দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত জাহাজভাঙা শিল্প। কয়েক বছর ধরেই এ খাতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। চাহিদা থাকলেও স্ক্র্যাপ সরবরাহ করতে পারছে না শিপইয়ার্ডগুলো। কারণ ডলারসংকটের কারণে বড় পুরোনো জাহাজ আমদানি করতে পারছে না। যা আমদানি হচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। ফলে স্ক্র্যাপের দাম বেড়েছে। সেই সঙ্গে এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল লোহা ও ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কাঁচামালসংকটে ভুগছে। জোগান কম হওয়ায় সীমিত হয়ে এসেছে এর উৎপাদন। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে শুধু জাহাজভাঙার কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল অনেক
সনাতনী কারখানা।
২০২৩-এর জুলাইয়ে আমদানির ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের ঋণপত্র (এলসি) খোলার আগে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে হবে- এমন নির্দেশনা দিয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই কড়াকড়ির পরই সংকটের মুখে পড়ে দেশের জাহাজভাঙা শিল্প। চলমান ডলারসংকটের কারণে দেশের ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি বাজারের এ খাতে এখন অনেকটাই স্থবিরতা বিরাজ করছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন অচলাবস্থা চলতে থাকলে আগামী কয়েক মাসে দেশের জাহাজভাঙা শিল্প সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে। ইতোমধ্যে গত কয়েক বছরে শতাধিক শিপইয়ার্ড তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। বর্তমানে ডলারসংকটের কারণে এলসি না খোলায় সংকট আরও প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে।
ডলারসংকট, বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, জাহাজভাঙা শিল্পের জন্য ছাড়পত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতার কারণে এ শিল্পে স্থবিরতা বিরাজ করছে।
১৯৬০ সালের দিকে বাংলাদেশে জাহাজভাঙা শিল্পের কাজ শুরু হয়। জাহাজভাঙা শিল্পে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের প্রথম স্থানে রয়েছে। এটি দেশের একটি সম্ভাবনাময় খাত। শিল্পকে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে কয়েকটি কারখানাকে গ্রিন কারখানায় রূপান্তর করা হয়েছে। এগুলো পরিবেশবান্ধব কারখানা হিসেবে গড়ে উঠেছে। সংকটের মধ্যেই উদ্যোক্তারা পরিবেশবান্ধব কারখানার দিকে ঝুঁকছেন। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও তুরস্কেও জাহাজভাঙা শিল্প রয়েছে। বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্প থেকে প্রাপ্ত পণ্যগুলো বিদেশে রপ্তানি করা হয় বাই প্রোডাক্ট হিসেবে। বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, হরতাল-ধর্মঘট, ডলারসংকট সব দিক থেকে বিবেচনা করলে এ শিল্পের অবস্থা অনেকটাই শোচনীয়।
বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবু তাহের খবরের কাগজকে বলেন, ‘ডলারসংকটের কারণে এলসি খোলা যাচ্ছে না। আমরা শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দিতেও হিমশিম খাচ্ছি। আশানুরূপ ব্যবসাও হচ্ছে না। সীমিত পরিসরে যা হচ্ছে তাও না চলার মতো। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে দিতে হবে।’
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাহাজের দাম ৩ মিলিয়ন অতিক্রম করলেই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনুমোদন নিতে হবে। অনুমোদনের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। আগে যারা ৩০-৪০ হাজার টনের জাহাজ আমদানি করতেন, এখন তারা ১০-১৫ হাজার টনের বেশি বড় জাহাজ আমদানি করতে পারছেন না। এতে তাদের বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হচ্ছে না। অপরদিকে ব্যাংকগুলো আগের তুলনায় মার্জিন রেটও বাড়িয়ে দিয়েছে। আগে যেখানে ১০ শতাংশ মার্জিন রেট দিতে হতো, এখন কোনো কোনো ব্যাংক ৫০ থেকে শতভাগও মার্কিন রেট দাবি করছে।
জাহাজভাঙা শিল্পের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর, নৌ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ ১০টি প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র নিতে হয়। এগুলো অনেক সময়সাপেক্ষ। এ শিল্পের লাইসেন্স পদ্ধতি সহজ নয়। বিভিন্ন আইনি বাধায় যাতে এ শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে দিকটিতে সরকারকে নজর দিতে হবে। জাহাজভাঙা শিল্পের জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা হলে এ শিল্পের সমস্যা অনেকাংশে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। শিল্পকে রক্ষার জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। সর্বোপরি এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।