যে বাড়িতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে তাদের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পানির বিল কমানো বা আংশিক মওকুফ করা যেতে পারে, এমনকি হোল্ডিং ট্যাক্স ১০ শতাংশ পর্যন্তও কমানো যেতে পারে। সরকার একটি সুন্দর নীতিমালা তৈরি করে একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিতে পারে।...

একটু ভাবুন তো! মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। কোনো কারণে আপনার বাসার বিদ্যুৎ লাইনটি বন্ধ আছে। মোটর দিয়ে পানি ওঠানো যাচ্ছে না। কী বিপত্তি! নগরকেন্দ্রিক সভ্যতার কী দুঃসহ বিপর্যয়! এটা কেবল আধুনিক ঢাকা শহরের বিপর্যয়ই নয়, আজকাল গ্রামাঞ্চলেও এমন বিপর্যয় চোখে পড়ে।
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের নগরায়ণের গতি অত্যন্ত দ্রুততর হয়েছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় মানুষ ক্রমাগত গ্রাম থেকে শহরে আসছে। ফলে শহরগুলো দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং নতুন বসতি ও অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। কিন্তু এ সম্প্রসারণের একটি বড় অংশ ঘটছে নদী, খালবিল এবং জলাভূমি ভরাট করে। ফলে প্রাকৃতিক জলাধারগুলো ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলেও লেগেছে শহরায়নের ঢেউ। খালবিল, নদীনালা ভরাট করা হচ্ছে দ্রুত গতিতে। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে বাংলাদেশের পরিবেশ ও পানিসম্পদ বর্তমানে ক্রমবর্ধমান সংকটের মুখোমুখি। পরিবেশ দূষণ, দ্রুত নগরায়ণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির অস্বাভাবিক ব্যবহার মিলিয়ে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর তালিকায় অবস্থান করছে। এ দূষণ শুধু বায়ুদূষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নগর পরিকল্পনার ঘাটতি, জলাশয় ভরাট এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের মতো গুরুতর সমস্যা।
ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ কদাচিত চোখে পড়ে। যদিও সরকার ইতোমধ্যে দেশব্যাপী খাল পুনঃখনন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, যা অবশ্যই একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নগর জীবনের পানির চাহিদা পূরণের জন্য আমরা ক্রমেই ভূগর্ভস্থ পানির ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। ঢাকা শহরের অধিকাংশ পানিই এখন ভূগর্ভ থেকে উত্তোলন করা হয়। এর ফলে পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, ঢাকার জনসংখ্যা প্রতি বছর প্রায় ৯ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পানির চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতির একটি গুরুতর পরিবেশগত দিকও রয়েছে। ভূগর্ভ থেকে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে মাটির নিচে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এর উদাহরণ দেখা গেছে। তুরস্কের কিছু অঞ্চলে বড় বড় ‘সিংকহোল’ বা মাটির গর্ত তৈরি হওয়ার ঘটনা ইতোমধ্যে বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনকে এ ধরনের ঘটনার একটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো ভূগর্ভস্থ পানির দূষণ। শিল্পকারখানার বর্জ্য, নগর বর্জ্য এবং বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ ধীরে ধীরে মাটির ভেতরে প্রবেশ করে পানির গুণগত মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ফলে ভবিষ্যতে পানির নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। এ বাস্তবতার মধ্যে একটি সহজ কিন্তু কার্যকর সমাধান রয়েছে- বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বা রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং।
বাংলাদেশের আবহাওয়া বৃষ্টিপাতের জন্য অত্যন্ত অনুকূল। এখানে বছরে গড়ে প্রায় ২২০০ থেকে ২৫০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। অর্থাৎ বছরের কমপক্ষে তিন মাস বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির পানি পাওয়া যায়। এ পানির প্রায় পুরোটাই আমরা অপচয় হতে দিই। সামান্য পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে এ পানির একটি বড় অংশ সংরক্ষণ করা সম্ভব।
বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বলতে মূলত ভবনের ছাদ বা অন্য কোনো উপযুক্ত স্থান থেকে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে তা সংরক্ষণ করা বোঝায়। এ পানি গৃহস্থালির বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা যায়- যেমন গাছপালায় পানি দেওয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, গাড়ি ধোয়া, কিংবা উপযুক্ত পরিশোধনের মাধ্যমে অন্যান্য কাজেও ব্যবহার করা যেতে পারে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা অনেকাংশে কমে যায়।
বিশ্বের অনেক দেশে ইতোমধ্যে এ ব্যবস্থা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অনেক শহরে নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে একদিকে পানির অপচয় কমেছে, অন্যদিকে পরিবেশের ওপর চাপও কমেছে।
বাংলাদেশেও পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য অতীতে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৯৯২ সালে প্রণীত পরিবেশ নীতিমালায় পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার এবং পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। একইভাবে ১৯৯৯ সালে প্রণীত জাতীয় পানিনীতি দেশের পানিসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো প্রদান করে। তবে বাস্তবতার আলোকে দেখা যায় যে, এ নীতিগুলোর অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিক এখনো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৬ সালে প্রণীত ভবন নির্মাণ কোডে ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা, সিঁড়ি, রেলিংসহ বিভিন্ন বিষয়ের বিস্তারিত নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু পানি ব্যবস্থাপনা বা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ সম্পর্কে কোনো বাধ্যতামূলক নির্দেশনা নেই।
এখানেই একটি বড় নীতিগত ঘাটতি রয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি পদক্ষেপ হতে পারে। যদি প্রতিটি ভবনের ছাদে বৃষ্টির পানি সংগ্রহের ব্যবস্থা থাকে, তাহলে বর্ষাকালে বিপুল পরিমাণ পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। মাত্র ১০ থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যেই একটি বাড়ির ছাদে রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং ব্যবস্থা স্থাপন করা সম্ভব।
এ উদ্যোগকে জনপ্রিয় করার জন্য সরকার প্রণোদনামূলক নীতিও গ্রহণ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যে বাড়িতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে তাদের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পানির বিল কমানো বা আংশিক মওকুফ করা যেতে পারে, এমনকি হোল্ডিং ট্যাক্স ১০ শতাংশ পর্যন্তও কমানো যেতে পারে। সরকার একটি সুন্দর নীতিমালা তৈরি করে একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিতে পারে। এ নির্দিষ্ট সময়ের পরে যারা রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং ব্যবস্থা স্থাপন না করে তাদের জন্য হোল্ডিং ট্যাক্স বৃদ্ধি করা যেতে পারে।
এ ধরনের নীতি চালু হলে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের দিকে আগ্রহী হবে। ধীরে ধীরে এটি একটি সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত হতে পারে, যেখানে মানুষ বুঝতে পারবে যে পরিবেশ রক্ষা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব।
একই সঙ্গে বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করাও জরুরি। শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও ছোট ছোট জলাধার, সংরক্ষণাগার এবং জল ব্যবস্থাপনা প্রকল্প গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে ভবিষ্যতে পানির সংকট মোকাবিলা করা সহজ হবে।
পরিবেশ ও পানিসম্পদ রক্ষা আজ আর কেবল একটি উন্নয়ন নীতির বিষয় নয়; এটি আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন। আমরা যদি এখনই সচেতন না হই, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি অনিরাপদ পরিবেশ রেখে যেতে হবে। কিন্তু আশার কথা হলো, সমস্যার সমাধান আমাদের নাগালের মধ্যেই রয়েছে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এমন একটি উদ্যোগ যা তুলনামূলকভাবে সহজ, সাশ্রয়ী এবং কার্যকর। নাগরিক পর্যায়ে সচেতনতা এবং সরকারি পর্যায়ে সঠিক নীতিগত উদ্যোগের সমন্বয় ঘটলে অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
আজ তাই সময় এসেছে বৃষ্টির পানিকে অপচয় না করে তাকে একটি মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করার। ব্যক্তি পর্যায়ে উদ্যোগ এবং সরকারি নীতির সমন্বয়ে যদি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণকে একটি জাতীয় আন্দোলনে রূপ দেওয়া যায়, তাহলে তা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পরিবেশ ও পানিসম্পদ রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।
লেখক: অধ্যাপক ও লেখক

