পৃথিবীতে যেকোনো কাজে এগিয়ে যাবার মূল শর্ত হলো পারদর্শিতা। যে যত বেশি পারদর্শী, সে তত অগ্রগামী। তথ্য, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে পৃথিবীতে মানুষের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়। এসবের পাশাপাশি প্রাচুর্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। যে যত বেশি ধনী, সে তত বেশি মূল্যবান। ধনীরা সব কাজেই এগিয়ে, সবকিছুতেই এগিয়ে। তবে আখেরাতে দেখা যাবে পুরোপুরি ভিন্ন চিত্র। সেখানে ধনীরা নয়; বরং দরিদ্ররাই থাকবে এগিয়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন দরিদ্র মুহাজিররা ধনীদের ৪০ বছর আগে জান্নাতে যাবে।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৯৭৯)
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দরিদ্র মুসলিমরা ধনীদের ৫০০ বছর আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৩৫৪)
আরেকটি হাদিসে আছে, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘‘জান্নাতে প্রবেশকারী এই অগ্রবর্তী দলটি জিহাদ ও জ্ঞানসাধনায় এতটাই ব্যতিব্যস্ত থাকবে, তাদের কাছে ন্যূনতম জীবনোপকরণও পাওয়া যাবে না (হাশরের ময়দানে) যার হিসাব গ্রহণের প্রয়োজন হবে। হাদিসের ভাষায়—‘তুমি কি জানো, আমার উম্মতের মধ্যে প্রথম কারা জান্নাতে যাবে?’ আমি বলি, আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলই ভালো জানেন। তিনি বলেন, ‘তারা হলো দরিদ্র মুহাজির। কিয়ামতের দিন তারা জান্নাতের দরজায় এসে কড়া নাড়বে। রক্ষীরা তাদের জিজ্ঞেস করবে, তোমাদের কি হিসাব গ্রহণ করা হয়েছে? তারা বলবে, আমাদের আবার কীসের হিসাব নেওয়া হবে? আমাদের কাঁধে তো শুধু তরবারি থাকত। সেটা দিয়ে আমরা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করতাম। সে অবস্থায়ই আমরা মৃত্যুবরণ করেছি। তখন তাদের জন্য জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হবে। তারা সেখানে ৪০ বছর বিশ্রাম করবে। এরপর অন্যরা প্রবেশ করবে।’’ (মুসতাদরাকুল হাকিম, হাদিস: ২৩৮৯)
উল্লিখিত হাদিসগুলোর কোনোটিতে বলা হয়েছে, দরিদ্ররা ধনীদের ৪০ বছর আগে জান্নাতে যাবে; আবার কোনোটিতে বলা হয়েছে ৫০০ বছর আগে যাবে। এর সমাধান হলো, ঈমানি শক্তি এবং সৎকর্মে অগ্রগামী হওয়ার দিক দিয়ে ধনী-দরিদ্র উভয় শ্রেণির মধ্যেই কিছুটা তারতম্য থাকবে।
কোনো কোনো দরিদ্রের ঈমান থাকবে অত্যধিক মজবুত। আমল থাকবে পর্যাপ্ত। তারা ৫০০ বছর আগে জান্নাতে যাবে। অপরদিকে কিছু দরিদ্রের ঈমান হবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল; আমলও হবে অপ্রতুল। তারা তাদের অবস্থা অনুপাতে ৪০ থেকে ৫০০ বছর আগে জান্নাতে যাবে। (জান্নাত-জাহান্নাম, শায়খ ড. উমার সুলাইমান আল আশকার, অনুবাদ: মাওলানা আকরাম হোসাইন, পৃষ্ঠা: ২৪)
ঠিক একইভাবে ঈমান ও আমলের ক্ষেত্রে ধনীদের মধ্যেও তারতম্য থাকবে। যারা উভয় ক্ষেত্রে প্রাগ্রসর, তারা অন্য ধনীদের ৪০ বছর আগেই জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যাদের কোনো একটি ক্ষেত্রে দুর্বলতা থাকবে, তারা দুর্বলতা অনুপাতে ৪০ থেকে ৫০০ বছর পরে প্রবেশ করবে। (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ইবনে কাসির, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৩৪৫)
লেখক: আলেম, সাংবাদিক ও গবেষক