প্রযুক্তির উৎকর্ষের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে সাইবার অপরাধ। বিশ্বায়নের ফলে প্রযুক্তি আজ হাতের মুঠোয়। এখান থেকেই নতুন কিছু আবিষ্কার করে মানুষ ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে, আবার অন্ধকার জগতেও পা বাড়াচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও ইন্টারনেট ব্যবহার করে অনলাইনে অপরাধের মাত্রা বেড়েই চলছে। প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ইন্টারনেট বিশ্বকে উন্মুক্ত করে ফেলেছে। এটি পুঁজি করে নানাবিধ সাইবার অপরাধও বেড়ে চলেছে। বহুমুখী প্রতারণার খবর উঠে আসছে পত্রিকার পাতায়। সাইবার বুলিং বা হ্যারাসমেন্ট, ডিজিটাল মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁস, কার্ড জালিয়াতি, ফেসবুক আইডি হ্যাক, ফেক অ্যাকাউন্ট তৈরি করে গুজব নিউজ প্রকাশ- এরকম বহু নাম না-জানা হাজারো অপরাধ-কর্মকাণ্ড চলছে।
‘খবরের কাগজ’ পত্রিকায় সিআইডির অ্যাডিশনাল ডিআইজি (সিপিসি) মো. কামরুল আহসান বলেন, ‘বিভিন্ন মাধ্যমে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করছেন। দিনে গড়ে প্রায় ২০০ অভিযোগ আসে। অভিযোগ তদন্ত করে আমরা আইনি ব্যবস্থা নিই।’
সিপিসি সূত্রের তথ্যমতে, সাইবার ক্রাইমে ভুক্তভোগীদের ৬০ শতাংশই নারী, যাদের বয়স ১৬ থেকে ২২ বছর। প্রেমিক বন্ধু, সহপাঠী, প্রতিবেশীসহ নানা ধরনের মানুষ দ্বারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ২০১৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের কার্যক্রম শুরু হয়। গত ৪ বছর ৯ মাস ১৬ দিনে ৩ লাখ ৪৬ হাজার অভিযোগ এসেছে। ভুক্তভোগীরা সাইবার পুলিশ সেন্টারের ই-মেইল, ফেসবুক ও ইমোতে ফোন করে অভিযোগ দিয়েছেন।
অনলাইন ব্যবসায় প্রতারণা ঠেকাতে হচ্ছে কঠোর আইন। খসড়া আইনে বলা হয়েছে- মিথ্যা তথ্য দিয়ে অনলাইনে পণ্য বিক্রি করলে দুই বছরের জেল, অনাদায়ে ১০ লাখ টাকা জরিমানা। সময়মতো পণ্য সরবরাহ না করলে মূল্যের তিন গুণ জরিমানা, অনাদায়ে তিন মাস জেল। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব তপন কান্তি ঘোষ ‘খবরের কাগজ’কে বলেন, ‘ব্যবসায়ী নামধারী অসাধু ব্যক্তিরা অনলাইন বা ডিজিটাল-নির্ভর ব্যবসায়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে প্রতারণা করে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যেন আর না হয়- এজন্য সরকার সতর্ক।’
জান্নাতুল বাকেয়া নামে এক ভুক্তভোগী সাইবার পুলিশ সেন্টারে (সিপিসি) অভিযোগ করেছেন। তার অভিযোগ, তিনি অনলাইনে প্রসাধনীসামগ্রীর ব্যবসা করেন। আফরিন নামে আরেকজন অনলাইন ব্যবসায়ীর কাছে বিদেশি কসমেটিকসের অর্ডার করেছিলেন। পণ্যের মূল্য বাবদ দিয়েছিলেন প্রায় ২ লাখ টাকা। পরে তিনি প্রতারিত হন।
মুন্সীগঞ্জের আবির নামে এক ব্যক্তি সাইবার পুলিশ সেন্টারে অভিযোগ করেছেন যে, একটি এমএলএম কোম্পানি তার কাছে পণ্য বিক্রির নামে ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। গত জানুয়ারিতে ওই কোম্পানিটি মুন্সীগঞ্জের লৌহজং এলাকায় একটি অফিস খোলে। তারা জুনের প্রথম সপ্তাহে অফিসে তালা লাগিয়ে পালিয়ে যায়। বিষয়টি তদন্ত করছেন সাইবার পুলিশ সেন্টারের কর্মকর্তা।
আব্দুল আজিজ নামে একজন ম্যারেজ মিডিয়ার ফাঁদে পড়ে প্রতারিত হন। সেটা তিনি সিপিসিতে অভিযোগ করেছেন। এ রকম অসংখ্য প্রতারিত হওয়ার তথ্য রয়েছে। ই-কমার্স এমএলএম ও অনলাইনে বেচাকেনার অভিযোগটা বেশি থাকে। চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা, শারীরিক সম্পর্কের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেখিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগ অহরহ হচ্ছে। সমাজ থেকে এ ধরনের অপরাধ দূর করতে হলে সচেতনতা ও নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে। সামাজিক অবক্ষয় রোধ করতে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
একটি দেশ, প্রতিষ্ঠান ও জনগণের তথ্যের নিরাপত্তা প্রদানে সাইবার সিকিউরিটি আইন রয়েছে। আমাদের দেশেও বেশ জোরেশোরে এ আওয়াজটি এসেছে। বাংলাদেশে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট (ডিএসএ) পরিবর্তন করে জাতীয় সংসদে ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন’ নামে নতুন যে আইন পাস হয়েছে, সেখানে পুলিশকে বিনা প্ররোচনায় তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ফলে নতুন এ আইনের মাধ্যমেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ রয়েছে বলে কেউ কেউ মনে করেন। অতীতে আইনটি অপব্যবহারের কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে।
বিজ্ঞ সমালোচকরা এ ব্যাপারে এ আইনের কিছু অস্পষ্টতা আছে বলে মনে করেন। প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩ কিছুদিন আগে সংসদে পাস হয়েছে। বাংলাদেশের জনগণের অনলাইন নিরাপত্তা প্রদানে এ আইন কতটুকু ফলপ্রসূ হবে তা দেখতে সামনের দিনগুলোর জন্য অপেক্ষা করতে হবে। সাইবার নিরাপত্তা আইনটির সঠিক প্রয়োগ আমরা আশা করব, অন্যায়ভাবে কেউ যাতে সাজা ভোগ না করেন। এ ব্যাপারে সরকারকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
সালমান