সম্প্রতি চট্টগ্রামের চন্দনাইশের গাছবাড়িয়া কলেজ গেট এলাকায় সিএনজিচালিত একটি অটোরিকশার সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন যানটির চালক। এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ঘটনা। খবরের কাগজের তথ্য থেকে জানা যায়, চলন্ত অবস্থায় হঠাৎ ওই অটোরিকশার গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়। সঙ্গে সঙ্গে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। সেই আগুনে চালক পুড়ে মারা যান। বিস্ফোরণে চালক গাড়ি থেকে বের হওয়ার সুযোগই পাননি। সিলিন্ডার যেন হয়ে উঠেছে চলন্ত বোমা। ফেনীর এক সিএনজি ফিলিংস্টেশনে সম্প্রতি একটি অটোরিকশাকে গ্যাস দিচ্ছিলেন দুজন। হঠাৎ বিকট শব্দে সিলিন্ডারটি বিস্ফোরিত হয়। ফেনীর ঘটে যাওয়া এমন ঘটনা সারা দেশেই ঘটছে। গাড়িতে ব্যবহৃত সিলিন্ডারকে চলন্ত বোমার সঙ্গে তুলনা করা যায়। এমন চলন্ত বোমা নিয়ে সারা দেশ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কার, অটোরিকশাসহ ৫ লাখ ৯৩ হাজার যানবাহন। ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যান বলছে, দেশে ২০২৩ সালে ১২৫টি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এবং বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) তথ্যমতে, বাস, ট্রাক ও থ্রি-হুইলারের পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়িতে যেসব সিলিন্ডার এখন ব্যবহার করা হচ্ছে, এর মধ্যে বেশির ভাগই ২০ বছরের পুরোনো। এ সময়ে এগুলো পরীক্ষা করা হয়নি একবারও।
সিলিন্ডার বিস্ফোরণ মানেই জানমালের ক্ষয়ক্ষতি। যে কারণে সিএনজি ব্যবহারকারীদের সতর্ক থাকা জরুরি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে নকল ও মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডারের সংখ্যা ২ লাখ। এসব সিলিন্ডারের কারণেই দুর্ঘটনা ঘটছে। যানবাহনে গ্যাস দেওয়ার সময় ফিটনেস সনদ দেখার ক্ষমতা আইনে ফিলিংস্টেশনগুলোকে দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানে সিএনজি কনভার্সন বেআইনি বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, বিআরটিএ ও পুলিশের তদারকির অভাব এবং বিস্ফোরক পরিদপ্তরের নানা সীমাবদ্ধতার কারণে যানবাহনে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের মতো ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া রয়েছে ব্যবহারকারীদের অসচেতনতা। এ কারণে গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার এক ধরনের আতঙ্কে রূপ নিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যানবাহনের ব্যবহৃত সিলিন্ডারে গ্যাসের চাপ ৩৫০০ পিএসআই থাকে। অর্থাৎ প্রতি ইঞ্চিতে সাড়ে ৩ হাজার পাউন্ড ওজনের সমান চাপ। এটি যদি বিস্ফোরিত হয় তাহলে তা ভয়াবহ হবে।
আরপিজিসিএলের ব্যবস্থাপক (সিএনজি) প্রকৌশলী মো. মনোয়ারুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, যদি কার্বন স্টিলের সিলিন্ডার হয় সেটি ২০ বছর ব্যবহার করা যায়। এই ২০ বছরের মধ্যে পাঁচ বছর অন্তর হাইড্রো স্ট্র্যাটিক পরীক্ষা করাতে হবে। পরীক্ষার সময় উচ্চমাত্রায় সিলিন্ডারে পানির চাপ দেওয়া হয়। চাপ দিলে সিলিন্ডার প্রসারিত হয়। চাপ সরিয়ে নিলে সিলিন্ডার আগের অবস্থায় চলে আসে। যদি এই প্রসারণ ৫ শতাংশের বেশি হয়, সেই সিলিন্ডার ব্যবহার উপযোগী নয়, নতুন সিলিন্ডার লাগাতে হবে।
গ্যাস সিলিন্ডার ঝুঁকিমুক্ত রাখতে ব্যবহারকারী প্রত্যেকের উচিত নিয়ম মেনে সেটি পরীক্ষা করানো। এতে নিজের জীবনের নিরাপত্তার পাশাপাশি অন্যদেরও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। সিলিন্ডার কীভাবে পরীক্ষা করতে হবে, সে বিষয়েও কর্তৃপক্ষকে ব্যবহারকারীদের মধ্যে লিফলেট বিতরণ, মাইকিং এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। জানমালের ক্ষয়ক্ষতি রোধকল্পে তদারকি ও জনসচেতনতা বাড়ানোর দিকে সরকারকে মনোযোগ দিতে হবে। তাহলে নিত্য ঘটে যাওয়া সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে মানুষকে মুক্ত রাখা সম্ভব হবে।