দেশে উদ্ভূত রাজনৈতিক সহিংসতার আড়ালে ঢাকা পড়েছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। মৃত্যু যেন থামছেই না। রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রতিদিন দু-তিনজনের মৃত্যু হলেও ডেঙ্গুতে প্রাণ যাচ্ছে ১০ থেকে ১৫ জনের। ডেঙ্গু রোগী যারা খুব আশঙ্কাজনক অবস্থায় চলে যান, কেবল তাদেরই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। স্বাস্থ্য বিভাগের দাপ্তরিক তথ্যে এ হিসাবই নথিবদ্ধ করা হয়েছে।
মশানিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসাব্যবস্থা- দুটোর ক্ষেত্রেই রয়েছে চরম অব্যবস্থাপনা। বাড়ছে এডিস মশার বংশবিস্তার। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও। হাসপাতালগুলোয় ডেঙ্গু রোগী বেড়ে যাওয়ায় সংকটে পড়েছেন চিকিৎসকরা। সঠিক তথ্য-উপাত্ত ও ডেঙ্গুর গতিপ্রকৃতি নিয়ে তেমন কোনো গবেষণা হচ্ছে না, যা বিশেষজ্ঞদের জন্য সহায়ক ভূমিকা রাখবে। এটিও দিন দিন আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।
সরেজমিন দেখা যায়, ইনডোরের পাশাপাশি আউটডোরেও প্রতিদিন অতিরিক্ত রোগীর চাপ সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোয়। প্রতিনিয়তই ছুটছে মানুষ। বাসাবাড়িতেও ডেঙ্গু রোগীর ছড়াছড়ি। চিকিৎসাক্ষেত্রের নানামুখী অব্যবস্থাপনা আড়ালে রাখতে আক্রান্তের সংখ্যা কম দেখানো হয় বলেও মনে করছেন কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ।
করোনাকালীন দেখা গেছে, বেশকিছু বিশেষায়িত হাসপাতাল তৈরি করা হয়েছিল। এর ফলে করোনা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে তেমনটি লক্ষ করা যায়নি। ফলে বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরতে ঘুরতে রোগীর ও তার স্বজনদের ভোগান্তি চরমে উঠছে। সঠিক সময়ে চিকিৎসাসেবা না পাওয়ায় অকালে অনেকেই ঝড়ে গেছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুম থেকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১ জানুয়ারি থেকে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২ লাখ ৬৫ হাজার ৮৬২ জন। যাদের সবাই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৯৭ শতাংশ বা ২ লাখ ৫৭ হাজার ৪৪৪ জন। মারা গেছেন ১ হাজার ৩২৭ জন বা শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। ২৮ অক্টোবর হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ৩ শতাংশ বা ৭ হাজার ৯১ জন। আক্রান্তদের মধ্যে ঢাকায় ৯৮ হাজার ২৭ জন এবং ঢাকার বাইরে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৮৩৫ জন। মৃতদের মধ্যে ঢাকায় ৮০২ জন এবং ঢাকার বাইরে ৫২৫ জন।
সরকারি কর্মকর্তারা বলেছেন, ‘হাসপাতালভিত্তিক যে হিসাব দেওয়া হয়, তার চেয়ে কম করে হলেও চার-পাঁচ গুণ বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে।’ হাসপাতালগুলোয় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় অনেকেই বাসায় থেকে চিকিৎসা নিচ্ছে। তবে এ ব্যাপারে কারও কাছেই মোট আক্রান্ত রোগীর সঠিক কোনো হিসাব নেই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শক এবং বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক ড. মাহমুদুর রহমান খবরের কাগজ-কে বলেন, ‘দেশে এখনো ডেঙ্গু নিয়ে কোনো কার্যকর সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম নেই। ফলে কোথায় কতজন ডেঙ্গু টেস্ট করেছে, কতজন পজিটিভ বা নেগেটিভ হলো তার কোনো হিসাব নেই। ডেঙ্গু রোগী প্রটেকশনের ব্যাপারে তেমন কোনো পদক্ষেপ দেখছি না। অথচ ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে রোগীকে অবশ্যই মশারির ভেতরে থাকতে হবে। কারণ, একটি মশা ডেঙ্গু আক্রান্ত কোনো রোগীকে কামড়ানোর পর অন্য যতজন সুস্থ মানুষকে কামড়াবে তারা সবাই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হবে। ফলে শুধু হাসপাতালে থাকা রোগীই নয়, বাসাবাড়িতে থাকা রোগীর ক্ষেত্রেও একই নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখা দরকার। এজন্য মানুষের সচেতনতা বাড়াতে হবে।’
হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে। ডেঙ্গুর জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে তুলতে হবে। মশানিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। স্বাস্থ্য বিভাগের স্বাস্থ্যকর্মীদের দিয়ে এলাকাভিত্তিক সঠিক পরিসংখ্যান নিশ্চিত করতে হবে এবং সে অনুযায়ী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও সংকট মোকাবিলার জন্য সর্বোপরি জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।