বছরের শেষ দিকে এসে হঠাৎ ঊর্ধ্বমুখী হয়ে গেছে ফরিদপুরের পেঁয়াজের বাজার। আমদানি না হওয়ায় মজুত কমায় দাম বাড়ছে। এ ছাড়া মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে আসতে দেরি হওয়ায় দাম বাড়ছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে ফরিদপুরের খুচরা বাজারে কেজিতে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে পেঁয়াজের দাম। বর্তমানে খুচরা দোকানে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১০৫ থেকে ১১০ টাকা দরে। যা কয়েকদিন আগেও প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৭০ টাকা ছিল। প্রতিদিনই বিভিন্ন বাজারে পেঁয়াজের দাম ওঠানামা করছে। এতে বিপাকে পড়েছেন হাট এবং বাজারে আসে ক্রেতা সাধারণ।
পেঁয়াজের জেলা হিসেবে সব সময়ই বিখ্যাত ফরিদপুর। ফরিদপুরের সালথা, নগরকান্দা, সদর, বোয়ালমারী, ভাঙ্গা, মধুখালী উপজেলা এবং বড় বাজারের মধ্যে কানাইপুর, সাতৈর, হাজী শরীয়তুল্লাহ বাজারে খোঁজ নিয়ে ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত সপ্তাহে মানভেদে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৬০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হলেও, বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ১০৫ থেকে ১১০ টাকায়।
আড়তদাররা বলেন, ভারতীয় পেঁয়াজের আমদানি বন্ধ থাকায় দেশি পেঁয়াজের ওপর চাপ বেড়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমায় বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। গত মৌসুমের পেঁয়াজ বিক্রি শেষের পর্যায়ে। তা ছাড়া মুড়িকাটা নতুন পেঁয়াজ বাজারে না আসা পর্যন্ত পেঁয়াজের বাজার অস্থির থাকবে।
খুচরা বিক্রেতারাও বলছেন, বাজারে দেশি পেঁয়াজের কিছুটা সংকট তৈরি হওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আমদানি শুরু হলে পেঁয়াজের দাম নেমে যাবে। তারা বলেন, চাষিরা এবং ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজের মৌসুমে মজুত করে রেখেছিলেন। কদিন বাদেই মুড়িকাটা পেঁয়াজের বাজারে আসবে। এখন ব্যবসায়ী এবং চাষিদের কাছে খুব একটা পেঁয়াজ জমা নেই। এসব কারণেই পেঁয়াজের দাম হঠাৎ করেই বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে নভেম্বর মাসের শেষর দিকে মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে আসার কথা থাকলেও কয়েক দিন আগের বৃষ্টির কারণে তা বাজারে আসতে দেরি হচ্ছে। এটাও পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে জানান তারা।
ক্রেতাদের অভিযোগ, মৌসুমের শেষের দিকে কৃষকের কাছে পেঁয়াজ নেই। বেশির ভাগ পেঁয়াজ এখন আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের কাছে। ফলে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এবার দাম ভালো পাওয়ায় কৃষকরা আগেই পেঁয়াজ বিক্রি করে দিয়েছেন।
সালথা বাজারের ক্রেতা নাসির বলেন, খুচরা বাজারে ১০৫ থেকে ১১০ টাকা কেজি দরে ভালো মানের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে। দাম বাড়ার কারণে সাধারণ মানুষ রীতিমতো বিপাকে পড়েছেন। প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৪০-৫০ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। পেঁয়াজের সংকট থাকায় সাধারণ মানুষ রীতিমতো বিপাকে পড়েছেন। সালথা উপজেলার বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, ‘হঠাৎ করে দাম এভাবে বাড়বে ভাবতেও পারিনি। কদিন আগে ৪০ মণের মতো পেঁয়াজ মণপ্রতি ২ হাজার ৬০০ টাকা (প্রতি কেজি ৬৫ টাকা) দরে বিক্রি করেছি। এখন শুনি দাম অনেক বেড়ে গেছে।
বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর গ্রামের গিয়াস উদ্দিন বলেন, অনেক লোকসান হয়ে গেল। ১৫ দিন আগে প্রায় ১০০ মণ পেঁয়াজ বিক্রি করেছি। অথচ পেঁয়াজের মন এখন দেখছি ৪ হাজার টাকা (কেজি ১০০ টাকা)।
শহরের হাজী শরীয়তুল্লাহ বাজারের আড়তদার বিপ্লব সাহা বলেন, ১০ দিনের ব্যবধানে আড়তে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি মণ পেঁয়াজ ৩ হাজার ৯০০ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত কিনছি। এই পেঁয়াজ খুচরা বাজারে ১০০ থেকে ১১০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে এবার নভেম্বরে মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে আসতে দেরি হচ্ছে। এটাই দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
সালথা বাজারের আড়তদার তামিম ট্রেডার্সের মালিক আক্কাছ শেখ বলেন, এক সপ্তাহের ব্যবধানে আড়তে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। এখন প্রতি মণ পেঁয়াজ ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪০০০ টাকায় কিনছি। পেঁয়াজ আমদানি করা না হলে দাম আরও বাড়তে পারে।
মধুখালী বাজারের আড়তদার মো. আমিনুল বলেন, গত কয়েকদিন পেঁয়াজের বাজার বেশ চড়া। মূলত দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ সংকটের কারণেই দাম বাড়ছে। এ ছাড়া নভেম্বর মাসে মুড়িকাটা পেঁয়াজ উঠে শেষের দিকে। দাম বাড়ার এটাও একটি বড় কারণ।
এ বিষয়ে ফরিদপুর জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে আসতে আরও এক মাসের মতো সময় লাগবে। সেক্ষেত্রে এ কয়েক দিন পেঁয়াজের বাজার ঊর্ধ্বমুখী থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের পক্ষ থেকে সিন্ডিকেট ও বাজার অস্থিরতার বিষয়ে নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে।’
ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান বলেন, কৃষকরা ইতোমধ্যে হালি পেঁয়াজ রোপণের জন্য বীজ থেকে চারা তৈরি শুরু করেছেন। নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসতে সময় লাগবে। এ বছর ফরিদপুরে ৫ হাজার ২৮৫ হেক্টর জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।