুর্গম পাহাড়ে এসে কেউ আমাদের এই দুঃখ-দুর্দশার কথা শোনেও না, লেখেও না। আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মানবিক মানুষ, তিনি বা প্রধানমন্ত্রী যদি আমাদের দিকে একটু তাকাতেন, তবে আমরা প্রাণে বাঁচতাম না হলে আমাদের সব শেষ।
একই নির্মম ভাগ্যের শিকার হয়েছেন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর। এনজিও থেকে লক্ষাধিক টাকা ঋণ নিয়ে বরজ করেছিলেন। মাত্র ১০ হাজার টাকার পান বিক্রি করতেই পাহাড়ধসে তার সব শেষ হয়ে গেছে। কথা বলতে বলতে তার চোখ বেয়ে পানি পড়ছিল। একদিকে উপার্জনের পথ বন্ধ, অন্যদিকে চট্টগ্রাম শহরে থাকা একাদশে পড়ুয়া ছেলের পড়াশোনার খরচ ও প্রতি মাসের মেস ভাড়া। কম্পিউটার অপারেটরের ভুলের কারণে ছেলেটি বোয়ালখালীর কানুনগোপাড়া কলেজে ভর্তি হলেও তাকে চট্টগ্রাম শহরের চকবাজারেই থাকতে হচ্ছে।
জাহাঙ্গীর বলেন, ছেলের লেখাপড়ার জন্য এই বরজ করেছিলাম। কালকেও ছেলে টাকার জন্য ফোন করেছে। এখন সংসার চালাব কীভাবে, ছেলেকে টাকা দেব কীভাবে? দেখি কারও কাছ থেকে দেনা করে হলেও টাকা পাঠাতে পারি কিনা।
এদিকে এই চরম দুর্যোগের মধ্যেও এনজিও কর্মীদের ঋণের কিস্তির জন্য তাগাদা ও মানসিক চাপ কৃষকদের কষ্টকে বহু গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
কুতুব উদ্দিন ৩০ শতক জায়গার ওপর পানের বরজ করেছিলেন। এক লক্ষ টাকা ঋণ নিয়ে গড়া বরজটি মাটির নিচে চাপা পড়েছে। মাত্র ৩০ হাজার টাকার পান বিক্রি করতে পেরেছিলেন তিনি।
মোহাম্মদ জিসান দুটি পানের বরজই মাটিতে চাপা পড়েছে। এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে বরজ করার পর মাত্র ২০ হাজার টাকার পান বিক্রি করতে পেরেছিলেন।
পেকুয়ার এই দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে যাতায়াত ব্যবস্থা এতটাই বেহাল যে, যেখানে প্রধান সড়ক বা গাড়ি চলাচল শেষ হয়, সেখান থেকে আরও ৩ কিলোমিটার পাহাড়ি বিল ও কর্দমাক্ত পথ পায়ে হেঁটে অতিক্রম করতে হয়। পথিমধ্যে জোকের আক্রমণ কিংবা বুনো হাতির পালের মুখোমুখি হওয়ার তীব্র আতঙ্ক মাথায় নিয়ে কেবল সংসারের খরচ চালানোর জন্য এই চাষিরা পান চাষ করেছিলেন। কিন্তু প্রকৃতি এক নিমেষেই তাদের সব স্বপ্ন মাটির নিচে চাপা দিয়ে গেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের আকুল আবেদন, প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেন সমতলের বন্যার পাশাপাশি পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত পেকুয়ার এই প্রান্তিক পান চাষিদের দিকে মানবিক দৃষ্টি দেন। সরকারি জরুরি অনুদান, কৃষি পুনর্বাসন এবং এনজিওগুলোর ঋণের কিস্তি দ্রুত স্থগিত বা মওকুফ করা না হলে, ঋণের দায়ে এই পরিবারগুলোর বেঁচে থাকাই অসম্ভব হয়ে পড়বে।
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত পানচাষিদের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরেজমিনে পরিদর্শন করে তালিকা প্রস্তুত করা হবে। এরপর তালিকাটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের সরকারি সহায়তার আওতায় আনা যায়।
তিনি আরও বলেন, পেকুয়া উপজেলার পাহাড়ি এলাকার অধিকাংশ মানুষের জীবিকা পানচাষের ওপর নির্ভরশীল। তাই তাদের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অন্তরা/