ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি ও প্রতারণা যেন থামছেই না। একটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। গত রবিবার (২২ অক্টোবর) ‘খবরের কাগজ’ পত্রিকায় এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমনই বিস্ময়কর তথ্য। একটি বাড়ি দেখিয়েই বহু ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে। মামলাও হয়েছে ১২টি। আদালতে বিচার চলছে বছরের পর বছর। সুরাহা মিলছে না। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও নিরীহ ভুক্তভোগীরা।
রাজধানীর তেজগাঁওয়ে তেজকুনিপাড়ার একটি বাড়ি দেখিয়ে সরকারি-বেসরকারি ১১টি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে আলাদা আলাদাভাবে বন্ধক রাখা হয়েছে। প্রতিটি ব্যাংকের কাছে গড়ে ৮০ লাখ টাকা করে ঋণ নিয়ে প্রায় ১০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। বাড়ির প্রকৃত মালিককে আড়ালে রেখে ভুয়া ব্যক্তি দিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে এসব অপকর্ম করে চক্রটি।
জান্নাত ট্রেডিং করপোরেশনের মালিক জান্নাত আরা ফেরদৌস। রাজধানীর পুরানা পল্টনে টিনশেড ঘরসহ আড়াই কাঠা জমি ২০১৫ সালে আইএফআইসি ব্যাংকের মতিঝিল ইন্টারন্যাশনাল শাখায় বন্ধক রেখে ৬০ লাখ টাকা ঋণ নেন। এরপর তথ্য গোপন করে দুই মাস পরই এনআরবি ব্যাংকের গুলশান করপোরেট অফিস থেকে ৭৫ লাখ টাকা ঋণ নেন। ২০১৬ সালে সোনালী ব্যাংকের কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন আইসিডি শাখা থেকে গৃহনির্মাণ বাবদ ৫০ লাখ টাকা ঋণ নেন। আইএফআইসি ব্যাংক জান্নাত আরাকে ঋণ খেলাপি ঘোষণা করে অর্থ ঋণ আদালতে মামলা করে রক্ষা পায়। মামলায় ব্যাংকের পক্ষে রায় হয়। ফলে আদালতের আদেশে বাড়িটি নিলামে বিক্রির জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এটি দেখে সোনালী ব্যাংকের কমলাপুর শাখার ম্যানেজারও জান্নাত আরা ফেরদৌসের বিরুদ্ধে শাহজাহানপুর থানায় মামলা করেন। মামলাটি এখন তদন্তনাধীন।
রাজধানীতে এ চক্রটি বেশ সক্রিয়। প্রতিবেদনের আরেকটি তথ্য মতে, তেজগাঁওয়ের তেজকুনিপাড়ার ১৯৫/৩ নম্বর বাড়িটির মালিক আব্দুল মজিদ ও নুরজাহান বেগম। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঋণের জিম্মাদার হিসেবে তাদের নোটিস পাঠায় ন্যাশনাল ব্যাংক ও সাউথইস্ট ব্যাংক। মৃত আব্দুল মজিদের ছেলেমেয়েরা এই নোটিস পেয়ে বিস্মিত হন। তারা জানতে পারেন, ২০০৫ থেকে ২০০৬ সালে একটি চক্র অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আব্দুল মজিদ ও নুরজাহান সাজিয়ে রেজিস্ট্রি অফিসে নিয়ে যায়। সেখানে জালিয়াতির মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংকের নামে বন্ধকি দলিল করে দেওয়া হয়। প্রতিটি জাল দলিলে ১৫ শতাংশ জমিসহ তিনতলা বাড়ি দেখিয়ে সরকারি-বেসরকারি ১১টি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অন্তত ১০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করে চক্রটি। মৃত আব্দুল মজিদের ছেলে শওকত মজিদ মামলা করেন। ব্যাংকের পক্ষ থেকেও মামলা হয়। ১২ বছর ধরে মামলা চললেও আজও সুরাহা হয়নি। বাড়িটি এখন সোনালী ব্যাংক প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় শাখায় দায়বদ্ধ।
চার বছর আগে এ বাড়িটি ঋণ প্রদানকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন ক্যাপিটাল লিমিটেড (ইউসিএল)-এর দখলে ছিল। এ ব্যাপারে ইউসিএল-এর এসভিপি অ্যান্ড সিএফও মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন ‘খবরের কাগজ’কে বলেন, ‘আমরা (ইউসিএল) ঋণের টাকা উদ্ধার করতে আদালতের শরণাপন্ন হই। রায়ে ওই সম্পত্তির মালিকানা পায় ইউসিএল। এরপর নাম জারি ও খাজনা পরিশোধ করে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী নিলাম করা হয়। নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতাকে ওই সম্পত্তি বুঝিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে ওই সম্পত্তিতে ইউসিএলের আর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’
ব্যাংক কোম্পানি আইন-১৯৯১ এর ৪৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ‘ঋণ জালিয়াতি ঠেকাতে গ্রাহক ও জামিনদারের স্বাক্ষরের পাশাপাশি বৃদ্ধাঙ্গুলির ছাপ (টিপসই) নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে এই আইনটি কতটুকু মানা হচ্ছে তা দেখার বিষয়। ব্যাংকগুলোর বড় অঙ্কের ঋণ জালিয়াতির কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। ঋণের দ্বিগুণ অর্থ আটকে থাকায় জালিয়াতির মামলা পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রচুর অর্থ ও সময় ব্যয় করতে হচ্ছে, যা কাম্য নয়।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখাগুলোর ব্যবস্থাপক, ঋণ প্রদানকারী কর্মকর্তা, ঋণ গ্রহণকারী ব্যক্তি ও দালাল চক্রকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত না করলে এ ধরনের অপরাধ দিন দিন বৃদ্ধিই পাবে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে ঋণ দেওয়ার ব্যাপারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। দেশের সিংহভাগ অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার সুযোগে। টেকসই অর্থনীতি নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা। ব্যাংকিং খাতের আর্থিক সুশাসন ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি বাড়াতে হবে।
সালমান/