সম্প্রতি গোয়েন্দা পুলিশের তদন্তে জানা গেছে, দূরনিয়ন্ত্রিত বা রিমোর্ট কন্ট্রোলের মাধ্যমে নতুন একধরনের ছোট বোমা ব্যবহার করে অগ্নিসংযোগ ঘটানো হচ্ছে। তারা বলছে, এ ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহারের আলামত পাওয়া গেছে।
নির্বাচন বর্জনকারী কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দেশে বড় ধরনের নাশকতা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য চলতি ডিসেম্বর পর্যন্ত জনগণকে নিরুৎসাহিত করবে বিএনপিসহ তাদের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলগুলো। এরপর আগামী ১ জানুয়ারি থেকে পর্যায়ক্রমে গতি বাড়িয়ে আন্দোলন তীব্র করতে চায় তারা। আন্দোলন সমন্বয় করতে জেলায় জেলায় বিএনপি ও জামায়াতের পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে খাগড়াছড়িসহ পাঁচটি জেলায় নির্বাচনি এলাকার জনগণের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় ও বক্তব্যে বলেন, ‘আপনারা আগামী সাধারণ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠানের জন্য এমনভাবে কাজ করবেন যাতে নির্বাচন নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন তুলতে না পারে।’
নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে দুর্বৃত্তদের নাশকতার পরিকল্পনাও বাড়ছে। সম্প্রতি রেললাইনে নাশকতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সঙ্গে বাসে আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারার চেষ্টাও চলছে। ২৮ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত সহিংসতায় তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্র বলছে, সহিংসতায় আটজন নিহত হয়েছেন। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য বলছে, ২৮ অক্টোবর থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ২৮৬টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। অগ্নিসংযোগ করা যানবাহনের মধ্যে রয়েছে বাস ১৭৭টি, ট্রাক ৪৫টি, কাভার্ড ভ্যান ২৩টি, মোটরসাইকেল ৮টি ও অন্যান্য গাড়ি ২৯টি।
বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য বলছে, এসব ঘটনা ছাড়াও গত ২৮ অক্টোবর থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে রেলপথে অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণসহ ৯১টি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটায় দুষ্কৃতকারীরা। ঢাকাসহ সারা দেশে বিএনপি ও তাদের সমমনা দলের অবরোধ-হরতালকে কেন্দ্র করে গাড়িতে আগুন, রেলে নাশকতাসহ সন্ত্রাসী কার্যক্রম বেড়ে চলেছে। রেলপথে নাশকতার আশঙ্কায় সারা দেশে পাঁচটি ট্রেনের চলাচল আংশিক বন্ধ ঘোণা করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
সূত্রমতে, নাশকতার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা ‘টাইম ইনিশিয়েটেড আইইডি’ ব্যবহার করছে। এটি একধরনের ছোট বা মিনি বোমা বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘এটি ব্যবহার করে দুর্বৃত্তরা বাসে আগুন, ককটেল বিস্ফোরণসহ নানা ধরনের অপরাধ করছে। এই আইইডির মধ্যে একটা ঘড়ির টাইম, অকটেন-পেট্রল, ব্যাটারি, ব্লেড, আতশবাজিসহ বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল থাকে। এটিতে দুর্বৃত্তরা একটি টাইম নির্ধারণ করে দেয়। একটি নির্দিষ্ট সময়ের আগে টাইম ইনিশিয়েটেড আইইডি কোনো যানবাহনের সিটে রেখে দিলে সেটি রিমোর্টের মাধ্যমে খুব কম সময়ের মধ্যে বিস্ফোরিত হয় এবং বেশির ভাগ সিট ফোমের হওয়ায় বাস বা যেকোনো যানবাহনে দ্রুত আগুন লেগে যায়।’
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক সমাজবিজ্ঞানী শিরিন সুলতানা খবরের কাগজকে বলেন, ‘হরতাল-অবরোধের মধ্যে যারা নাশকতা করছে, ‘মানুষ পুড়িয়ে মারছে, তাদের ছাড় দেওয়া উচিত নয়। ইতোমধ্যে নাশকতা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছেন। তবে ছোট-বড় কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা যেটা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।’
ভোটের মাঠে প্রচারে বাধা, পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা, কর্মীদের হুমকি-ধমকি দেওয়াসহ ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে মতবিনিময়ে ভোটের আগে নির্বিঘ্নে প্রচার ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিও জানিয়েছেন তারা।
অন্যদিকে আন্দোলনের নামে আগুন-সন্ত্রাসীদের যারা উসকে দিচ্ছে, তাদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান সরকারদলীয় প্রার্থীরা। নাশকতা ঠেকাতে এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা রক্ষায় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে বিভাগীয় কমিশনারদের গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে মাসিক সমন্বয় সভায় এ নির্দেশ দেওয়া হয়। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও জেলা নির্বাচন অফিসসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে চুরি ও নাশকতার ঘটনা ঘটেছে, যা অস্বাভাবিক। নাশকতা ঠেকাতে এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়াতে হবে।