ইতিহাসে এমন কিছু মহান পুরুষ জন্মেছেন, যারা শুধুমাত্র এক জাতি বা এক সময়ের জন্য নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য দিকনির্দেশক হয়ে উঠেছেন। তেমনই একজন মহামানব হলেন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম—ইসলামের শেষ নবি, যাঁকে শুধু ধর্মীয় পথপ্রদর্শক হিসেবে দেখলে তাঁর বৈশ্বিক অবদানকে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়। তিনি ছিলেন শিক্ষক, রাষ্ট্রনায়ক, বিচারক, সেনাপতি, কূটনীতিক এবং এক অভূতপূর্ব বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির ধারক। আজকের আধুনিক বিজ্ঞান যেসব সত্য আবিষ্কার করেছে, তার বহু শতাব্দী আগেই নবিজি (সা.)-এর বাণীতে ও জীবনাচারে সেসবের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এ কারণেই অনেক বিদ্বান তাঁকে ‘মহাবিজ্ঞানী’ আখ্যা দিয়েছেন।
জ্ঞানার্জনের প্রতি উদাত্ত আহ্বান: ইসলামে জ্ঞানার্জন একটি ইবাদত। নবিজি (সা.) বলেছেন, ‘জ্ঞান অন্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর ফরজ।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২২৪) তিনি মসজিদকে শুধু নামাজের স্থান হিসেবে রাখেননি, বরং তা ছিল গবেষণা, শিক্ষা ও আলাপচর্চার কেন্দ্র। সাহাবাগণ সেখানে চিকিৎসা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত ও জীববিদ্যা সম্পর্কেও আলোচনা করতেন।
চিকিৎসা বিজ্ঞানে নবিজির প্রজ্ঞা: নবিজি (সা.)-এর বহু হাদিসে চিকিৎসাবিদ্যার গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে, যাকে আধুনিক গবেষকরা বলেন ‘Tibb-e-Nabawi’ বা Prophetic Medicine। উদাহরণ: ‘মধুতে রয়েছে মানুষের জন্য আরোগ্য।’ (সুরা নাহল: ৬৯) আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, ‘মধুতে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিসেপটিক গুণ রয়েছে।’ ‘কালোজিরা মৃত্যু ছাড়া সকল রোগের প্রতিষেধক।’ (সহিহ বুখারি) গবেষণায় প্রমাণিত, কালোজিরা ইমিউন সিস্টেম উন্নত করে ও ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়ক।
জ্যোতির্বিজ্ঞান ও সময় চেতনা: নবিজি (সা.)-এর সময়ই আরবরা সূর্য ও চাঁদ দেখে সময় গণনা করত। তবে তিনি শুধু চাঁদের গতিপথকে নির্ভরযোগ্য ক্যালেন্ডার পদ্ধতিতে রূপান্তর করেন: ‘তোমরা চাঁদ দেখে রোজা শুরু করো ও চাঁদ দেখে ঈদ করো।’ (সহিহ বুখারি) তিনি মসজিদে সুনির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক নামাজ কায়েম করে সময় মেপে চলার শৃঙ্খলাবোধ প্রতিষ্ঠা করেন, যা আধুনিক সময় ব্যবস্থার প্রাথমিক ধারণার সঙ্গে মিলে যায়।
পরিবেশ ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞান: নবিজি (সা.) ছিলেন এক পরিবেশবান্ধব সচেতন মানুষ। তিনি বলতেন: ‘যে কেউ একটি গাছ রোপণ করল, তার প্রতিটি ফল সদকা হিসেবে গণ্য হবে।’ (মুসলিম) তিনি পানির অপচয় করতে নিষেধ করতেন। এটি আজকের জলসম্পদ সংরক্ষণের অন্যতম মূলনীতি।
হাত ধোয়া ও সংক্রমণ বিজ্ঞান: নবিজি (সা.) সব সময় খাওয়ার আগে ও পরে হাত ধুতে বলতেন। এ হাদিস তখন বলা হয়েছিল যখন জীবাণু বিষয়ে কিছুই জানা ছিল না। আজ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বারবার বলছে: ‘Handwashing saves lives.’ তিনি প্লেগ বা সংক্রামক রোগের সময় লকডাউনের ধারণা দিয়েছিলেন: ‘যদি কোনো এলাকায় মহামারি দেখা দেয়, তবে সেখানে প্রবেশ করো না; আর তোমরা সেখানে থাকলে বের হও না।’ (সহিহ বুখারি) এটি আধুনিক কোয়ারেন্টাইন ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রাথমিক ধারণা।
সৃজনশীল ও পর্যবেক্ষণমুখী মনোভাব: নবিজি (সা.) সাহাবিদের চিন্তা করতে বলতেন, প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করতেন। তিনি বারবার কোরআনে উল্লেখ করেছেন, ‘তোমরা কি চিন্তা করো না? তোমরা কি পর্যবেক্ষণ করো না?’ (সুরা আলে ইমরান, সুরা গাশিয়া, সুরা বাকারাহ প্রভৃতি) এসব আয়াত ও হাদিস গবেষণা, পর্যবেক্ষণ ও যুক্তিনির্ভর অনুসন্ধানকে উৎসাহিত করে— যা বিজ্ঞানের মূল ভিত্তি।
তিন নিঃশ্বাসে পানি পান: প্রিয় নবি (সা.) বলেছেন, এক নিঃশ্বাসে পানি পান করো না। পানি পান করো দুই কিংবা তিন নিঃশ্বাসে। আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে, যদি কেউ এক নিঃশ্বাসে পানি পান করে তবে তার মাথা ঘোরানো, রক্ত সঞ্চালনে ভারসাম্যহীনতা হতে পারে।
রোজা রাখা: প্রিয়নবি (সা.) রমজানের ফরজ রোজা ছাড়াও মাঝে মাঝে রোজা রাখতেন। রোজার মাধ্যমে উপবাস করা স্বাস্থ্যের জন্য অনেক উপকারী। জাপানি বিজ্ঞানীরা মুসলমানদের রোজা পালন সম্পর্কে বলেছেন যে, রোজা মানুষকে সুস্থ রাখতে এবং ক্যানসার কোষের বিরুদ্ধে সুস্থ থাকতে সর্বাধিক সুরক্ষা দেয়।
ভোরে ঘুম থেকে উঠা: মহাবিজ্ঞানী মহানবি (সা.) খুব ভোরে জেগে উঠতেন। সূর্য ওঠার আগে ফজর নামাজ আদায়ের মাধ্যমে প্রিয়নবি দিন শুরু করতেন। বিজ্ঞানে প্রমাণিত যে, যারা ভোরে ঘুম থেকে ওঠে, তাদের কর্মস্পৃহার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং তাদের হতাশ হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কম।
লেখক: সহকারী শিক্ষক, নাদির হোসেন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, রাজবাড়ী