চট্টগ্রামে আট দিন ধরে ভারী বর্ষণ চলছে। নগরীতে ঘটেছে পাহাড়ধস আর প্রাণহানির মতো ঘটনা। নষ্ট হয়েছে নিচু এলাকার বাসিন্দাদের ঘর, আসবাবপত্র, দোকানের মালামাল। কোমরসমান পানিতে ভোগান্তিও সয়েছেন অনেকে। বর্তমানে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলেও সড়ক থেকে পানি নেমে গেছে। তবে বেরিয়ে এসেছে রাস্তার ক্ষত। ছোট-বড় খানাখন্দ সৃষ্টি হওয়ায় বিপাকে পড়ছেন গাড়িচালকরা। সেই সঙ্গে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন যাত্রীরা।
রবিবার (১২ জুলাই) সকালে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, নগরীর হালিশহর এলাকায় পোর্ট কানেকটিং রোড, উত্তর আগ্রাবাদ, ঈদগাঁ রোড, সিডিএ অ্যাভিনিউ, মুরাদপুর, অক্সিজেন, বায়েজিদ বোস্তামী সড়ক, জিইসি, অক্সিজেন-কুয়াইশ সংযোগ সড়ক, আমবাগান সড়ক, মুরাদপুরসহ বিভিন্ন এলাকার সড়ক খানাখন্দে ভরা। ঈদগাঁ এলাকার নজির আহমদ সড়ক ও রঙ্গীপাড়া এলাকায় ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্পের কাজের কারণে খোঁড়াখুঁড়ির পর আর ঢালাই করা হয়নি। এসব সড়কে যাতায়াতকারী চালকরা বলছেন, টানা বৃষ্টির কারণে নগরীর বিভিন্ন সড়কে পানি জমে যাওয়ায় ছোট-বড় খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। ফলে গাড়ি চালানো দায় হয়ে পড়েছে। ছোট-বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নগরীর রঙ্গীপাড়া এলাকার বাসিন্দা আল আমিন বলেন, ‘এই এলাকার সড়কটি দুই বছর আগেও খুব সুন্দর ছিল। ওয়াসার স্যুয়ারেজের কাজের কারণে ভালো পিচ ঢালা সড়কটি মেশিন দিয়ে কেটে ফেলা হয়। এরপর এ অঞ্চলের বাসিন্দাদের জীবনে নেমে আসে ভোগান্তি। দুই বছর ধরে মানুষ কষ্ট পাচ্ছেন। এই এলাকায় গাড়ি আনতে গেলে বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। সম্প্রতি বৃষ্টির কারণে সড়কের অবস্থা আরও বেহাল হয়ে গেছে। আমরা সিটি করপোরেশনের কাছে এই সড়কটি দ্রুত সংস্কার করে দেওয়ার অনুরোধ জানাই।’
অক্সিজেন এলাকার বাসিন্দা ইমরানুল হক বলেন, ‘অক্সিজেন মোড় থেকে শুরু করে আশপাশের সংযুক্ত সড়কগুলোর অবস্থা বেহাল। কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। মুরাদপুর, অক্সিজেন দুই নম্বর গেট সড়কের অবস্থাও ভালো না। অথচ এগুলো নগরীর ব্যস্ত সড়ক। দ্রুত এসব সড়ক মেরামত করা না হলে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’
গত এক সপ্তাহের ভারী বর্ষণের সঙ্গে জোয়ারের পানি একত্রিত হওয়ায় নগরীর বিভিন্ন এলাকায় কোথাও কোমরসমান, আবার কোথাও হাঁটুপানি উঠে যায়। ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে অনেক। তবে কী পরিমাণ সড়কের ক্ষতি হয়েছে তা এখনো নিরূপণ করেনি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। সংস্থাটি জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতি চিহ্নিতকরণ এবং করণীয় ঠিক করতে ৪ সংসদীয় আসনভিত্তিক সমন্বয় কমিটি গঠন করা হবে।
জানতে চাইলে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, নগরীর জলাবদ্ধতা ও সাম্প্রতিক রেকর্ড বৃষ্টিতে ক্ষয়ক্ষতি চিহ্নিতকরণ এবং করণীয় সুপারিশে চারটি সংসদীয় আসনভিত্তিক সমন্বয় কমিটি গঠন করা হবে। প্রতিটি কমিটিতে সংশ্লিষ্ট সব সেবা সংস্থার প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যাতে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে সমস্যাগুলো দ্রুত চিহ্নিত ও সমাধান করা যায়।
তিনি বলেন, চট্টগ্রামের নাগরিক সমস্যাগুলো কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। সমন্বিত উদ্যোগই এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের একমাত্র পথ। প্রতিটি কমিটিতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), চট্টগ্রাম ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট সব সেবা সংস্থার প্রতিনিধিরা থাকবেন। কমিটিগুলো সাম্প্রতিক রেকর্ড বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর পরিমাণ, জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকা, খাল-নালা, ড্রেনেজব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো সংস্কারে করণীয় সরেজমিনে চিহ্নিত করবে। এরপর সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। এতে জনগণের দুর্ভোগ কমবে এবং উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন আরও গতিশীল হবে।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ বিশ্বজিৎ চৌধুরী জানিয়েছেন, গত এক দিনে (রবিবার বেলা ৩টা পর্যন্ত) ১৫১ দশমিক ৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টির প্রবণতা এখনো অব্যাহত রয়েছে। চট্টগ্রামেও ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণের আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা এবং পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকিও রয়েছে।