মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলছে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন। ইতোমধ্যে রাজধানীর মিরপুর ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। বিক্ষোভ রূপ নিয়েছে সহিংসতায়। বেশকিছু পোশাক কারখানা ভাঙচুর করা হয়েছে। কয়েকটি কারখানায় দেওয়া হয় আগুন। শুধু এক গাজীপুরেই আড়াই শতাধিক যানবাহন ভাঙচুর করেছে শ্রমিকরা। বিরোধী দলের টানা অবরোধ কর্মসূচির মধ্যে কয়েক দিনে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে দুজন শ্রমিক নিহত হন। পোশাক কারখানায় অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় চার শতাধিক কারখানা। গত মঙ্গলবার আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর হামলা ও গাজীপুরে শ্রমিক হত্যার বিচারের দাবিতে শ্রমিকরা রাস্তা অবরোধ করে। এতে বিভিন্ন এলাকায় যানবহন চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়াল শেলও থামাতে পারছে না সংক্ষুব্ধ গার্মেন্ট শ্রমিকদের।
দ্রব্যমূল্যের কারণে নাভিশ্বাস যখন চরমে, তখন শ্রমিকদের এই ন্যায্য দাবির বিষয়টি স্বীকার করতেই হবে। আন্দোলনরত নারী শ্রমিক রেশমা ও সুরমার কথা উঠে এসেছে খবরের কাগজ পত্রিকায়। তারা বলেন, ‘বাজারে পণ্যের দাম খুব বেড়েছে। চাল, আলু, সবজি ও ডিমের দাম নাগালের বাইরে। বেতন না হলে অনাহারে মারা যাব।’
এ বিষয়ে গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতি নামে একটি সংগঠনের সভাপতি তাসলিমা আকতার বলেন, ‘মালিকরা তো শ্রমিকের পেটের ক্ষুধা টের পান না, তারা খোঁজেন রাজনীতি আর ষড়যন্ত্র।’ তারা বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন বলেও জানিয়েছেন।
শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় বিশ্বব্যাপী কাজ করা সংগঠন ইন্ডাস্ট্রি অল-এর বাংলাদেশ কাউন্সিল তাদের দাবিতে বলেছে, বর্তমান মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় শ্রমিকের বিদ্যমান বেতন কাঠামো সত্তোষজনক নয়।
এমন অবস্থা যখন বিরাজ করছে তখন বিজিএমই-এর এক সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে- শ্রমিকরা কারখানায় এসে কাজ না করলে বেতন দেওয়া হবে না। এ বিষয়ে বিজিএমইএ-এর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি এস এম মান্নান কচি ‘খবরের কাগজ’কে বলেন, আজকের সাধারণ সভায় (বিজিএমইএ) সিদ্ধান্ত হয়েছে ‘নো ওয়ার্ক নো পে’। আমরা সুস্পষ্টভাবে বলছি, যারা কারখানায় এসে কাজ করবেন না, তাদের অনুপস্থিত ধরে নেওয়া হবে। অনুপস্থিত কর্মদিবসের বেতনও তারা পাবেন না। এটাই আজকের সিদ্ধান্ত।
এদিকে গত মঙ্গলবার জরুরি সংবাদ সম্মেলন করেছে বিজিএমইএ। তারা বলছে, চাইলে মালিকরা কারখানা বন্ধ করে দিতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে পোশাক কারখানার মালিকদের শ্রম আইনের ১৩(ক) ধারা অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।
পোশাকশিল্প দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের শিকার বলে দাবি করা হলেও শিল্পের নেতাদের কেউ বিষয়টি স্পষ্ট করার দায়িত্ব নিতে চান না। শ্রমিক নেতারাও এ বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। তবে চলমান অবরোধ কর্মসূচির মধ্যে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে সৃষ্ট সহিংসতাকে স্বাভাবিকভাবেও দেখছেন না শিল্পমালিকরা। এখানে তৃতীয়পক্ষের ইন্ধন ও সক্রিয় অংশগ্রহণেরও অভিযোগ করেছেন তারা।
বিজিএমইএ-এর নেতারা মনে করেন, পোশাকশিল্পকে অস্থির করতে দেশি-বিদেশি চক্রান্ত থাকতে পারে। পোশাকশিল্পের চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে করণীয় ঠিক করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল বিজিএমইএ নেতাদের ডেকে বৈঠক করেছেন। পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বলছেন, সরকার তথা মজুরি বোর্ড যে সিদ্ধান্ত দেবে, তা মেনে নিয়ে আগামী ডিসেম্বর মাস থেকে সেটি বাস্তবায়ন করা হবে।
কয়েকদিন ধরে চলা শ্রমিক অসন্তোষে রাজনৈতিক মদদও রয়েছে বলে অনেকে অভিযোগ করেছেন। বিগত শ্রমিক আন্দোলনেও এমন ঘটনার নজির রয়েছে। পোশাক কারখানার মালিক ও শ্রমিকরাও বলছেন একই কথা। সরকারও চেষ্টা করছে আন্দোলন কীভাবে শক্ত অবস্থানে থেকে প্রতিহত করা যায়।
বহিরাগত তথা তৃতীয়পক্ষের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে শিল্প পুলিশ জানায়, আমরা এমন কিছু স্পর্শকাতর তথ্য পেয়েছি, যা তদন্তের স্বার্থেই এখন প্রকাশ করা যাবে না। এগুলো আরও গভীর অনুসন্ধানের প্রয়োজন আছে। সর্বশেষ সরকার পোশাকশিল্প কারখানার নিরাপত্তা দিতে বিজিবি সদস্যদের মোতায়েন করেছে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানিমুখী শিল্প খাত পোশাকশিল্প। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় এবং শীর্ষ স্থানে রয়েছে চীন। ডব্লিউটিওর বর্তমান বৈশ্বিক হিসেবে মোট পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের দখলে ৬.৪ শতাংশ হিস্যা।
চারদিকে রাজনৈতিক পরিস্থিতি যখন উত্তপ্ত, ঠিক তখনই এরকম ঘটনা শ্রমিক বিক্ষোভের ক্ষেত্রেও রং মাখাতে পারে। সেজন্য শ্রমিক নেতাদেরও এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। যাতে বিক্ষোভের নামে তাদের আন্দোলন সহিংসতায় রূপ না নেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিশেষ করে শিল্প পুলিশকে শ্রমিক আন্দোলন বিচক্ষণতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। শ্রমিক ও মালিক পক্ষকে সমস্যা সমাধানে সমঝোতায় আসতে হবে। বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি শিল্প তৈরি পোশাক খাতটিকে যেন কুলষিত না করা হয়, সেটিই প্রত্যাশা সবার।