মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা মামলায় দণ্ডিত তিন আসামির রায় কীভাবে বাস্তবায়ন হবে- আইনাঙ্গন ও রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সব জায়গায় গতকাল মঙ্গলবার এই নিয়ে ছিল আলোচনা। বিশেষ করে মামলার এক নম্বর আসামি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদেশে (ভারত) অবস্থান করায় এই নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বেশি। তবে তাকে ওই শাস্তি থেকে রেহাই পেতে হলে দেশে এসে আপিলের আবেদন করতে হবে বলে জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটররা।
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে এই মামলা করা হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে দণ্ড দেওয়া হয়েছে এই মামলায়। তাদের মধ্যে দুজনকে পলাতক দেখিয়ে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হলেও সাবেক আইজিপির উপস্থিতিতে চলে মামলার কার্যক্রম।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অন্যতম প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার (পালোয়ান) গতকাল মঙ্গলবার দৈনিক খবরের কাগজকে বলেন, ‘পলাতক থাকা অবস্থায় আসামিরা এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ না পেলেও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন তো কারাগারে আছেন। তিনি আপিল করতে পারবেন। নিয়ম অনুযায়ী রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে পারবেন তিনি।’
চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আমার মক্কেলের খালাস চেয়েছিলাম। কিন্তু রায়ে তার ৫ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে। এখন তিনি আপিল করতে পারবেন। তবে আপিল করবেন কি না- তার পরিবার থেকে এই বিষয়ে আমাকে এখনো কিছু জানানো হয়নি।’
প্রসঙ্গত পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গত ১০ জুলাই অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এই মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। চার মাস সাত দিনের মাথায় গত সোমবার এই মামলায় রায় হয়।
রায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। আইনজীবীরা জানান, আইনের দৃষ্টিতে পলাতকদের ক্ষেত্রে এটি মামলাটির শেষ ধাপ নয়। এই রায় কার্যকরে এখনো আইনি কয়েকটি ধাপ আছে। এর মধ্যে রয়েছে সুপ্রিম কোর্টে আপিল আবেদন, আপিল রিভিউ এবং সর্বশেষ রাষ্ট্রপতির ক্ষমা।
তারা বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালের রায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি পলাতক হলে তাকে আগে আত্মসমর্পণ করতে হবে অথবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি তাকে কারাগারে পাঠান, তখন ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবেন তিনি। এক কথায় আপিলের অধিকার পেতে হলে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে আত্মসমর্পণ করতে হবে অথবা গ্রেপ্তার হতে হবে।’
আইনজীবীরা জানান, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায় বহাল, পরিবর্তন বা বাতিল করতে পারবেন। আপিল নিষ্পত্তি হওয়ার পর ওই রায়ের বিরুদ্ধে আবার রিভিউও করা যাবে। রিভিউ বা পুনর্বিবেচনার এই আবেদন সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগেই করা হয়।
রিভিউতে কারও মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলে রায় কার্যকরের আগে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির জীবন বাঁচানোর শেষ সুযোগ হচ্ছে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে সাজা মওকুফের জন্য আবেদন করা। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির দণ্ড মওকুফ, কমানো বা স্থগিত করতে পারেন।
উল্লেখ্য, গত সোমবার দেওয়া রায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ সাজা দেওয়ার পাশাপাশি শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে আন্দোলনে নিহত এবং ভুক্তভোগীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া প্রশ্নে আইনজীবীরা বলেন, ট্রাইব্যুনাল রায়ে তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্র বরাবর দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। রাষ্ট্রকে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাই সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবে সরকার। সরকারি বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যেমন এনবিআর বা অন্য সংস্থার মাধ্যমে এই নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে পারবে সরকার।