জাতির মেরুদণ্ড শিক্ষাকে খামচে ধরেছে দুর্নীতিবাজরা। ঝরে পড়া শিশুদের শিক্ষামুখী করতে সরকার যখন ব্যবস্থা নিচ্ছিল, ঠিক সে সময় মুষ্টিমেয় দুর্নীতিবাজের সেদিকে চোখ পড়েছে। তারা বিভিন্ন খাতে অনিয়ম-দুর্নীতির মহোৎসবে মেতে উঠেছে।
প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া ৮ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের শিক্ষামুখী করতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মাধ্যমে চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির (পিইডিপি-৪) আওতায় ‘আউট অব স্কুল চিলড্রেন প্রোগাম’ চালু করা হয়। প্রকল্প চলবে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত। বরাদ্দ দেওয়া হয় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এ প্রকল্পে বড় ধরনের দুর্নীতি হয়েছে। ছয় জেলা প্রতিনিধিদের প্রতিবেদনে অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর উঠে এসেছে।
‘খবরের কাগজ’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষার্থীদের বৃত্তি, শিক্ষক নিয়োগ, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর তালিকা, নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বেতন, শিখনকেন্দ্রের ঘরভাড়া ও শিক্ষা উপকরণ সরবরাহে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দরপত্র আহ্বানের কথা থাকলেও তা মানা হয়নি। কেন্দ্রগুলোয় কর্মকর্তা নিয়োগে মাস্টাররোলে ভুয়া স্বাক্ষর দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।
৬ জেলার ২৯ উপজেলায় ২২ কোটি ৫৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা হরিলুট করা হয়েছে বলে অডিট নিরীক্ষার প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এ বিষয়ে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর উপপরিচালক (অর্থ) রিপন কবির লস্কর ‘খবরের কাগজ’কে বলেন, ‘প্রতিটি জেলায় ইউএনওকে সভাপতি করে পাঁচ সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। তারা অডিট রিপোর্ট পাঠায় জেলা প্রশাসক অফিসে। সেখানে সহকারী পরিচালককে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের টিম রয়েছে, তারা রিপোর্ট পর্যবেক্ষণ করে আমাদের কাছে পাঠায়।’ আমরা কয়েকটি জেলায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পেয়েছি। এর মধ্যে শিক্ষকদের বেতন, শিখনকেন্দ্রের ঘরভাড়া ও শিক্ষা উপকরণ না দেওয়ার বিষয়টি এসেছে। ২২ কোটি টাকা লোপাট নিয়ে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ছয় এনজিওর অভিযুক্তের সম্পৃক্ততাও।
সরেজমিন দেখা গেছে, ২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত মাত্র ৫০ শতাংশ কাজ হয়েছে ভাঙ্গায়। এখন কাজ বন্ধ। এ উপজেলার জন্য আড়াই কোটি টাকা বিল ছাড় করা হলেও কাজ হয়েছে দেড় কোটি টাকার। বাকি ১ কোটি টাকা হরিলুট করা হয়েছে।
কিশোরগঞ্জের কমিরগঞ্জ পূর্ব জাফরাবাদ ১০ নম্বর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের শিখনকেন্দ্রের শিক্ষিকা জাফরিন আক্তার বলেন, ‘আট মাস ধরে কোনো বেতন-ভাতা পাচ্ছি না। এ জেলায় ৬০ শতাংশ কাজ হলেও বাকি রয়েছে ৪০ শতাংশ কাজ। বরাদ্দের ৪০ শতাংশ টাকা হরিলুট করা হয়েছে, যা টাকার অঙ্কে ৭ কোটি ৬০ লাখ।’
বাগেরহাটের ৮ উপজেলায়ও একই অভিযোগ। ‘লিড এনজিও সুখী মানুষ’ জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ২০২১ সাল থেকে চলতি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৬ কোটি টাকা তুলে নেয়। বেতন না পাওয়া একাধিক শিক্ষক জানান, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ২০ কোটি টাকা তোলা হলেও এই প্রকল্পে কাজ হয়েছে ৬০ শতাংশ। বাকি ৪০ শতাংশের টাকা লুটপাট করা হয়েছে, যা টাকার অঙ্কে ৮ কোটি। মাদারীপুরের শিবচরে এ প্রকল্পে প্রায় কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে নারী বিকাশ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে। শিবচরের ইউএনও রাজিবুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের নজরে আনা হবে এবং আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক। তারপরও দেখা যায়, দারিদ্র্য ও অজ্ঞতার কারণে অনেক অভিভাবক তাদের শিশুদের স্কুলে পাঠান না। আবার অনেকে ঝরে পড়ে। সরকার ৮ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ঝরে পড়া রোধে শিক্ষামুখীকরণের জন্য প্রণোদনা প্রকল্প দিয়েছিলেন। সে প্রকল্পেও চলছে দুর্নীতি ও অনিয়ম। এখন প্রশ্ন হলো, এসব প্রকল্পের চিত্র সারা দেশে কি একই! প্রকল্প পরিচালক বা তদারকির দায়িত্বে যিনি বা যারা আছেন তাদের কি এ ব্যাপারে জবাবদিহি বা স্বচ্ছতার কোনো বিধান নেই? তাহলে কেন এমন হরিলুট হচ্ছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। অপরাধীদের বিভাগীয় শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা প্রকল্পের এমন দুর্নীতির অভিযোগ হরহামেশাই লক্ষ করা যায়। কিন্তু কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না থাকায় সমস্যা এখন প্রকট রূপ নিয়েছে।