ঢাকা ২৯ আষাঢ় ১৪৩৩, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
সেমিফাইনালের আগে ফ্রান্সকে নিয়ে মন্তব্য, তোপের মুখে স্পেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিশ্বকাপে নতুন ইতিহাসের সামনে মেসি বিশ্বকাপে বিরল কীর্তি গড়ল সেমিফাইনালের ৪ দল আর্জেন্টিনা নাকি ইংল্যান্ড, ফাইনালে কে উঠবে? জানাল সুপারকম্পিউটার ইংল্যান্ডকে ‘অপূর্ণ কাজ’ শেষ করার আহ্বান হ্যারি কেইনের ২০৩০ বিশ্বকাপে ৬৪ দলের পরিকল্পনা ফিফার স্পেনকে ভয় পায় না ফ্রান্স: ইব্রাহিমা কোনাতে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো মরদেহ ভাসানোর খবর গুজব: ইউএনও ইউএস-বাংলার বহরে যুক্ত হচ্ছে ২১ নতুন বোয়িং, বিনিয়োগ ১৪ হাজার কোটি টাকা সোনারগাঁয়ে বাবা ছেলেকে কুপিয়ে জখম হরমুজ প্রণালী বন্ধ ঘোষণা ইরানের রাজধানীতে দুর্ঘটনার শিকার জবি শিক্ষকদের বাস, আহত  ৩ নৌবাহিনীর বৃক্ষরোপণ অভিযান উদ্বোধন বরিশাল সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী বাস্তুচ্যুতদের পুনর্বাসনে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগের কথা জানালেন প্রতিমন্ত্রী আগৈলঝাড়া থানায় হামলার প্রধান আসামিসহ গ্রেপ্তার ৬ বৃষ্টি আর উজানের ঢলে বাড়ছে কাপ্তাই হ্রদের পানি, নিম্নাঞ্চল প্লাবিত চট্টগ্রামে প্রকাশ্যে ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে আহত বিশ্বমঞ্চে ইল্লিয়ীন, ডি-৮ হালাল এক্সপোতে উজ্জ্বল বাংলাদেশের ফ্যাশন ঝিনাইদহে ফি দিতে দেরি, পরীক্ষার হল থেকে বের করে দেওয়া হলো শিক্ষার্থীকে ত্রাণ ও সহায়তা নিয়ে বন্যাদুর্গতদের পাশে যুবদল আনোয়ারায় ত্রাণ বিতরণে নাহিদ, বেড়িবাঁধ নির্মাণে লুটপাটের অভিযোগ জমিরউদ্দিন সরকারকে শেষ শ্রদ্ধা জানালেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে বন্যা পরিস্থিতি: ক্ষতিগ্রস্ত ১০ লাখের বেশি মানুষ, নিহত ৫১ নাটোরে সরকারি হাসপাতালে নবজাতকের মৃত্যু, চিকিৎসককে মারধর চট্টগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি, পানিবন্দি দেড় লাখ যে আমল ৩৬০ জোড়ার সদকা টেলিটক বিক্রি নয়, বরং আপগ্রেড করা হচ্ছে: আইসিটি মন্ত্রী রাজস্ব ফাঁকি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কোনো ছাড় নয়: অর্থমন্ত্রী ওসমানী বিমানবন্দর থেকে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী নারী গ্রেপ্তার

সাক্ষাৎকারে রিহ্যাব সভাপতি আবাসন খাতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে

প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৫, ০৮:৪৮ এএম
আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০২৫, ০৮:৫১ এএম
আবাসন খাতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে
রিহ্যাবের সভাপতি মো. ওয়াহিদুজ্জামানের সাক্ষাৎকার

বর্তমানে বাংলাদেশের আবাসন খাত চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নতুন প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়া জটিল হয়েছে, নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে, ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে- এসব কারণে বিনিয়োগকারীরা ফ্ল্যাট ও প্লট বিক্রি করতে করতে পারছেন না। এ ছাড়া ড্যাপ সংশোধনের কারণে ভবনের আয়তন সীমিত হওয়ায় জমির মালিকরা তাদের জমি ডেভেলপারকে দিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। ফলে, আবাসন খাতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে এবং অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। খবরের কাগজের ভারপ্রাপ্ত বিজনেস এডিটর ফারজানা লাবনীর কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রিহ্যাবের সভাপতি মো. ওয়াহিদুজ্জামান এসব কথা বলেন।

খবরের কাগজ: দেশের আবাসন খাতে গতি আনতে আপনার পরামর্শ কী?
মো. ওয়াহিদুজ্জামান: বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের আবাসন খাতের ধীরগতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ড্যাপের কঠোর নিয়ম, অনুমোদনের দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং নির্মাণ খরচ বৃদ্ধি প্রবাসী ও ঢাকাবাসীর বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে। গতি আনতে প্রথমেই দরকার ড্যাপ দ্রুত সংশোধন করা। নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও দ্রুত করা, যাতে ডেভেলপাররা ঝুঁকি ছাড়াই প্রকল্প শুরু করতে পারেন। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানো জরুরি, তাদের জন্য স্বচ্ছ তথ্য, অনুমোদনের নিশ্চয়তা এবং সহজ ঋণ সুবিধা সরবরাহ করা উচিত। কর ও খরচে প্রণোদনা প্রদান করলে মধ্যবিত্ত ক্রেতা এবং প্রবাসীদের বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব। নতুন আবাসন এলাকায় রাস্তা, বিদ্যুৎ, পানি ও পাবলিক সুবিধা দ্রুত নিশ্চিত করা হলে ক্রেতাদের আস্থা আরও বৃদ্ধি পাবে। এ ছাড়া ছোট ও সাশ্রয়ী ফ্ল্যাট, উদ্ভাবনী পরিকল্পনা এবং হোম ফেয়ার ও ডিজিটাল প্রচারের মাধ্যমে বিক্রয় বাড়ানো সম্ভব। এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করলে আবাসন খাতে নতুন গতি আসবে এবং দেশের অর্থনীতিও ত্বরান্বিত হবে।

খবরের কাগজ: ফ্ল্যাটের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাইরে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ ফ্ল্যাট কিনতে পারছে না। এ অভিযোগ কতটা সত্য?
মো. ওয়াহিদুজ্জামান: ফ্ল্যাটের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার কিছুটা বাইরে অবশ্যই চলে গেছে। বাংলাদেশের বিশেষ করে ঢাকার আবাসন খাতে নতুন ফ্ল্যাটের দাম সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। অধিকাংশ নতুন অ্যাপার্টমেন্টের দাম ১ কোটি টাকার ওপরে, যা গড় মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এককালীন ক্রয়ে বহনযোগ্য নয়।

মধ্যবিত্তের মাসিক আয় ও ব্যাংক ঋণের সক্ষমতা বিবেচনা করলে ফ্ল্যাটের দাম প্রায়ই তাদের নাগালের বাইরে। বিশেষ করে ড্যাপ ও নির্মাণ খরচ বৃদ্ধির কারণে ফ্ল্যাটের দাম আরও বেড়েছে। ফলে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ প্রায়ই ফ্ল্যাট কেনার যোগ্যতার বাইরে থাকে। তবে যেসব মধ্যবিত্ত ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো রিহ্যাব সদস্যদের ভূমিকা। রিহ্যাবের কার্যক্রম এবং ডেভেলপারদের সমন্বয় অনেক নতুন প্রকল্পে মধ্যবিত্ত পরিবারের ফ্ল্যাট মালিক হয়েছে রিহ্যাবের কারণেই। আগে অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার উচ্চমূল্যের আবাসন ক্রয় করতে পারত না, কিন্তু রিহ্যাব সদস্যদের নিয়মিত অফার, ইমার্জেন্সি ফাইন্যান্স এবং সহজ কিস্তি সুবিধার কারণে তারা এখন নিজস্ব ফ্ল্যাটের মালিক হতে পারছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ফ্ল্যাটের দাম বাড়ায় মধ্যবিত্তদের জন্য ফ্ল্যাট কেনা অনেকটাই কঠিন হয়ে উঠেছে। 

খবরের কাগজ: মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে ফ্ল্যাটের দাম আনতে হলে আপনার পরামর্শ কী?
মো. ওয়াহিদুজ্জামান: বাংলাদেশে আবাসন খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের একটি হলো মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের নাগালের বাইরে ফ্ল্যাটের দাম। এই সমস্যা সমাধান করতে হলে প্রথমেই সরকারকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সরকারকে নীতিগত সহায়তা দিতে হবে। সরকার জমি দিলে আমরা মধ্যবিত্তের জন্য সহজে আবাসনের ব্যবস্থা করে দিতে পারব। এ ছাড়া ১-২ বেডরুমের ছোট অ্যাপার্টমেন্ট করা যেতে পারে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কিস্তি ও সহজ ঋণ সুবিধা প্রদান করলে বড় এককালীন অর্থ প্রদান না করতে পারলেও ক্রেতারা ফ্ল্যাট কিনতে পারবে। সরকারের পক্ষ থেকে মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের জন্য ভ্যাট, স্ট্যাম্প ডিউটি ও করছাড়ের মতো প্রণোদনা দিলে চূড়ান্ত বিক্রয়মূল্য আরও কমানো সম্ভব। 

খবরের কাগজ: বর্তমানে রিহ্যাবের সদস্য সংখ্যা কত? রিহ্যাব থেকে ফ্ল্যাটের দাম নিয়ন্ত্রণে কি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?
মো. ওয়াহিদুজ্জামান: বর্তমানে রিহ্যাবের সদস্য সংখ্যা ৮৯৪ জন। ফ্ল্যাটের দাম নিয়ন্ত্রণে রিহ্যাব সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি এবং নিতেও পারে না। তবে, রিহ্যাব সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য গুণগত মান ও নৈতিক ব্যবসায়িক আচরণ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকে। উদাহরণস্বরূপ রিহ্যাবের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজউক অনুমোদিত ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী কাজ করতে উৎসাহিত করা হয়। এ ছাড়া রিহ্যাব প্রতিবছর আবাসন মেলা আয়োজন করে, যেখানে বিভিন্ন ডেভেলপাররা তাদের প্রকল্প প্রদর্শন করেন। এই মেলাগুলোতে সরাসরি ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ থাকে, যা দাম ও অফার সম্পর্কে স্বচ্ছতা আনে। তবে, ফ্ল্যাটের দাম নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারি নীতিমালা গুরুত্বপূর্ণ। 

খবরের কাগজ: ফ্ল্যাটের মালিকরা ক্রেতাকে হোম লোনের ব্যবস্থা করে দিয়ে থাকেন? এ ক্ষেত্রে কী ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়?
মো. ওয়াহিদুজ্জামান: বাংলাদেশের আবাসন খাতে অনেক ডেভেলপার ক্রেতাদের সুবিধার্থে হোম লোনের ব্যবস্থা করে দিতে সাহায্য করেন। সাধারণভাবে তারা নির্দিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেন, যাতে ক্রেতারা বড় এককালীন অর্থ প্রদান না করেও ফ্ল্যাট ক্রয় করতে পারেন। এটি মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের জন্য একটি বড় সহায়তা, কারণ তাদের মাসিক আয় ও সঞ্চয় সীমিত। তবে এই সুবিধার সঙ্গে কিছু সমস্যা ও ঝুঁকিও যুক্ত থাকে। ডেভেলপারদের দিক থেকেও ঝুঁকি থাকে। তারা প্রায়ই ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করে লোনের জন্য গ্যারান্টি দেন এবং যদি ক্রেতা কিস্তি পূরণ করতে ব্যর্থ হন, ডেভেলপারকে দায়ভার নিতে হতে পারে। সুতরাং, হোম লোন সুবিধা অবশ্যই সহায়ক, কিন্তু ক্রেতাকে প্রক্রিয়া, সুদের হার, ফি এবং ব্যাংকের শর্তাবলি সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন হতে হবে।

দুই বছরে ৩৬০টি পোশাক কারখানা বন্ধ

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬, ১০:০১ এএম
আপডেট: ১২ জুলাই ২০২৬, ১০:২৩ এএম
দুই বছরে ৩৬০টি পোশাক কারখানা বন্ধ
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফিক

দেশের অন্যতম রপ্তানিমুখী খাত তৈরি পোশাকশিল্প দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইউরোপের বাজারে আমাদের রপ্তানি কমে এসেছে। অথচ সেখানে চীনের পাশাপাশি ভিয়েতনামও ভাল ব্যবসা করছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানি ও তেলের মূল্য নিয়ে অস্থিতিশীলতার কারণে গত অর্থবছরে আমাদের তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানিতে সুবাতাস ছিল না।

তৈরি পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান রাজধানীতে নিজের দপ্তরে খবরের কাগজের রিপোর্টার সাগুফতা আফরোজের কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তৈরি পোশাক খাতের সাম্প্রতিক সংকটের বর্ণনা দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন।

খবরের কাগজ: পোশাক খাতের অন্যতম চ্যালেঞ্জগুলো কী কী? 

মাহমুদ হাসান খান: অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে তীব্র গ্যাসসংকট, যার ফলে অধিকাংশ কারখানা সক্ষমতার তুলনায় কম ক্ষমতায় চলছে। নতুন গ্যাসসংযোগ পাওয়া যাচ্ছে না, ফলে বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টার পরও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না।

ব্যাংকের সুদহার ১৪-১৫ শতাংশে বহাল রয়েছে। সম্প্রতি বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে, প্রতিবছর ৯ শতাংশ হারে শ্রমিকদের ইনক্রিমেন্ট দিতে হচ্ছে, রপ্তানি প্রণোদনা ৬০ শতাংশ কমেছে। এসব কারণে ব্যবসা ধরে রাখতে না পেরে ২০২৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৬০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।

আরও অনেক কারখানা অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সামনে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের চ্যালেঞ্জ। গ্র্যাজুয়েশনের ৩ বছর পর ইইউতে ১২ শতাংশ শুল্ক প্রদান করতে হবে। যেখানে ভারত ও ভিয়েতনামের সঙ্গে ইইউর এফটিএ চুক্তির কারণে তারা শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে।

ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এফটিএ করতে না পারলে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাবে। বিষয়টি এই শিল্পসংলগ্ন সবার মধ্যেই একটি অস্বস্তি তৈরি করেছে। ডাবল ট্রান্সফরমেশন প্রস্তুতিতেও যথেষ্ট অভাব রয়েছে, বিশেষ করে ওভেন ও সিনথেটিক পণ্যের ক্ষেত্রে এই নিয়ম মেনে চলতে পারলে আমাদের অর্ধেক পোশাক রপ্তানি করা যাবে না।

খবরের কাগজ: অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর অন্যতম কারণ কী বলে মনে করছেন? 

মাহমুদ হাসান খান: সুদহার ১৪-১৫ শতাংশে পৌঁছেছে, গ্যাস ও বিদ্যুৎসংকট চরমে উঠেছে। এসবের সঙ্গে কারখানাগুলোকে লড়াই করতে হচ্ছে। জ্বালানিসংকট, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার এবং লজিস্টিকস সক্ষমতার অভাবে ২০২৩ সাল থেকে প্রায় ৩৬০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আরও অনেক কারখানায় উৎপাদন কমেছে। 

খবরের কাগজ: মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা থামছে না। যুদ্ধ একবার থামছে তো আবার শুরু হচ্ছে। যুদ্ধের কারণে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এ সংকট কীভাবে মোকাবিলার কথা ভাবছেন?

মাহমুদ হাসান খান: মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। সরকার ইতোমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যা তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের বড় বিপদ থেকে রক্ষা করবে। তবে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খাত ও মূল্যস্ফীতিতে পড়লে তা বিশ্ব পোশাকশিল্পের বাজারকে প্রভাবিত করবে।

এসবের সরাসরি প্রভাব পড়বে আমাদের শিল্পেও। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের ফলে শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর সব অর্থনীতিতে এর প্রভাব অনুভব করছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বড় আকার ধারণ করলে তা আমাদের জ্বালানি আমদানি ও ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

খবরের কাগজ: চলমান সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার কী গ্রহণ করছে? 

মাহমুদ হাসান খান: সরকার ৩ মাসের তেলের মজুত নিশ্চিত করতে নতুন করে আরও ৫ লাখ টন তেল আমদানি করছে। সেই সঙ্গে রিফাইনারি সক্ষমতা বৃদ্ধি, দেশের সব অফশোর ব্লক উন্মুক্ত করে সহজ শর্তে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান, চতুর্থ এফএসআরইউ (৬০০ এমএমসিএফডি) স্থাপনের উদ্যোগ, এগুলো অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ যা দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা কাটিয়ে উঠতে সহায়ক হবে বলে আমরা মনে করি।

খবরের কাগজ: সরকার কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্রে অনেক বন্ধ কল-কারখানা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, পোশাকশিল্পের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে কেমন সহযোগিতা পাচ্ছেন?

মাহমুদ হাসান খান: বন্ধ কারখানা চালু ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ২০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ অত্যন্ত সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। এসব বন্ধ কারখানায় যে অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে তা আমাদের দেশীয় অর্থনীতির একটি অংশ; এগুলোকে অলস অবস্থা থেকে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে পারলে অর্থনীতি উপকৃত হবে। আমরা এই বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সরকারের সঙ্গে কাজ করছি। আমাদের সদস্যদের সঙ্গেও কয়েক দফা মতবিনিময় করেছি এবং আমাদের পরামর্শগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গেও শেয়ার করেছি।

আশাবাদী এই উদ্যোগ থেকে শিল্প ও অর্থনীতি প্রত্যাশিত রিটার্ন পাবে। এর বাইরে সরকারের গৃহীত বেশ কিছু নীতি শিল্পের জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করি, যেমন–৫ হাজার কোটি টাকার প্রি-শিপমেন্ট লোন, চলতি অর্থবছরে সব ধরনের ইনসেনটিভ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, ইনসেনটিভের ওপর আরোপিত আয়কর অর্ধেক করা হয়েছে, সোর্স ট্যাক্সকে অ্যাডভান্স ট্যাক্স হিসেবে গণ্য করে সেভাবে কর ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়েছে।

ব্যবসা সহজীকরণের লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে একগুচ্ছ পদক্ষেপের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া করপোরেট কর হার ৫ বছরের জন্য ঘোষণা, ব্যবসা নিবন্ধন ৪৮ ঘণ্টায় এবং প্রত্যাবাসন ৩০ দিনের মধ্যে করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সবুজ রূপান্তর তহবিল থেকে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে এবং কারখানায় সোলার রুফটপ স্থাপনে ব্যাংক গ্যারান্টি ছাড়া ৮ বছরের কম সুদে ঋণ প্রাপ্তির বিষয়ে বিজিএমইএ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছে। আশা করি, এসব পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন হলে উদ্যোক্তারা এই কঠিন সময়ে স্বস্তি পাবেন এবং দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারী বাড়বে।

খবরের কাগজ: সংকট উত্তরণের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

মাহমুদ হাসান খান: সংকট উত্তরণের জন্য চারটি স্তরে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। জ্বালানির ক্ষেত্রে রূপপুর থেকে আগস্টে ৩০০ মেগাওয়াট, ডিসেম্বরে ১ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০২৭ সালের জুনে পূর্ণ ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট পাওয়া যাবে। দ্বিতীয় ইউনিট থেকে আরও ১ হাজার মেগাওয়াট যুক্ত হবে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরে।

চতুর্থ এফএসআরইউ ২০২৮ সালে চালু হলে এবং অফশোর অনুসন্ধান শুরু হলে আমাদের জ্বালানিসংকট বহুলাংশে কেটে যাবে। অর্থায়নের ক্ষেত্রে সুদহার কমানো, এনপিএল কমানোর আইনি উদ্যোগ, এনপিএল মোকাবিলায় একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়েছে। এগুলো সফল হলে কস্ট অফ ফান্ড অনেকটাই কমে আসবে।

লজিস্টিকস: ঢাকা-চট্টগ্রাম ৬ লেনের এক্সপ্রেসওয়ে ২০৩২ সালের মধ্যে নির্মাণ, বে-টার্মিনাল ২০৩০ সালে, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ২০২৯ সালে চালু হবে এবং হযরত শাহজালাল তৃতীয় টার্মিনাল চলতি বছর ডিসেম্বরে উদ্বোধন হবে। 

বাজার সুবিধা: ইইউর সঙ্গে এফটিএ চুক্তির জন্য আলোচনা চলছে, জাপানের সঙ্গে ইপিএ স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং কোরিয়ার সঙ্গেও আলোচনা চলছে। এসব উদ্যোগ ও পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন হলে আমাদের অর্থনীতিতে দ্রুত তার সুফল পাব। 

খবরের কাগজ: দেশে পোশাক রপ্তানি আগের তুলনায় কমেছে? আরও কমার আশঙ্কা করছেন কী? এ ধারা থেকে বের হয়ে আসার জন্য ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? 

মাহমুদ হাসান খান: বর্তমান রপ্তানি হ্রাস উদ্বেগজনক হলেও আমি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদী। আমাদের শিল্পের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে হবে। অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুযোগ গ্রহণে শিল্পকে প্রস্তুত করতে হবে। বিশ্ব বাজারে আমাদের শেয়ার ৬.৯% থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ১৫%-এ নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

ভারত ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগীদের সঙ্গে টিকে থাকতে হলে ডাবল ট্রান্সফরমেশন নিশ্চিত করতে টেক্সটাইল খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। প্রশিক্ষণের মান ও পরিধি বাড়াতে হবে। ইইউসহ সম্ভাব্য বাজারগুলোর সঙ্গে এফটিএ নিশ্চিত করতে হবে।

সুশাসন চর্চা থেকে অবিচল আস্থা: ব্র্যাক ব্যাংক

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৯ এএম
আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৩ এএম
সুশাসন চর্চা থেকে অবিচল আস্থা: ব্র্যাক ব্যাংক
তারেক রেফাত উল্লাহ খান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি

খবরের কাগজ: ব্র্যাক ব্যাংক গত ২৫ বছরের যাত্রায় কী কী অর্জন করেছে?

তারেক রেফাত উল্লাহ খান: স্যার ফজলে হাসান আবেদ ব্র্যাক ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দেশের ‘মিসিং মিডল’ বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) খাতের অর্থায়ন সমস্যা দূর করার লক্ষ্যে। গত ২৫ বছরের যাত্রায় আমরা ২০ লাখের বেশি এসএমই উদ্যোক্তাকে অর্থায়ন করেছি। এই অর্থায়ন দেশে এক কোটির বেশি কর্মসংস্থান তৈরিতে সরাসরি ভূমিকা রেখেছে। এটিই প্রমাণ করে যে, আমরা জনগণকে শুধু সাধারণ ব্যাংকিং সেবাই দিইনি, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নেও বড় অবদান রাখতে পেরেছি।

দীর্ঘ সময় আমরা দেশের ২ হাজার ৩০০-এর বেশি লোকেশনে আমাদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়েছি। যার ফলে আমাদের গ্রাহকরা এখন দ্রুততম সময়ে যেকোনো সেবা পাচ্ছেন। গ্রাহকসেবাকে আরও আধুনিক করতে আমাদের ‘আস্থা’ অ্যাপের মাধ্যমে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা চালু করা হয়েছে। যেখানে এখন প্রতি মাসে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। গ্রাহকদের এই অবিচল আস্থা ও বিশ্বাসে ব্র্যাক ব্যাংকের রিটেইল পোর্টফোলিও আজ ৫২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এ ছাড়া আমাদের সাবসিডিয়ারি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস প্রতিষ্ঠান ‘বিকাশ’ দেশের ৮ কোটি মানুষকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ আমরা দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবার আওতায় নিয়ে আসতে পেরেছি।

করপোরেট ব্যাংকিংয়েও আমরা দেশের অন্যতম শীর্ষ ব্যাংকে পরিণত হয়েছি। বর্তমানে আমাদের করপোরেট গ্রাহকদের জন্য ইন্টারনেট ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম ‘কর্পনেট’-এ প্রতি মাসে গড়ে ২৩ হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হচ্ছে।

২৫ বছরের ব্যবধানে ব্র্যাক ব্যাংকের মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন ১ বিলিয়ন ডলারের ল্যান্ডমার্ক পার করে পরিণত হয়েছে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বৃহৎ ব্যাংকে। একই সঙ্গে আমাদের শক্তিশালী মূলধন ভিত্তি এবং ফরেক্স পোর্টফোলিও থাকায় আমরা বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থায়নও করতে পারছি। এরই মধ্যে একটি ‘আফ্রাম্যাক্স অয়েল ট্যাঙ্কার’ কেনার জন্য আমরা এককভাবে প্রায় ৯৬ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন করেছি, যা এখন পর্যন্ত দেশের জাহাজশিল্পে একক কোনো ব্যাংকের সবচেয়ে বড় অর্থায়ন।

সব মিলিয়ে, ব্র্যাক ব্যাংক দেশের সবচেয়ে নিরাপদ ও সুশাসিত ব্যাংক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি গ্রাহকদের সর্বোচ্চ আস্থা অর্জন করতে সমর্থ হয়েছে। আমরা দেশের প্রতিটি মানুষের জীবনে প্রাসঙ্গিক ও সহজলভ্য সেবাসহ আর্থিক স্বাধীনতা নিয়ে আসতে কাজ করে যেতে চাই। এক কথায় আগামী দিনগুলোতে আমাদের লক্ষ্য বাংলাদেশের মোস্ট ইমপ্যাক্টফুল ব্যাংক হয়ে ওঠা। পাশাপাশি আমরা ব্যাংকের কাজ করার ধরন, মনোভাব ও অনুশীলনকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে চাই, যাতে ভবিষ্যতে দেশীয় মালিকানাধীন প্রথম ‘মাল্টিন্যাশনাল ব্যাংক’ হয়ে উঠতে পারি।

খবরের কাগজ: বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে নিরাপদ ব্যাংক হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ বলে আপনার মনে হয়েছে? 

তারেক রেফাত উল্লাহ খান: নিরাপদ ব্যাংক নিয়ে বলতে গেলে আমাদের প্রথমে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে নজর দিতে হবে। গত কয়েক দশক ধরে সবার মধ্যে একটি সাধারণ ধারণা ছিল, ব্যাংকে টাকা রাখা মানেই তা নিরাপদ। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কিছু ব্যাংকে উদ্ভূত পরিস্থিতি এই চিরাচরিত ধারণাকে বদলে দিয়েছে। ফলে আমানতকারীরা এখন তাদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় জমা রাখার ক্ষেত্রে আগের তুলনায় অনেক বেশি সতর্ক ও সচেতন হয়ে উঠছেন।

এমন পরিস্থিতিতে দেশের ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূলধন হয়ে উঠেছে ‘আস্থা’। শুধু চোখ ধাঁধানো ব্র্যান্ডিং বা তুমুল প্রচারণায় এই আস্থা অর্জন করা যায় না। শক্তিশালী করপোরেট সুশাসন, আর্থিক স্থিতিশীলতা, নিয়মতান্ত্রিক আইন প্রতিপালন এবং দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমেই শুধু গ্রাহকদের কাছে একটি ব্যাংকের বিশ্বস্ততা প্রতিষ্ঠিত হয়।

একটি ব্যাংক কতটা নিরাপদ, তা বোঝার জন্য সবার প্রথমে ব্যাংকের স্পন্সরদের গুণগত মান এবং করপোরেট সুশাসনের কাঠামোর দিকে তাকাতে হবে। কারণ যেসব ব্যাংকের সুশাসন শক্তিশালী, তারা যেকোনো অর্থনৈতিক ও বাজারভিত্তিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অন্যদের তুলনায় বেশি সক্ষম হয়। ব্র্যাক ব্যাংকের স্পন্সরশিপের একটি বড় অংশ রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘ব্র্যাক’-এর অধীনে। একই সঙ্গে আমাদের ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বেশির ভাগই আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞ স্বাধীন বা নন-শেয়ারহোল্ডার পরিচালক। ফলে ব্র্যাক ব্যাংক যেকোনো ব্যক্তিস্বার্থ বা করপোরেট স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে শতভাগ সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং এবং অন্যান্য স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন বিবেচনায় নিতে হবে। এগুলো একটি ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং দায়বদ্ধতা মেটানোর যোগ্যতার প্রকৃত চিত্র সঠিকভাবে তুলে ধরে। উল্লেখ্য, ব্র্যাক ব্যাংক বিশ্ববিখ্যাত ‘এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল’ এবং ‘মুডিস রেটিংস’-এর মতো প্রতিষ্ঠান থেকে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং পাওয়া বাংলাদেশের একমাত্র ব্যাংক।

তৃতীয়ত, একটি ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান সমান গুরুত্ব রাখে। কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অনুপাত বেশি হলে বুঝে নিতে হবে ওই ব্যাংকের ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা দুর্বল। ২০২৫ সাল শেষে দেশের ব্যাংক খাতে সামগ্রিক খেলাপি ঋণের পরিমাণ যেখানে ছিল ৩০%-এরও বেশি, সেখানে ব্র্যাক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অনুপাত মাত্র ২.২৭%-এ নেমে এসেছে, যা দেশের ব্যাংকিং খাতে এক বিরল দৃষ্টান্ত।

এ ছাড়া ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি, মূলধনের পর্যাপ্ততা, মুনাফা এবং সামগ্রিক ব্যালেন্স শিটের শক্তির মতো মূল আর্থিক সূচকগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। এই সূচকগুলো ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে চাপ সহ্য করার এবং গ্রাহকসেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখার ক্ষেত্রে ব্যাংকের সক্ষমতা প্রকাশ করে। এই ধরনের প্রতিটি সূচকেই অনেক এগিয়ে আছে ব্র্যাক ব্যাংক। যেমন: তারল্য পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান নির্ণায়ক ‘অ্যাডভান্স-টু-ডিপোজিট রেশিও’ মাত্র ৬৩%-এ নামিয়ে এনেছে ব্র্যাক ব্যাংক। এর অর্থ হলো, আমরা যেকোনো বিরূপ পরিস্থিতিতেও গ্রাহকদের আমানত চাহিদামাত্র তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত দেওয়ার পূর্ণ সক্ষমতা রাখি। এ ছাড়া আমাদের মূলধন ভিত্তি এখন ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা ব্যাংকের শক্তিশালী ভিতকে প্রতিফলিত করে। একই সঙ্গে ২০২৫ সালে ব্র্যাক ব্যাংক সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ২,২৫১ কোটি টাকা (কর-পরবর্তী) নিট মুনাফা করেছে, যা আমাদের ধারাবাহিক কর্মকাণ্ডের প্রতিফলন।

সবশেষে একটি ব্যাংকের আমানত প্রবৃদ্ধিও বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ যেকোনো সামষ্টিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে আমানতকারীরা সাধারণত তাদের জমানো টাকা এমন সব ব্যাংকে সরিয়ে নেন, যেগুলোকে তারা সবচেয়ে নিরাপদ এবং নির্ভরযোগ্য মনে করেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে পুরো ব্যাংক খাতের আমানত প্রবৃদ্ধি যেখানে মাত্র ১১.৫১% ছিল, সেখানে ব্র্যাক ব্যাংকের আমানত বেড়েছে প্রায় ২৭.৫%। ২০২৫ সালে মাত্র এক বছরেই আমরা নতুন আমানত পেয়েছি ২১ হাজার কোটি টাকার বেশি।

মূল কথা হলো, কোনো একক সূচক দিয়ে একটি ব্যাংকের সম্পূর্ণ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। সামগ্রিকভাবে আস্থা, সুশাসন, আর্থিক সক্ষমতা এবং আইনগত পরিপালনের মতো উপাদানগুলোর সমন্বিত রূপই নির্ধারণ করে কোনো ব্যাংক অনিশ্চয়তার সময়ে গ্রাহকদের জন্য ‘নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ হিসেবে বিবেচিত হবে কি না।

খবরের কাগজ: জনগণের আস্থা অর্জন করে দীর্ঘমেয়াদে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারা একটি নিরাপদ ব্যাংক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কোন বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?

তারেক রেফাত উল্লাহ খান: এক কথায় যদি বলি– করপোরেট সুশাসন। এটি এমন এক মজবুত ভিত্তি, যার ওপর আস্থা, প্রবৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা গড়ে ওঠে। সুশাসন বজায় রাখতে পারলে একটি ব্যাংক সুষ্ঠু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, আমানতকারীদের সুরক্ষা এবং টেকসই মূল্যবোধ তৈরিতে অনেক বেশি সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। আর যদি এই জায়গায় আপস করা হয়, তাহলে বিপুল মূলধন, আধুনিক প্রযুক্তি বা আকর্ষণীয় বিপণন কৌশল–কোনো কিছুই সেই প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে পারে না।

বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে বিষয়টি নিয়ে আলাদা আলোচনা হয় না। কারণ সেখানে ধরেই নেওয়া হয় যে, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন থাকবেই। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আমাদের দেশের ব্যাংকগুলোকে প্রতিনিয়ত শক্তিশালী সুশাসন নিশ্চিত করতে হয়। একটি শক্তিশালী পরিচালনা পর্ষদ, কার্যকর তদারকি, সুশৃঙ্খল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, রেগুলেটরি পরিপালন, স্বচ্ছতা এবং নৈতিক নেতৃত্বের মতো অপরিহার্য উপাদানগুলো দিয়েই নিশ্চিত হয় এই সুশাসন।

এদের মধ্যকার সম্পর্কটা খুবই সরল। সুশাসন আস্থা তৈরি করে। আস্থা গ্রাহক, বিনিয়োগকারী ও অংশীজনদের আকৃষ্ট করে। আর এই ধারাবাহিক আস্থাই একটি ব্যাংকের প্রবৃদ্ধিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। যেসব প্রতিষ্ঠান আস্থার সঙ্গে আর্থিক শৃঙ্খলার চমৎকার মেলবন্ধন ঘটাতে পারে, শুধু তারাই অর্থনৈতিক মন্দা ও বাজারের যেকোনো বিপর্যয়কর পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়।

খবরের কাগজ: দ্রুত আমানত বৃদ্ধির ফলে অনেক সময় খারাপ মানের ঋণ তৈরি হয় এবং ভবিষ্যতে সম্পদের গুণগত-মান কমে যায়। এমন হওয়া ঠেকাতে আপনারা কীভাবে নিশ্চিত করছেন?

তারেক রেফাত উল্লাহ খান: আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই যেকোনো ব্যাংকের প্রধান দায়িত্ব। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকের বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত, সুদৃঢ় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ঋণের গুণগত-মান অক্ষুণ্ণ রাখার নিশ্চয়তা থাকলেই আমানতের প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে অর্থবহ হয়ে ওঠে।

একটি ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো একক খাতের ওপর নির্ভর না করে ভিন্ন ভিন্ন খাতে ঋণ দেওয়া। বাংলাদেশের অনেক ব্যাংক এখনো অল্প কিছু বড় করপোরেট ও বাণিজ্যিক ঋণগ্রহীতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। এই মডেলে সমস্যা হলো, ঋণ তহবিলের বড় অংশ যখন নির্দিষ্ট কিছু ঋণগ্রহীতা বা খাতের সঙ্গে বাঁধা থাকে, তখন সামান্যতম নেতিবাচক পরিস্থিতিও পুরো প্রতিষ্ঠানের ব্যালেন্স শিটে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

অন্যদিকে, বৈচিত্র্যময় পোর্টফোলিও ব্যাংককে অনেক বেশি স্থিতিশীলতা দেয়। করপোরেট, কমার্শিয়াল, এসএমই, রিটেইল ও কৃষি খাতের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রাহকদের সেবা দেওয়ার মাধ্যমে ঝুঁকিগুলো অনেক বেশি কার্যকরভাবে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।

অবশ্য এই বৈচিত্র্যকরণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ দরকার। দেশব্যাপী শক্তিশালী ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক গড়া, প্রত্যন্ত অঞ্চলে মাঠপর্যায়ে শক্তিশালী উপস্থিতি এবং সারা দেশের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি করার মতো কাজগুলো খুব সহজ নয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে এটিই সবচেয়ে টেকসই পথ।

একই সঙ্গে এই প্রবৃদ্ধিকে সুশৃঙ্খল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এগিয়ে নিতে হবে। এটি নিশ্চিত করতে ঋণ বিতরণের প্রতিটি সিদ্ধান্ত একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো, কঠোর মূল্যায়ন এবং শক্তিশালী আন্ডাররাইটিং মানদণ্ডের আলোকে নিতে হয়। পাশাপাশি ধারাবাহিক পোর্টফোলিও মনিটরিং থাকলে ভবিষ্যতের উদীয়মান ঝুঁকিও আগে থেকে চিহ্নিত করে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।

ব্র্যাক ব্যাংকে আমরা আমানতের প্রবৃদ্ধি এবং সম্পদের গুণগত মানকে দুটি পরস্পরবিরোধী বিষয় হিসেবে দেখি না, বরং একে অপরের পরিপূরক মনে করি এবং এসব আমানত ব্যবহারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকি। মূলত করপোরেট সুশাসন, ঋণ শৃঙ্খলা এবং বৈচিত্র্যময় পোর্টফোলিওর মেলবন্ধন থাকায় আমাদের আমানত প্রবৃদ্ধি ব্যাংকের সম্পদের মানকে উন্নত করার পাশাপাশি ব্যালেন্স শিটকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

খবরের কাগজ: পুরো ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ যেখানে সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, সেখানে আপনার ব্যাংক কীভাবে সম্পদের গুণগত-মান বজায় রাখতে পেরেছে?

তারেক রেফাত উল্লাহ খান: এর অন্যতম কারণ হলো, বাজারের পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন, আমরা কখনো আমাদের মূল নীতিমালার সঙ্গে আপস করি না। ব্র্যাক ব্যাংক শুরু থেকেই সুশাসন, আন্তর্জাতিক মান মেনে চলা এবং পূর্ণ স্বচ্ছতা থেকে কখনো সরে না এসে সম্পদের শক্তিশালী গুণগত মান বজায় রাখার মতো মূল ভিত্তিগুলো মেনে চলেছে। যেকোনো পরিস্থিতিতে আমরা এখানে অটল থেকেছি। 

বাজার মাঝেমধ্যে লোভনীয় সুযোগ সামনে নিয়ে আসে। তবে আমাদের নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে হলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে সরে এসেছি। ফলে সাময়িকভাবে আমাদের মুনাফা কিছুটা কম হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটিই আমাদের সম্পদের গুণগত মানকে সুরক্ষিত রেখেছে। এ ছাড়া একটি ব্যাংক জনগণকে সাধারণ ব্যাংক সেবার বাইরে গিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণে কতটুকু ভূমিকা রাখছে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। এভাবেই ব্র্যাক ব্যাংক আজ দেশের সবচেয়ে নিরাপদ ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

খবরের কাগজ: নিরাপদ ব্যাংক হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে ডিজিটাল ও সাইবার সিকিউরিটির গুরুত্ব কেমন? ব্র্যাক ব্যাংক কীভাবে ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে?

তারেক রেফাত উল্লাহ খান: একটি ব্যাংক কতটা নিরাপদ, তার একটা বড় অংশ নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ডিজিটাল অবকাঠামোর সুরক্ষা ব্যবস্থার ওপর। কারণ গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট তথ্য, লেনদেনের ইতিহাস, ব্যক্তিগত পরিচয় থেকে শুরু করে সবকিছুই এখন ডিজিটালি সংরক্ষণ করা হয়। ফলে সাইবার নিরাপত্তা এখন ব্যাংকের মূল দায়িত্বের অংশ।

ব্র্যাক ব্যাংক এই বাস্তবতাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। আমরা গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক মানের পদ্ধতি অনুযায়ী সব ক্ষেত্রে মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন নিশ্চিত করি, যাতে অননুমোদিত প্রবেশ ঠেকানো যায়। একই সঙ্গে আমাদের ডেটা এনক্রিপশন ও ডেটা লস প্রিভেনশন ব্যবস্থা চালু রয়েছে। রিয়েল টাইম মনিটরিংয়ের জন্য আমরা এসওসি, এসআইইএম এবং এসওএআর প্রযুক্তি ব্যবহার করছি, যাতে যেকোনো অস্বাভাবিক কার্যক্রম তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা যেতে পারে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের সব রেগুলেটরি কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা হচ্ছে।

গ্রাহকদের সাইবার ঝুঁকি ও প্রতারণামূলক কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতন করতে নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচিও পরিচালিত হচ্ছে। কারণ প্রযুক্তিগত সুরক্ষা যতটা জরুরি, গ্রাহকের সচেতনতাও ততটাই জরুরি।

ব্র্যাক ব্যাংক এখানেই থেমে নেই। আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় রয়েছে– থ্রেট ইন্টেলিজেন্স শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম স্থাপন করা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিংভিত্তিক অ্যানালিটিক্স ব্যবহার, ইনসিডেন্ট রেসপন্স সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত ভিএপিটি ও রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট কার্যক্রম সম্প্রসারণ।

সাইবার ইনসিডেন্ট রেসপন্সেও আমরা প্রস্তুত। আমাদের নিজস্ব সাইবার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিমের যেকোনো ফিশিং, ম্যালওয়্যার ও ডেটা ব্রিচের মতো হুমকিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। বিজনেস কন্টিনিউটি ম্যানেজমেন্ট ও ডিজাস্টার রেসপন্স সক্ষমতাও আমরা নিশ্চিত করেছি। সব মিলিয়ে, ডিজিটাল নিরাপত্তাকে ব্র্যাক ব্যাংক সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেই বিবেচনা করে।

আমাদের স্যার

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ০৮:৩১ এএম
আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬, ০৮:৩৭ এএম
আমাদের স্যার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের দোতলার পশ্চিম দিকটার নির্ধারিত কক্ষে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যারের ক্লাস। ক্লাসটা আমাদের ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের। বিষয় শেক্‌সপিয়রের নাটক হ্যামলেট। স্যার পড়াচ্ছেন না বলে বলা ভালো, সেমিনারে বক্তৃতা দিচ্ছেন। কক্ষ-করিডর ভরে গেছে অন্য বিভাগের অন্য বিষয়ের শিক্ষার্থীদের ভিড়ে, হাজিরা খাতায় থাকা নাম ডাকার সুযোগ নেই। বক্তৃতার বিষয় হ্যামলেট, শেক্‌সপিয়রের কালজয়ী বিয়োগান্তক নাটক। এলসিনরের প্রাসাদে যুবরাজ হ্যামলেট তার মায়ের দ্বিচারিতায়, তার চাচা ক্লডিয়াসের চাতুর্যে প্রাসাদ দখল দ্বিমুখীনতায় ত্যক্তবিরক্ত, বিব্রত ও বিভ্রান্ত। তার সামনে ওফেলিয়ার প্রেম। সংশয় সন্দেহ। ‘ফ্রেইলটি দ্যাই নেম ইজ ওম্যান’–হ্যামলেট তার মা কুইন গার্টুডের ওপর ক্ষোভ ও হতাশা থেকে এই স্বগতোক্তিটি করেছিলেন। মানসিক দ্বন্দ্ব। টু বি অর নট টু বি দ্যাট ইজ দ্য কোশ্চেন। হ্যামলেটের এ প্রশ্ন তাবৎ দুনিয়ার সব সম্ভাবনাময় মানুষের সামনে। বইয়ের পাতা থেকে প্রসঙ্গ চলে এল সমাজ, সংসার রাজনীতি এমনকি পুঁজিবাদের মধ্যকার অসঙ্গতিগুলোর ক্ষেত্রেও। মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছে সবাই। স্যারের একক সেমিনারে হ্যামলেট নাটকের সেই সর্বজনীন স্বগোতোক্তি টু বি অর নট টু বির ব্যাখ্যা ডালপালা ছড়াচ্ছে। আপাতত সে সময় আমাদের ক্লাসে। বর্তমানে বিশ্ব সংসারে। 

আমরা তখন আশির দশকের একেবারে গোড়ার বাংলাদেশে। পঁচাত্তরের পট-পরিবর্তনের পর বহুদলীয় গণতন্ত্র যাত্রার কৈশোরকাল। আমরা হতে চেয়েছিলাম ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক, ইউনিভার্সিটি কিংবা কলেজে। শিক্ষক হব তার মতো, ক্লাসে সবাইকে সম্মোহিত করব তার মতো। পারলে কলম ধরব পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে। মাইনে ছাড়া মার্কসের ভাবশিষ্য বনে যাব। স্যার উপদেশ দিলেন–‘না। তোমরা ডেপুটিদের দলে ঢুকে পড়ো’। অর্থাৎ সরকারি আমলা হও। কেননা, যুক্তি দিলেন তিনি–আসন্ন সমাজে এই শিক্ষক সেই শিক্ষক হতে পারবে না। কেননা, দূরদৃষ্টিতে দেখছেন তিনি, পুঁজিবাদের মন্ত্রতন্ত্র শিক্ষক সমাজে ঢুকে গেছে ইতোমধ্যে। নানা প্যাঁচ-পোঁচ, এগেইন টু বি অর নট টুবির ফ্যাসাদে, প্রাসাদে। শিক্ষকতার মানমর্যাদা নিয়ে মফস্বল কলেজে ইংরেজির প্রভাষক হয়ে টিকতে পারবে না। অনার্স পাস করে এমএর প্রান্তিক পর্যায়ে আমরা, ১৯৭৯ সালে, তখনো বছর বছর বিসিএস দেওয়ার চল চালু হয়নি। অতএব, অনার্স পাস করেই বিসিএস দাও, দিলাম। আমাদের ক্লাসের ৩০ জনের মধ্যে ২৯ জনই বিসিএসে প্রবেশিলাম। টু বি অর নট টুবি করতে করতে দেশের সর্বোচ্চ আমলা হলাম অনেকেই। পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে গিয়ে, মব না হয়েও কলম ধরতে স্যারের সহযাত্রী হলাম। কিন্তু তেমন কিছু করতে পারলাম কই। তবে কিছু তো হয়েছে বা হচ্ছে। মার্কিনিদের মধ্যে তো অনেকে যেমন পুঁজিবাদের পোষ্যপুত্র ইলন মাস্ক দুনিয়ার সেরা ধনী হচ্ছে, মেলিন্ডা ও বিল গেটস টাকা রাখার জায়গা পাচ্ছে না। কিন্তু মার্কিনিদের মাতবরির বিশ্বব্যাপী বদনাম থামানো যাচ্ছে না। শেষমেষ ফুটবল খেলায় মাতিয়ে পুঁজিবাদের পতন কিংবা বোধন ঠেকানোর চেষ্টা চলছে। ইরানি দলের সঙ্গে উপেক্ষার প্রেক্ষাপট পাল্টানো যাচ্ছে না। এদিকে পুঁজিবাদের জাত শত্রু রাশিয়া ও চীন এখন শ্যাম রাখি না কুল রাখি অবস্থানে। টু বি অর নট টু বি।

নতুন দিগন্ত পত্রিকায় স্যারের সম্পাদকীয় এখনো দৈর্ঘ্য-প্রস্থে বিশাল। আত্মজৈবনিক প্রসঙ্গ থেকে শুরু করে কত কিছু সম্পাদকীয় স্তম্ভে ভিড় জমাচ্ছে। জাতীয় দৈনিকগুলোয় স্যার বিস্তর লেখালেখি করেছেন। সেসব পুনরোক্তি হলেও তিনিই এখন একমাত্র বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর;  দেশের রাজনৈতিক অর্থনীতি, সামাজিক সংহতি এবং বৈশ্বিক ষড়যন্ত্র মোকাবিলার ক্ষেত্রে  তিনিই এখন আমাদের বাতিঘর, মেন্টর। 

একজন সমাজসচেতন বুদ্ধিজীবী হিসেবেও স্যার সক্রিয়। বিভিন্ন অন্যায় ও অসংগতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন। একজন যথার্থ বুদ্ধিজীবীর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তিনি সচেতন। শুধু অবগত নন, নিজে সেই বৈশিষ্ট্যের ধারকও। 

মননচর্চার ক্ষেত্রে স্যারের ক্ষেত্র সাহিত্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি, দর্শন, সংস্কৃতি এমনকি অর্থনীতি পর্যন্ত তার কৌতূহল বিস্তৃত। লেখকজীবনের শুরু থেকেই সাম্যবাদী জীবনদর্শনের প্রতি তার আনুগত্য। এ দর্শন থেকেই তিনি সমাজদেহের বিভিন্ন রোগের অনুসন্ধান করেন। রোগের কারণ হিসেবে প্রায়ই শনাক্ত করেন পুঁজিবাদকে। রোগ নিরাময়ের পদ্ধতি নিয়ে নানা মত থাকতে পারে; কিন্তু রোগ নির্ণয়ে তার অধ্যবসায় বহমান। 

স্বতন্ত্র ভাষাশৈলীর কারণে স্যারের লেখা সহজেই শনাক্ত করা যায়, চেনা তো যায়ই। গুরুগম্ভীর, গুরুত্বপূর্ণ কিংবা জটিল কোনো বিষয়ের অবতারণা করেন গল্পের ভঙ্গিতে। বলার ভঙ্গি একই সঙ্গে সরল ও সরস। এমনকি শিরোনাম কখনো কখনো কাব্যিক ব্যঞ্জনামণ্ডিত। 

দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী জীবনদর্শনে আস্থাবান আমাদের স্যার বরাবরই তার লেখনিতে দার্শনিক গুরুত্বকে প্রাধান্য দিয়ে চলেছেন। তার সব রচনার দিকে তাকালে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার সৃষ্টিশীল জীবন ও সামাজিক কর্মতৎপরতা এ সাক্ষ্য দেয়। 

দর্শনের অপরিহার্যতাকে স্বীকার করেন বলেই স্যার ‘সাহিত্যের দর্শনানুসন্ধান’ করে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন ‘সাহিত্যকে বাদ দিয়ে দর্শন চলতে পারে, কিন্তু দর্শনকে বাদ দিয়ে সাহিত্য চলতে পারে না।’ সাহিত্য মানুষের ভেতরে সংবেদনশীল সত্তাকে জাগিয়ে রাখে। তাই সাহিত্য শ্রেণিবিরোধী ও রাষ্ট্রবিরোধী। বিশ্বসাহিত্যের তুলনায় বাংলা সাহিত্যে রাষ্ট্রবিরোধিতার পরিচয় যৎসামান্য। ফরাসি ও রুশ বিপ্লবের পেছনে সাহিত্যের যেমন বড় ভূমিকা ছিল, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পেক্ষাপটে সাহিত্য তেমন বড় ভূমিকা পালন করেনি। রাষ্ট্রের সঙ্গে সাহিত্যের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক স্পষ্ট করতে না পারা সাহিত্যের একটি দুর্বলতা। এ কারণেই স্যার বরাবরই প্রাসঙ্গিকভাবে টেনে আনেন সমাজ ও রাজনীতিকে। সংস্কৃতি ও স্বাধীনতাকে তিনি পরিপূরক মনে করেন। সংস্কৃতির বিকাশ ও পরাধীনতা পরস্পরবিরোধী। সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য যে মূল্যবোধ ও আত্মপ্রকাশ প্রয়োজন তা স্বাধীনতা ও স্বনির্ভরতা ছাড়া অর্জন সম্ভব নয়। সংস্কৃতিসেবীদের মনে স্বাধীনতার অনুপস্থিতি সংকট বৃদ্ধি করে। দারিদ্র্য নিঃসন্দেহে এ দেশের বড় সমস্যা। কিন্তু দৈন্য শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নয়, চিন্তার ক্ষেত্রেও। তাই তিনি প্রত্যাশা করেন সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে মধ্যবিত্ত শ্রেণি বরাবরই নির্ণয়কের ভূমিকা পালন করেছে। তার মতে, ‘বাংলাদেশের সাহিত্য মধ্যবিত্তের দ্বারা, মধ্যবিত্তকে নিয়ে এবং মধ্যবিত্তের জন্য রচিত।’ তনি মনে করেন সমষ্টিগত জীবনকে যথার্থভাবে ধারণ করতে না পারা সাহিত্যের ব্যর্থতা। এর মূলে রয়েছে দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির সংকট।

স্যারকে ৯১তম জন্মদিনের শুভেচ্ছা।

লেখক: সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

গ্রাহক আস্থা ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবায় সাফল্যের চূড়ায় পূবালী ব্যাংক

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ১০:০১ এএম
আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬, ১০:১১ এএম
গ্রাহক আস্থা ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবায় সাফল্যের চূড়ায় পূবালী ব্যাংক
খবরের কাগজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী। ছবি: খবরের কাগজ

দেশের ব্যাংক খাত যখন উচ্চ খেলাপি ঋণ, মূলধনসংকট ও আস্থাহীনতার চাপে টালমাটাল, তখন ব্যতিক্রম হিসেবে প্রযুক্তিনির্ভর রূপান্তর, শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পথে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বেসরকারি খাতের পূবালী ব্যাংক। 

চ্যালেঞ্জপূর্ণ বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও ২০২৫ সালে শক্তিশালী আর্থিক প্রবৃদ্ধি, সুদৃঢ় সম্পদমান, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণ এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকটি। বর্তমানে ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন ৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের নিচে, কোনো ধরনের প্রভিশন ঘাটতি নেই, মূলধন পর্যাপ্ততা দেশের অন্যতম শক্তিশালী অবস্থানে এবং ধারাবাহিকভাবে ভালো মুনাফা ও লভ্যাংশ প্রদান–এসব সূচকে ইতিবাচক ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে ব্যাংকটি। সুশাসন, বিচক্ষণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহককেন্দ্রিক উদ্ভাবনের মাধ্যমেই এমনটি সম্ভব হয়েছে বলে জানান ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ আলী।

খবরের কাগজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আর্থিক সক্ষমতা, সুশাসন, গ্রাহকের আস্থা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির প্রতিফলনের ফলে গত তিন বছরে পূবালী ব্যাংক শুধু ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধিই অর্জন করেনি, বরং শেয়ারহোল্ডারদের জন্যও উল্লেখযোগ্য মূল্য সৃষ্টি করেছে। ২০২২ সালে যেখানে ব্যাংকের শেয়ারদর ১৬ থেকে ২০ টাকার মধ্যে অবস্থান করছিল, বর্তমানে তা ৩৭ টাকারও ঊর্ধ্বে উন্নীত হয়েছে। একইসঙ্গে ধারাবাহিক স্টক ডিভিডেন্ডের মাধ্যমে ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন প্রায় এক হাজার কোটি টাকা থেকে প্রায় ৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে এক হাজার ৫৬০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে, যা শেয়ারহোল্ডারদের অংশীদারত্বের মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাংকের মূলধনী ভিত্তিকেও আরও শক্তিশালী করেছে। ফলে ২০২২ সালের তুলনায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের বাজারমূল্য তিন গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, সুশাসন, গ্রাহকের আস্থা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির প্রতিফলন।

তিনি বলেন, বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও পূবালী ব্যাংক সুশাসন, বিচক্ষণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহককেন্দ্রিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য মূল্য সৃষ্টি করে যাচ্ছে।

মোহাম্মদ আলী বলেন, পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পূবালী ব্যাংক শুধু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং প্রযুক্তি, ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে কেন্দ্র করে একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তর কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। শাখাভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী ব্যাংকিং এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সমন্বয়ে ব্যাংকটি একটি শক্তিশালী ‘ফিজিটাল ব্যাংকিং ইকোসিস্টেম’ গড়ে তুলছে, যেখানে গ্রাহক তার পছন্দের মাধ্যমে, সুবিধাজনক সময়ে এবং নিরাপদ উপায়ে ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করতে পারছেন।

ডিজিটাল রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা পিআই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ২০২৫ সালের শেষে ৫ লাখ ২৮ হাজার ২৭৬ জন সক্রিয় ব্যবহারকারী অর্জন করেছে। প্ল্যাটফর্মটির মাধ্যমে মোট ১ দশমিক ৮৬ কোটি লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে। বছরওয়ারি হিসাবে ব্যবহারকারী বৃদ্ধি পেয়েছে ৭৮ শতাংশ এবং লেনদেন বৃদ্ধি পেয়েছে ১১৫ শতাংশ, যা ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে গ্রাহকদের ক্রমবর্ধমান আস্থার প্রতিফলন।

ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো সম্প্রসারণেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে ব্যাংকটি। ২০২৫ সালে মার্চেন্ট পিওএস টার্মিনাল সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৫২৫-এ এবং ১ দশমিক ৪৫ লাখেরও বেশি বাংলা কিউআর স্থাপনের মাধ্যমে নগদহীন লেনদেনকে আরও সহজ, নিরাপদ ও বিস্তৃত করা হয়েছে। এর ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, খুচরা বিক্রেতা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ডিজিটাল আর্থিক সেবার প্রসার বেড়েছে।

পূবালী ব্যাংকের বিস্তৃত নেটওয়ার্কও এই রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকের ৫১৭টি শাখা, ২৭৪টি উপশাখা, ২২টি ইসলামিক ব্যাংকিং উইন্ডো এবং ৯০১টি এটিএম/সিআরএম কার্যকর ছিল। সেল্ফ সার্ভিস ব্যাংকিং ও ডিজিটাল অনবোর্ডিং সুবিধা গ্রাহকদের জন্য ব্যাংকিংকে আরও দ্রুত, সহজ ও স্বনির্ভর করেছে।

আর্থিক সূচকেও ব্যাংকটি শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তার ভাষ্যমতে, ২০২৫ সালে ব্যাংকের মোট সম্পদ ২০ দশমিক ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার ১৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। আমানত দাঁড়িয়েছে ৮৯ হাজার ৫১৯ কোটি ৪৯ লাখ টাকা এবং ঋণ ও অগ্রিম বেড়ে হয়েছে ৭১ হাজার ১৪০ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। একই সময়ে একীভূত পরিচালন মুনাফা ২ হাজার ৯০৭ কোটি টাকা এবং কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ১ হাজার ৭৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। শেয়ারহোল্ডার ভ্যালুর ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার হার দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের ন্যূনতম সীমার চেয়ে অনেক বেশি এবং ব্যাংকের মূলধনী শক্তি ও স্থিতিশীলতার পরিচায়ক।

শুধু তা-ই নয়, অ্যাসেট কোয়ালিটির ক্ষেত্রেও পূবালী ব্যাংক শিল্প খাতের তুলনায় ব্যতিক্রমী অবস্থান ধরে রেখেছে। ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল মাত্র ২ দশমিক ২০ শতাংশ, যেখানে খাতভিত্তিক গড় খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে। ডাটা-নির্ভর মনিটরিং, বিচক্ষণ ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং শক্তিশালী পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের মাধ্যমে এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে।

বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও রেমিট্যান্স প্রবাহেও পূবালী ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত রপ্তানি ব্যবসা ৩৮ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা, আমদানি ব্যবসা ৪৭ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক রেমিট্যান্স ১১ হাজার ৩৬২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বিশেষ করে রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি ব্যাংকের সেবার মান, বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এবং গ্রাহক আস্থার প্রতিফলন বলে উল্লেখ করেন মোহাম্মদ আলী। 

তিনি বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি ইএসজি ও টেকসই উন্নয়নেও গুরুত্ব দিচ্ছে পূবালী ব্যাংক। ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকের মোট ঋণ ও অগ্রিমের প্রায় ৩০ শতাংশ টেকসই অর্থায়নের অন্তর্ভুক্ত ছিল। 

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে মোহাম্মদ আলী বলেন, ২০২৬-২০২৮ কৌশলগত পরিকল্পনার আওতায় পূবালী ব্যাংক প্রযুক্তিনির্ভর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই ব্যাংকিং মডেল বাস্তবায়নে কাজ করছে। ২০২৬ সালে ব্যাংকটি একটি বছরব্যাপী ব্যাংকিং ক্যাম্পেইন পরিচালনা করবে, যার মাধ্যমে রিটেইল, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং করপোরেট খাতে ডিজিটাল লেনদেন আরও সম্প্রসারিত হবে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের বিপুল জনগোষ্ঠী এখনো পূর্ণাঙ্গ আর্থিক সেবার বাইরে রয়েছে। শাখার বিস্তৃতি, উপশাখা, সেল্ফ সার্ভিস পয়েন্ট, পিআই অ্যাপ এবং বাংলা কিউআরের সমন্বয়ের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা গ্রাহকদের সেবার আওতাভুক্ত করার  লক্ষ্য বাস্তবায়ন করে দেশের আরও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসতে চায় পূবালী ব্যাংক। মোহাম্মদ আলীর মতে, প্রযুক্তিনির্ভর, নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দায়িত্বশীল ব্যাংকিংই ভবিষ্যতের পথ। ঐতিহ্য, সুশাসন, উদ্ভাবন এবং গ্রাহককেন্দ্রিক সেবার সমন্বয়ে পূবালী ব্যাংক আগামী দিনগুলোতে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি অর্থনীতি ধ্বংসের বোমা: ফরিদা আখতার

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৮:৫৮ এএম
আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬, ১১:১৪ এএম
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি অর্থনীতি ধ্বংসের বোমা: ফরিদা আখতার
সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। ছবি: খবরের কাগজ

নারী অধিকার, কৃষি, প্রাণবৈচিত্র্য ও খাদ্য সার্বভৌমত্বের আন্দোলনে পরিচিত মুখ ফরিদা আখতার। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি দেশের কৃষক, নারী এবং স্থানীয় উৎপাদনব্যবস্থা নিয়ে কাজ করে আসছেন। ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান উবিনীগের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক হিসেবে তিনি বিকল্প উন্নয়ন ভাবনার অন্যতম প্রবক্তা। একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন সরকারের দায়িত্ব পালনের অম্ল-মধুর নানা অভিজ্ঞতার কথা। তার সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন খবরের কাগজের সিনিয়র রিপোর্টার শাহনাজ পারভীন এলিস

খবরের কাগজ: আপনি তো রাজনীতিক নন, একজন মানবাধিকার কর্মী। কৃষি ও নারী আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা সমাজকর্মী। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হওয়ার আহ্বান প্রথম কীভাবে পেলেন?

ফরিদা আখতার: আমি দলীয় রাজনীতি করিনি, কিন্তু রাজনৈতিক প্রশ্নে সব সময় সক্রিয় ছিলাম। নারী অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে ১৯৮৭ সাল থেকে আছি। দীর্ঘদিন ধরে কৃষি আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত। ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানের সময় ছাত্রদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল। সরকারে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রথম প্রস্তাবটা ছাত্রদের কাছ থেকেই আসে। প্রথমে আমি রাজি হইনি, বলেছিলাম, আমি তোমাদের সঙ্গে রাস্তায় থাকতে চাই। পরে যখন জানতে পারি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের তালিকায়ও আমার নাম আছে, তখন দায়িত্ব গ্রহণে সম্মত হই।


খবরের কাগজ: মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

ফরিদা আখতার: এই মন্ত্রণালয়টি বরাবরই অবহেলিত। প্রথমে মনে হয়েছিল বিষয়টি আমার জন্য অপরিচিত। কিন্তু পরে বুঝলাম কৃষি, মৎস্য খাত ও প্রাণিসম্পদের বিষয়গুলো একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্থানীয় জাত সংরক্ষণ, কৃষকের অধিকার এবং খাদ্য সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আমি বহুদিন কাজ করেছি। মন্ত্রণালয়ে গিয়ে দেখলাম, দেশীয় জাত সংরক্ষণ ও উৎপাদন বৃদ্ধির মধ্যে এক ধরনের দ্বন্দ্ব রয়েছে। একদিকে উৎপাদন বাড়াতে হবে, অন্যদিকে স্থানীয় জাত ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করতে হবে। এই ভারসাম্য রক্ষার সংগ্রামেই আমার সময় কেটেছে।

খবরের কাগজ:  সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল?
ফরিদা আখতার: অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনই ছিল না। অবৈধ জাল ব্যবহার, বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ ধরা—এসব বন্ধ করতে আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা ছিল। আবার মৎস্যজীবীদের জন্য কার্যকর ঋণ ব্যবস্থাও ছিল না। মৎস্যজীবীদের সবচেয়ে বড় সংকট দাদন ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার হাত থেকে জেলেদের মুক্ত করতে আমরা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছিলাম, যেন মৎস্যজীবীরাও নীতিগত জায়গা থেকে ঋণ পেতে পারেন। কিন্তু ওটা বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত গিয়ে আটকে আছে। তারা ব্যাংক বাড়াতে অনীহা জানিয়েছে।

খবরের কাগজ: নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে। সরকারের আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আপনি কী বলবেন?

ফরিদা আখতার: নারী কমিশন গঠনের দাবিটা আমরা কয়েকজন উপদেষ্টাই তুলেছিলাম। কমিশনের সুপারিশগুলোও অনেক ভালো ছিল। কিন্তু কয়েকটি বিষয়ে বিতর্ক তৈরি হয়, বিশেষ করে নারীর সম্পত্তির অধিকারের প্রশ্নে। কমিশনের প্রস্তাবে অনেক ভালো বিষয় ছিল। যেমন সংসদে সংরক্ষিত যে নারী আসন, সেগুলোতেও সরাসরি নির্বাচনের প্রস্তাব এই কমিশনের ছিল। আমি মনে করি, সরকারের আন্তরিকতার অভাব ছিল না। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা ছিল। ধর্মীয় গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তির কারণে অনেক বিষয় এগিয়ে নেওয়া যায়নি। নারী আন্দোলনের কর্মী হিসেবে এটা নিয়ে আমার মনেও দুঃখবোধ আছে। তবে আমি দেখেছি, তাদের আন্তরিকতার অভাব ছিল না; বরং পরিস্থিতিগত সীমাবদ্ধতা ছিল।


খবরের কাগজ: অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কাজ ছিল সংসদ নির্বাচন আয়োজন ও নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর। কিন্তু এই নির্বাচনকে ঘিরে নানা রাজনৈতিক টানাপোড়েন ছিল। আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

ফরিদা আখতার: একটা বিষয় পরিষ্কার করতে চাই। অন্তর্বর্তী সরকার শুধু নির্বাচন দেওয়ার জন্য গঠিত হয়নি। আমাদের তিনটি প্রধান দায়িত্ব ছিল– গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার, প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন। দায়িত্ব গ্রহণের পর আমাদের প্রথম ছয় মাসই কেটেছে শহিদ পরিবার, আহত মানুষ এবং তাদের পুনর্বাসনের কাজ নিয়ে। হাজার হাজার আহত মানুষের চিকিৎসা ও তালিকা প্রস্তুত হয়েছে। শহিদদের পরিবারগুলোর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক রাখতে হতো। এ ছাড়া শিক্ষকদের আন্দোলন, স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্দোলন- প্রায় প্রতিদিন শাহবাগ মোড়, যমুনা ও সচিবালয় ঘেরাও অথবা বিক্ষোভ কর্মসূচি থাকত। এসবের পেছনে ফ্যাসিবাদী শক্তির অনেক ইন্ধন ছিল। সবই আমাদের সামাল দিতে হয়েছে। এরপর সংস্কার ও নির্বাচনের প্রক্রিয়া এগিয়েছে। ফলে নির্বাচন আয়োজনের যে সময়টা লেগেছে, এটা কোনো কালক্ষেপণ না। 

খবরের কাগজ: বড় একটি রাজনৈতিক দলকে (আওয়ামী লীগ) বাইরে রেখে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন কতটা গণতান্ত্রিক?

ফরিদা আখতার: অবশ্যই আমি এটাকে গণতান্ত্রিক নির্বাচন বলব। কারণ আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে চাই—যারা গণ-অভ্যুত্থানে শহিদ হয়েছেন, যারা আহত হয়েছেন, লাখো মানুষ যারা রাস্তায় নেমেছিলেন, তাদের কাছে আমরা কী জবাব দিতাম, যদি সেই দলকেই আবার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দিতাম? যে রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, যাদের বিরুদ্ধে ১৫ বছর ধরে ভোটাধিকার হরণ, অর্থ পাচার, অর্থনীতি ধ্বংস এবং জনগণের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলার অভিযোগ রয়েছে, সেই দলকে শুধু ‘সব দলকে নির্বাচনে আনতে হবে’–এই যুক্তিতে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া যায় না। শহিদদের কাছে আমাদের দায় ছিল। গণতন্ত্রের নামে সবকিছু এক কাতারে ফেলা যায় না। এ ছাড়া তাদের দলীয় কর্মকাণ্ড তখন আইনগতভাবেই নিষিদ্ধ ছিল। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তারা বৈধ রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারত না। সুতরাং ‘সব দল’ বলতে তখন যেসব দল আইনগতভাবে বৈধ ছিল, তাদেরই বোঝানো হয়েছে। আমাদের সরকারের দায়বদ্ধতা ছিল শুধু ভোটারদের প্রতি নয়; গণ-অভ্যুত্থানে শহিদ হওয়া মানুষ এবং আহতদের প্রতিও ছিল। সেই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না।

খবরের কাগজ: গণভোটের প্রচার ও ভোটের ফল নিয়ে এত বিতর্ক কেন হলো?

ফরিদা আখতার: এ বিষয়ে বিতর্কের বড় কারণ ছিল মানুষের মধ্যে কিছু বিভ্রান্তি। চারটি প্রশ্ন থাকায় অনেকে বুঝতে পারেননি, একটি প্রশ্নে দ্বিমত থাকলে কীভাবে ভোট দেবেন। আবার রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানও সবসময় স্পষ্ট ছিল না। বিশেষ করে বিএনপি একসময় ‘না’ ভোট, পরে ‘হ্যাঁ’ ভোটের কথা বলায় তাদের সমর্থকদের মধ্যেও দ্বিধা তৈরি হয়। তারপরও মানুষ সংস্কারের প্রত্যাশা থেকেই ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে। আমরা উপদেষ্টারা বিভিন্ন জেলায় গিয়ে শুধু ‘হ্যাঁ’ ভোটের অর্থ কী, সেটি ব্যাখ্যা করেছি। কাউকে ‘না’ ভোট না দিতে বলিনি। 

খবরের কাগজ: ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ বিতর্ক নিয়ে অনেক বিতর্ক চলছে। সেই ক্যাবিনেটে কারা ছিলেন? আপনি কি ছিলেন?

ফরিদা আখতার: আমি সেই বৈঠকের অংশ ছিলাম না। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ একটি পরিচিত ধারণা। আমাদের সরকারে আনুষ্ঠানিকভাবে এ নামে কোনো কাঠামো ছিল না। প্রতি বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক করতাম এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সেখানেই নেওয়া হতো। এর বাইরে সপ্তাহের আরেকটি দিনে কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন আলাদাভাবে বৈঠক করতেন। তবে এটাকে অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মূল সিদ্ধান্তগুলো উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকেই হয়েছে। হয়তো প্রধান উপদেষ্টার প্রয়োজন বা বাস্তবতার কারণেই এ ধরনের বৈঠক হয়েছে। এ নিয়ে অতিরিক্ত বিতর্ক তৈরি করা ঠিক নয়। 


খবরের কাগজ: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন, এ বিষয়ে আপনার অবস্থান কী ছিল?

ফরিদা আখতার: একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি বলব—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তি যেটা হয়েছে, সেটা ক্ষতিকর। এতে জনগণের স্বার্থ রক্ষা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র এবং ট্রাম্পকে তো আমরা জানি। ট্রাম্প যেমন ইরানে বোমা মারতে পারে অহেতুক, এই চুক্তি এ দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের বোমা মারার মতো সেরকমই এক ঘটনা।  

বিশেষ করে মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্য আমদানির বিষয়টি আমাদের দেশীয় খামারিদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পভিত্তিক পশুপালন ব্যবস্থা এবং জিএমও খাদ্য ব্যবহারের বিষয়েও আমার উদ্বেগ রয়েছে। এ বিষয়ে আমার মন্ত্রণালয় থেকে আপত্তি জানিয়েছিলাম। উপদেষ্টা থাকাকালে ক্যাবিনেটেও আমি এই চুক্তির বিরোধিতা করেছি এবং শেষ দিন পর্যন্ত আপত্তি জানিয়েছি, বলেছি অন্তত চুক্তির এই অংশগুলো যেন বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। 

বিরোধিতার আরও একটি কারণ যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পভিত্তিক পশুপালন ব্যবস্থা আমাদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা জেনেটিক্যালি মডিফায়েড কর্ন ও সয়াবিন ব্যবহার করে। সেই মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্য বাংলাদেশের বাজারে অবাধে ঢুকলে স্থানীয় খামারিরা বড় ক্ষতির মুখে পড়বেন। সস্তা মাংস বাজারে এলে আমাদের লাখ লাখ গরু-ছাগল পালনকারী পরিবার ধসে পড়তে পারে। এটি শুধু প্রাণিসম্পদ নয়, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, গার্মেন্টস—সব খাতেই দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।


খবরের কাগজ: এত বিরোধিতার পরও ভোটের মাত্র তিন দিন আগে সরকার এই চুক্তি করল। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো কি জানত?

ফরিদা আখতার: আমাদের জানানো হয়েছিল বিএনপি ও জামায়াতসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। এ বিষয়টি আমি আগেও বলেছি। তবে এত বড় একটি চুক্তি সংসদের বাইরে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। আসলে সে সময় পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে, সরকার মনে করেছিল, চুক্তি না করে উপায় নেই। আমি এখনো মনে করি, এই চুক্তির জনস্বার্থবিরোধী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে সংসদে আলোচনা হওয়া উচিত ছিল। জনগণেরও মতামত নেওয়া উচিত ছিল। সম্প্রতি এমপি রুমিন ফারহানা সেই প্রস্তাব সংসদে দিয়েও ছিলেন। সেটাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। আমার মতে, এখনো সময় ফুরিয়ে যায়নি। এই চুক্তি নিয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা হওয়া উচিত। সরকারের পাশাপাশি আমাদের যার যতটুকু সাধ্য আছে, এই চুক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে কথা বলা দরকার।

খবরের কাগজ: বর্তমান সরকারের যিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী, তিনি তো আগের সরকারের আমলে নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন। এই সরকারে তার অবস্থানকে আপনি কতটা যৌক্তিক মনে করেন?

ফরিদা আখতার: ব্যক্তিগতভাবে আমি এ সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তি বা প্রয়োজনীয়তার কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাইনি। তাই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও ব্যাখ্যার সুযোগ রয়েছে বলে আমি মনে করি। কারণ একটি নির্বাচিত সরকারের ক্ষেত্রে সাধারণত নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্য থেকেই মন্ত্রী নির্বাচন করা হয়। সেই জায়গা থেকে দেখলে একজন সাবেক উপদেষ্টাকে সরকার গঠনের প্রথম দিনেই মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। যদি পরে টেকনোক্র্যাট কোটায় তাকে দায়িত্ব দেওয়া হতো, তাহলে বিষয়টি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যেত। কিন্তু শুরু থেকেই তাকে মন্ত্রিসভায় নেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চর্চায় এক ধরনের নতুন সংযোজন; যে ঘটনার রাজনৈতিক ব্যাখ্যা এখনো অস্পষ্ট।

খবরের কাগজ: মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের একজন মানবাধিকারকর্মী হিসেবে আপনি সুপরিচিত। কিন্তু আপনার সরকারের সময় বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাড়িসহ সারা দেশে অসংখ্য মুক্তিযুদ্ধের নামফলক, স্মৃতিসৌধ ও স্মারক ধ্বংস করা হয়েছে। জাতীয় চার নেতা ও সাত বীরশ্রেষ্ঠসহ মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান করা হয়েছে। এসব ঘটনায় এখন আপনার অনুভূতি কী?

ফরিদা আখতার: প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করতে চাই—মুক্তিযুদ্ধ কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; এটি বাংলাদেশের জনগণের যুদ্ধ। আমরা সবসময় মুক্তিযুদ্ধকে সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই দেখেছি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে একটি দলীয় ও পারিবারিক বয়ানে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছে, যা মানুষের মধ্যে এক ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। আমি মনে করি, এই অতিরিক্ত দলীয়করণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। 

আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, কোনো স্মৃতিসৌধ, নামফলক বা ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংস কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মানকে আমি সমর্থন করি না। এসব ঘটনা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক এবং উদ্বেগের। জনগণের আবেগ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে কিছু ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু সেগুলোকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধিতা হিসেবে দেখার আগে সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন। 

অন্তর্বর্তী সরকার কখনোই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করেনি কিংবা ২০২৪ সালের ঘটনাকে তার বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টাও করেনি। বরং আমরা বিশ্বাস করি, ২০২৪-এর আন্দোলনও মুক্তিযুদ্ধের গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক আকাঙ্ক্ষার ধারাবাহিকতা। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, জাতীয় চার নেতা কিংবা বীরশ্রেষ্ঠদের অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ—এসব নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। তবে ইতিহাসকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার না করে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে পুনর্নির্মাণ করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

খবরের কাগজ: আপনার পরিবার সুফিবাদের অনুসারী। অথচ আপনি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকাকালে দেশের বিভিন্ন মাজার এবং সুফি-সাধকদের ওপর নৃশংস হামলা, নির্যাতন, এমনকি কাউকে কাউকে নির্যাতনের পর পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। নৃশংস এসব ঘটনায় আপনার কোনো দুঃখবোধ আছে কী?

ফরিদা আখতার: অবশ্যই আছে। মাজার, সুফি-সাধক কিংবা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর যেকোনো হামলা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং নিন্দনীয়। আমার পরিবারের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পটভূমি যেমনই হোক না কেন, এ বিষয়টি ব্যক্তিগত নয়; এটি জাতীয় ও মানবিক প্রশ্ন। সরকার কখনোই মাজার ভাঙচুর বা ধর্মীয় অসহিষ্ণুতাকে সমর্থন করেনি। এ ধরনের ঘটনা নিয়ে একাধিকবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে আলোচনা হয়েছে, নিন্দা জানানো হয়েছে এবং যেখানে সম্ভব সেখানে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে এটাও সত্য যে, সব ঘটনা প্রতিরোধ করা সবসময় সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী ও উগ্র গোষ্ঠী পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছে, যার ফলেও কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে।

খবরের কাগজ: সে সময় শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় সহাবস্থানের ওপর আঘাত এসেছে। এসব ঘটনা প্রতিরোধে সরকারের আন্তরিকতা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। আপনার পর্যবেক্ষণ জানতে চাই? 

ফরিদা আখতার: এসব ঘটনা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক এবং দুঃখজনক। আমাকে ব্যক্তিগতভাবে ব্যথিত করেছে। তবে আমি মনে করি না যে সরকার এসব ঘটনার প্রতি উদাসীন ছিল বা এগুলোকে প্রশ্রয় দিয়েছে। বিভিন্ন ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে আমরা নিন্দা জানিয়েছি, ক্যাবিনেটে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছি এবং যেখানে সম্ভব ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সব ঘটনা প্রতিরোধ করা সব সময় সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন উগ্র ও স্বার্থান্বেষী শক্তি পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছে। তারপরও আমি মনে করি, এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন ছিল। আশা করি ভবিষ্যতে সে বিষয়ে আরও গুরুত্ব দেওয়া হবে।

খবরের কাগজ: তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের বিগত তিন মাসের শাসনামল নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

ফরিদা আখতার: বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনায় অনভিজ্ঞ নয়। তবে বর্তমান বিএনপি আগের বিএনপির মতো নয় এবং বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি দলটির জন্য বড় ঘাটতি। পররাষ্ট্র ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে দলের অবস্থান আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তারেক রহমান কিছু জনবান্ধব উদ্যোগ নিয়েছেন, যা প্রশংসনীয়। তবে কেবল জনতুষ্টিমূলক পদক্ষেপ নয়, রাষ্ট্রক্ষমতা ও জনগণের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের প্রশ্নে আরও দৃঢ় ও কৌশলী নেতৃত্ব প্রয়োজন।


খবরের কাগজ: সারা দেশে নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতা, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা বেড়েই চলেছে। এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধে সরকারের প্রতি পরামর্শ কী?

ফরিদা আখতার: নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা দেশের গভীর সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন। ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতন একটি সামাজিক বিকৃতি, যা মোকাবিলায় রাষ্ট্র ও সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে। কিছু নৃশংস ঘটনায় সরকারের দ্রুত বিচার উদ্যোগ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই যথেষ্ট নয়, সমাজের বিভিন্ন স্তরে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে ধর্ষণ ও শিশু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিচারের রায় দ্রুত কার্যকর করতে হবে। এসব অনাচার প্রতিরোধে রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা ও অপরাধের জন্য ভয় সৃষ্টি করতে হবে। মাদক নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিরাপদ করা, সামাজিক নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করা এবং পরিবার ও সমাজে নৈতিক শিক্ষা বাড়ানো জরুরি। 

খবরের কাগজ: কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও স্থানীয় উৎপাদন নীতি নিয়ে আপনার মতামত কী?

ফরিদা আখতার: বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি হওয়া উচিত স্থানীয় উৎপাদন, কৃষকের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং খাদ্যে স্বনির্ভরতা। বিদেশি নির্ভরতা বাড়িয়ে দেশীয় কৃষি ও উৎপাদন ব্যবস্থা দুর্বল করা উচিত নয়; কৃষকবান্ধব ও টেকসই নীতিই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার।

খবরের কাগজ: অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, তাদের ১৮ মাসের শাসনামল নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

ফরিদা আখতার: আমাদের অবশ্যই কিছু অপ্রাপ্তি আছে। সবকিছু শেষ করতে পারিনি। কারণ অত্যন্ত জটিল ও সংকটপূর্ণ সময়ে আমরা দায়িত্ব নিয়েছিলাম। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সরকার কাজ করেছে। সব প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব না হলেও উপদেষ্টারা আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছেন। আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, কোনো উপদেষ্টা চেষ্টার ত্রুটি করেননি। 

খবরের কাগজ: সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আপনারা কতটা পূরণ করতে পেরেছেন?
ফরিদা আখতার: সেটা পরিমাপ করা অত্যন্ত কঠিন। সীমিত সময় ও বাস্তবতার মধ্যে যতটুকু সম্ভব সংস্কারমূলক কাজ করা হয়েছে। ফলে সব প্রত্যাশা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। তবে অনেক ইতিবাচক সংস্কারের ভিত্তি তৈরি হয়েছে। বর্তমান সরকারের উচিত, অন্তর্বর্তী সরকারের ইতিবাচক সংস্কারগুলো বাতিল না করে সংরক্ষণ করা। প্রয়োজনে আরও উন্নত করে দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নেওয়া।

খবরের কাগজ: খবরের কাগজের পাঠকদের উদ্দেশে কিছু বলবেন?

ফরিদা আখতার: খবরের কাগজের পাঠক ও দর্শকদের ধন্যবাদ জানাই। আমি চাই, আপনারা ইতিবাচক কাজের মূল্যায়ন করবেন এবং একই সঙ্গে গঠনমূলক সমালোচনা করবেন। গণতন্ত্রের জন্য এটিই সবচেয়ে প্রয়োজন।