সুপ্রিয় ২০২৪ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থী বন্ধুরা, শুভেচ্ছা নিও। আজ তোমাদের বাংলা দ্বিতীয় পত্র থেকে আরও ২টি ‘ভাবসম্প্রসারণ’ নিয়ে আলোচনা করা হলো।
শৈবাল দিঘিরে বলে উচ্চ করি শির
লিখে রেখ এক ফোঁটা দিলেম শিশির।
ভাবসম্প্রসারণ: যারা সংকীর্ণ হৃদয়ের অধিকারী তারাই নামমাত্র উপকারের জন্য আত্মগৌরব অনুভব করতে চায় এবং তুচ্ছ উপকারের দৃষ্টান্ত ফলাও করে প্রকাশে প্রয়াসী হয়। নিজের সামান্য অবদানে বাহাদুরি করার চেয়ে পরের নিঃস্বার্থ উপকারে প্রশংসা যে করা উচিত, তা এ শ্রেণির কৃতজ্ঞতাহীন ব্যক্তি সহজেই ভুলে যায়।
শৈবালের জন্ম ও জীবন দিঘির বুকে, দিঘির পানিতেই তার অস্তিত্ব ও স্থিতি। শৈবাল তার অস্তিত্বের জন্য পুরোটাই দিঘির ওপর নির্ভরশীল। এমনই পরাশ্রয়ী, পরাবলম্বী, পরমুখাপেক্ষী শৈবালের ওপর শীতের রাতের কল্যাণে জন্মেছিল কয়েক ফোঁটা শিশির এবং বাতাসের বদৌলতে তা গড়িয়ে পড়েছিল দিঘির অথৈ পানির বুকে। এতেই শৈবালের অহংকারের অন্ত নেই। গর্বের সীমা নেই, শৈবাল তার এক বিন্দু শিশিরের কথা আড়ম্বরে স্মরণ করিয়ে দেয় দিঘিকে। বিরাট দিঘির অগাধ পানিতে এক ফোঁটা শিশিরপাত অতি তুচ্ছ ঘটনা। অথচ দিঘির কাছে শৈবালের ঋণের কোনো হিসাব নেই। শৈবালের একটুও মনে পড়ে না কে তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
তাছাড়া এক ফোঁটা শিশির যে দিঘির কোনো কাজেই লাগে না সে কথা মূর্খ শৈবাল অহমিকার কারণে অনুধাবন করতে পারে না। শৈবালের মতো সংকীর্ণ চরিত্রের মানুষ আমরা আমাদের সমাজে সচরাচর দেখতে পাই; যারা পরাশ্রয়ে লালিত-পালিত হয়ে অন্যের সহযোগিতায় সুদিনের পথ চিনে একসময় সেই পরম আশ্রয়দাতাকেই ভুলে যায়। সামান্য কৃতজ্ঞতাবোধ তার হৃদয়ে উদয় না হয়ে তার মনে জাগে একরাশ দম্ভ। এতে আশ্রয়দাতার গৌরবে কোনো ভাটা পড়ে না, তবে সংকীর্ণ মানসিকতার ব্যক্তিটির চরিত্র সহজেই উন্মোচিত হয়। অন্যদিকে এ পৃথিবীতে যারা মহানুভব, সদাশয় ব্যক্তি, তাদের নীরব দানে পৃথিবীর নিঃস্ব অভাবগ্রস্ত নিত্য উপকৃত হয়, জীবন পায়। সর্বত্যাগী সেই মহামানবরা তাদের জীবন তিলে তিলে দান করেও বিপন্ন করে উদ্ধার এবং মানবতার সেবায় রাখেন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সেই দানে থাকে না কোনো অহংকার, থাকে না আত্মপ্রচারের বড়াই, থাকে না বিনিময়ে উপকার লাভের কোনো প্রত্যাশা।
তারা দান করেন মানবতাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে। তারা হৃদয়ের ভালোবাসা দিয়ে সুন্দর ও কল্যাণের প্রদীপ জ্বালায়, স্বীয় সৌরভে সুরভিত করেন বিশ্বজগৎ। সেই মহান উদারচেতা ব্যক্তিদের নীরব দানের বিনিময়ে সামান্য উপকার করে কোনো কোনো ক্ষুদ্রচেতা উপকৃত ব্যক্তি অহংকারী হয়ে ওঠে। এরা নিজেকে সমাজের কাছে হাস্যকর জীব হিসেবেই প্রতিপন্ন করে। অকৃতজ্ঞ, গলাবাজ, সংকীর্ণমনা এসব ব্যক্তিকে সমাজ ঘৃণার চোখেই দেখে।
রূপকের মধ্য দিয়ে উপর্যুক্ত দুটি লাইনে আমাদের মানবসমাজের বিশেষ দুই শ্রেণির লোকের চরিত্র বিশ্লেষিত হয়েছে। এদের মধ্যে শৈবাল শ্রেণিদের সব সময়ই বর্জন করা উচিত এবং দিঘির মতো বিশাল হৃদয়ের মানুষদের খুঁজে বের করে তাদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সমাজের কল্যাণে অগ্রবর্তী ভূমিকা পালন করা উচিত।
দ্বার রুদ্ধ করে দিয়ে ভ্রমটাকে রুখি
সত্য বলে আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি?
ভাবসম্প্রসারণ: মানবমনের দ্বার সব সময়ই অবারিত রাখা প্রয়োজন। খোলা মন দিয়ে বিচার বিবেচনা করেই যথার্থকে উপলব্ধি করা প্রয়োজন। অন্যথা ঘটলে মানব মন স্থবির হয়ে পড়বে এবং জগৎ সংসার থেকে বিচ্ছন্ন হয়ে পড়বে।
আমাদের যা কিছু আকাঙ্ক্ষিত প্রকৃতি থেকে আমরা সেটি নিষ্কণ্টক উপায়ে আহরণ করতে পারি না। সুখের সঙ্গে দুঃখের একটা যোগসূত্র থাকে। দুঃখকে অতিক্রম করেই সেই সুখের অনুভূতিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়। সত্যের আকরিক মিথ্যার নানা উপাদানের সঙ্গে মিশ্রিত থাকে। সুতরাং মিথ্যাকে পাশ কাটিয়ে সত্যকে লাভ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কোনো ভুল বা ভ্রান্ত ধারণা যেন মনে প্রবেশ করতে না পারে এ উদ্দেশ্যে যদি আমরা মনের দুয়ার বন্ধ করে রাখি তবে বাস্তবজ্ঞান মনের ভেতরে প্রবেশ করার রাস্তা খুঁজে পাবে না। তখন সে মানুষের পক্ষে সত্য উপলব্ধি করা বা সত্য জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব হবে না।
এ ক্ষেত্রে সঠিক পন্থা হলো জ্ঞান আহরণের জন্য মনের দুয়ার খোলা রাখা, সত্য বা মিথ্যা উভয় প্রকারের জ্ঞানই অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে দেওয়া এবং বিবেচনার মাধ্যমে মিথ্যাকে বর্জন করে সত্যকে হৃদয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে ধারণ করা। এক্ষেত্রে প্রয়োজন সঠিকভাবে বিবেচনাবোধ জাগ্রত করা। এ সংসারের দুর্গম পথে চলতে গেলেই আমরা পদে পদে ভুল-ভ্রান্তি করতে পারি। অভিজ্ঞতার আলোকে এসব ভুল আমরা অপনোদন করতে পারি। অবশেষে একসময় আমরা নির্ভুলভাবে পথ চলতে পারব। কিন্তু ভুলের ভয়ে যদি আমরা পথ চলাই বন্ধ করে দিই তবে সঠিক পথের সন্ধান আমরা কখনো পাব না।
তেমনি দুর্ঘটনার ভয়ে আমরা যদি যাত্রাই না করি তবে গন্তব্যে পৌঁছানো কখনো সম্ভব হবে না। মহামূল্যবান খনিজ দ্রব্য সংগ্রহ করতে গেলে এটিকে যেমন আমরা বিভিন্ন অপদ্রব্যের সঙ্গে মিশ্রিত পাই সত্যও তেমনি মিথ্যা দিয়ে আবৃত থাকে। মহামূল্যবান খনিজ দ্রব্যকে বিভিন্ন পর্যায়ে যাচাই-বাছাই করে কারখানায় পরিশুদ্ধ করে তবেই ব্যবহার উপযোগী করা হয়। সত্যকেও তেমনি বিভিন্ন মিশ্রিত তথ্য থেকে সংগ্রহ করতে হবে এবং তাকে চিনে নিয়ে জীবনের জন্য কাজে লাগাতে হবে। মনের দ্বার রুদ্ধ করে দিলে বহু আকাঙ্ক্ষিত সেই সত্যের স্বাদ আমরা কখনো পাব না।
ভ্রম আমাদের সব সময়ের সঙ্গী। এটিকে বাদ দিয়ে পথ চলা সম্ভব নয়। ভুল হবে বলে পথ চলা বন্ধ না করে হৃদয়মনকে অবারিত রেখে সত্যের সন্ধানে অগ্রসর হওয়া উচিত।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ,রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, ঢাকা।
কলি